Tuesday, July 16, 2024
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমদৈনন্দিন খবরবেখবরআমাদের সাংবাদিকতায় রাষ্ট্র আছে, সমাজের কথা নেই

আমাদের সাংবাদিকতায় রাষ্ট্র আছে, সমাজের কথা নেই

আফসান চৌধুরী। চার দশকের বেশি সময় ধরে ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন। হাসান হাফিজুর রহমানের অধীনে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’ প্রকল্পের অন্যতম গবেষক ছিলেন তিনি। সাংবাদিকতা করেছেন দেশি–বিদেশি অনেক সংবাদমাধ্যমে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার হালফিল অবস্থা নিয়ে প্রথম আলো তাঁর মুখোমুখি হয়। আলোচনায় আসে ইতিহাসচচর্চাও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান ও মনোজ দে

প্রথম আলো: 

সম্প্রতি আপনি সাংবাদিকতায় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যাস কমিউনিকেশন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (এআইআইএমসি) প্রবর্তিত এহসানুল করিম এক্সেলেন্স পুরস্কার পেলেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা কি পুরস্কৃত হওয়ার মতো অবস্থায় আছে?

আফসান চৌধুরী: বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পুরস্কৃত হওয়ার অবস্থায় আছে কি নেই, সেটা নির্ভর করছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা কী করছে। আমাদের সাংবাদিকতা রাষ্ট্রপন্থী, সকল চিন্তা রাষ্ট্র ও তার প্রতিনিধি সরকার নিয়ে। ১৯৭১ সালের আগে প্রধান ভাবনা ছিল রাষ্ট্র গঠন, এখন রাষ্ট্র সংরক্ষণ। মূলত আশির দশক থেকেই নয়া বড়লোকদের মিডিয়াতে আসা শুরু হয়। তাঁরা অর্থনৈতিক পুঁজি রক্ষা করার জন্য বা সেটা বাড়ানোর জন্য সামাজিক পুঁজি কিনতে শুরু করলেন।

নব্বইয়ের পর সেটা অনেকটা পূর্ণতা পেল। এরা রাষ্ট্রপন্থী আর মিডিয়া কর্মীরাও তাই। তাঁদের ভাবনা সমাজ নয়, রাষ্ট্র কী করল। আর অনেকেরই ব্যবসা হয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। ২০০৫ সালে প্রথম আলো সম্পর্কে লিখেছিলাম, প্রথম আলোর সুবিধাটা হচ্ছে, প্রথম আলোর মালিকপক্ষ বড়লোক হয়েছে বাজার থেকে ব্যবসার মাধ্যমে। সে কারণে পত্রিকাটি তুলনামূলক মুক্ত। বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম এসেছে লাইনবাজির অর্থনীতি বা কানেকশন ক্যাপিটালিজমের হাত ধরে। কানেকশন ক্যাপিটালিজম বোঝা ছাড়া বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে বোঝা সম্ভব নয়।

কিন্তু ২০২৪ সালে এসে আমাদের গ্রামের মানুষের চেষ্টায়, তাদের অর্থে আমাদের সমাজটা পাল্টে যাচ্ছে, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং বাণিজ্যিক কৃষি বড় ভূমিকা পালন করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের অবদান সামান্য। কিন্তু সংবাদমাধ্যম সেই পরিবর্তন তেমন ধরতে পারেনি। আমাদের মিডিয়া এখনো রাষ্ট্রের বিষয়ে রিপোর্ট করে, সমাজকে গুরুত্ব দেয় না।  কিন্তু আমি মনে করি রাষ্ট্রের চেয়ে সমাজ এখনো অনেক বেশি সবল। রাষ্ট্রিক কোন প্রতিষ্ঠান সবল? দুজনে মিলে কাজ করলে ভালো। কিন্তু আমরা সরকার নিয়েই ভাবি, সমাজ নিয়ে নয়।

প্রথম আলো: 

সাংবাদিকতা ও গবেষণা—কোনটিতে আপনি বেশি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা নিয়েও তো আপনাকে ভুগতে হয়েছে?

আফসান চৌধুরী: আমার মামলাটি শেষ হয়েছে। যদিও অনেকের মামলা এখনো চলমান। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যখন পাস হয়, তখন আমি টেলিভিশনে টক শো করি। আইনমন্ত্রী আমাকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, অনলাইনে হয়রানি থেকে মেয়েদের উদ্ধার করার জন্য এই আইন করা হয়েছে। কিন্তু সেটা তো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হলো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটা মূলত প্রয়োগ করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরুদ্ধে। মূলধারার সাংবাদিকতাকে আটকানোর জন্য আরও অনেক আইন আছে।

এই আইনটি মূলধারার মিডিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োগ হয়েছে কম। সিংহভাগ মামলা হয়েছে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে। আমার বিরুদ্ধে মামলাটিও হয়েছিল ফেসবুকে পোস্টের কারণে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৯৮ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। এর মানে হচ্ছে এটা হয়রানিমূলক মামলা। উদ্দেশ্য হলো মানুষকে ভয়ের মধ্যে ও দুশ্চিন্তার মধ্যে রাখা।

প্রথম আলো: 

সত্তর ও আশির দশকে আপনারা যখন সাংবাদিকতা করতেন, তখনকার পরিবেশ কেমন ছিল?

আফসান চৌধুরী: সে সময় এ রকম মামলার ভয় ছিল না। তখন বেশি স্বাধীন মনে হতো। এখন মূলধারার সংবাদমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনায় দুর্বল। সরকার মূলধারার সংবাদমাধ্যম নিয়ে  চিন্তা করে না। সরকারের দুশ্চিন্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে। কিন্তু এটাকে তো সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারণ, কেউ দেশের বাইরে চলে গেলে তার বিরুদ্ধে এই আইন আর কার্যকর থাকে না। ডিজিটাল বাস্তবতা বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে ডিএসএ অ্যানালগ একটা আইন। দেশের মধ্যে যাঁরা থাকেন, তাঁদের ওপর মাতব্বরি। নিজে ভুক্তভোগী হিসেবে বলছি, ডিজিটাল আইনের সবচেয়ে খারাপ দিকটা হলো মামলা হলেই গ্রেপ্তার। এরপর তাঁকে আদালতে হাজিরা দিতে হবে। আমার বিরুদ্ধে আইনটা চার বছর চলেছে। এরপর পুলিশ বলছে যে এই মামলার কোনো ভিত্তি নেই। ঘাটে ঘাটে পয়সা দিতে হয়েছে। এই বয়সে জেলে গেলে সংসার চলবে কী করে—এটাই বেশি ভাবতাম।

প্রথম আলো: 

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা কেবল মুক্ত নয়, পুরোপুরি উন্মুক্ত। আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

আফসান চৌধুরী: সরকার ও সাংবাদিকতার মধ্যে যে সংলাপ হয়, সেটা হলো প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে। আমি যে সাংবাদিকতার কথা বলছি, সেটা হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিসর অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এটাই এখন সাংবাদিকতার প্রধান মাধ্যম। প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যম প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ইত্যাদি মিলে ১৫ শতাংশ মানুষের কাছেও পৌঁছে না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিসর অনেক বড়। সরকার যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিংবা পরবর্তীকালে সাইবার নিরাপত্তা আইন করল, তারও লক্ষ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ধরা। যদিও তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মানুষের নিরাপত্তার জন্যই এটি করা হয়েছে। আসলে সরকার এটা করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শঙ্কা থেকে। তারা সোসাল মিডিয়াকে যতটা আমলে নেয়, মূলধারার মাধ্যমকে ততটা নয়।

প্রথম আলো: 

আপনার অধিকাংশ কাজের উৎস ও লক্ষ্য ’৭১। স্বাধীনতাযুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে আপনাকে কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে কি না?

আফসান চৌধুরী: না, ওভাবে সরকারের কেউ বাধা দেননি। তবে গবেষণার অনেক তথ্য–উপাত্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নষ্ট করে ফেলেছে। এটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। একটি হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অপরটি সচিবালয়। স্বাধীনতার পর এমভি স্যান্দ্রা নামের একটি জাহাজে করে মুজিবনগর সরকারের দলিলপত্র নিয়ে আসা হয়েছিল। জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর কী হয়েছে কেউ জানে না। কত বড় দায়িত্বহীনতা। আমরা জেনেছিলাম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই বলেছিলেন। কিন্তু পরে সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি।

প্রথম আলো: 

স্বাধীনতার ইতিহাস প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেল কেন?

আফসান চৌধুরী: প্রকল্পটির পেছনে হাসান হাফিজুর রহমানের মতো মানুষ ছিলেন, তাই তাঁর সময়ে অনেক কাজ হয়েছে। তাঁর প্রতি আস্থা ছিল বলে সবাই দলিল দিয়েছেন। পরবর্তীকালে অন্যরা সেই আস্থা ধরে রাখতে পারেনি। সরকারেরও পরিবর্তন হলো। ‘স্বাধীনতার ইতিহাস’ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর অনেক দলিল তথ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যায় সচিবালয়ে রক্ষিত অনেক দলিল নষ্ট হতে থাকলে আমি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদকে সেগুলো রক্ষার জন্য অনুরোধ করি। তাঁকে ধন্যবাদ, তিনি দলিলগুলো তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন। পরে সেগুলো জাতীয় জাদুঘরে রাখা হয়। জানি না এর পরিণতি কী হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র নিয়ে কাজ করতে আমাকে কোনো আপস করতে হয়নি। আমি তো কাজ করেছি বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ নিয়ে। এসব ক্ষেত্রে কেউ বিতর্ক করেননি। আর আমার নিজের কাজে কোনো বাধা পাইনি। আমি তো ভদ্রলোকদের ইতিহাস লিখিনি, সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখেছি।

প্রথম আলো: 

আপনি একসময় বামপন্থী ছিলেন। পরবর্তীকালে আপনার লেখালেখিতে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পায়।

আফসান চৌধুরী: না, পায় না। আমি ইতিহাসবিদ। ইতিহাস নিয়ে যখন কাজ করি, আমি বামপন্থীও না, জাতীয়তাবাদীও না। তবে স্বাধীনতার আগে বা পরে আমরা যখন বেড়ে উঠেছি, তখন বামপন্থী হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পন্থা ছিল? আমরা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করেছি। রাষ্ট্রের অন্যায় নীতির বিরোধিতা করেছি। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর বামপন্থী নেতারা যেভাবে সরকারের সঙ্গে হাত মেলালেন, সেটা আমাকে বিস্মিত করেছে। তাঁরা গ্রামের বহু কর্মীকে বিপদে ফেলে ক্ষমতার বলয়ে চলে গেলেন। তখন আমার মনে হয়েছে, শহুরে বামপন্থীদের সঙ্গে গ্রামের সাধারণ মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। এ নিয়ে আমি বিশ্বাসঘাতকগণ নামে একটি উপন্যাসও লিখেছি। গ্রামের মানুষের রাজনীতি আর শহুরে ভদ্রলোকের রাজনীতি এক নয়, বাম অথবা ডান।

আমার উপলব্ধি হয়েছে যে শ্রেণিজোট ছাড়া ইতিহাস হয় না। ইতিহাসে নানা স্রোতোধারা থাকে। এ দেশে প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন ফকির ও সন্ন্যাসীরা। তাঁরাই প্রথম ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে। এখানে প্রধান শক্তি ছিল কৃষক বা হাইলা। ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধেও এই কৃষকদের অবদানই বেশি। ১৭৬০ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত সব আন্দোলনই কৃষকেরা করেছেন। পরে রাজনৈতিক কাঠামোয় যে আন্দোলন হয়, মধ্যশ্রেণি তার নেতৃত্ব দিয়েছে কিন্তু শক্তি তো কৃষকসমাজ। সিপাহি বিদ্রোহীরাও ছিলেন কৃষকের সন্তান। নেতৃত্বে পুরোনো সামন্ত বা মধ্যবিত্তরা। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় কোনো জমিদার ইংরেজের বিরোধিতা করেননি।

প্রথম আলো: 

বাংলাদেশের ইতিহাস বিচারে দুটি ধারা বিদ্যমান। একটি ধারা বলছে, সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হয়েছে বলেই একাত্তর হয়েছে। আরেকটি ধারা বলছে, সাতচল্লিশকে নাকচ করেই একাত্তর হয়েছে। আপনার বিশ্লেষণ কী?

আফসান চৌধুরী: ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে এক পাকিস্তানের কথা ছিল না। মুসলিম–অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল। পরে জিন্নাহ সেটি পরিবর্তন করেন ১৯৪৬ সালে। এটা কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের বা জিন্নাহ ও নেহরুর মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে। এক পাকিস্তান এক ভ্রান্ত ও অসার রাষ্ট্র ছিল, জন্ম থেকেই মৃত্যু অবধারিত। আর বাংলা ভাগের প্রস্তাব কংগ্রেসই নিয়েছে, বঙ্গীয় মুসলিম লীগ নেয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামে মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিলেও মূল শক্তি ছিল কৃষক। কৃষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া একাত্তর হতো না। সেই কৃষক কিন্তু অনেক বদলে গেছে। এখন শহুরে মধ্যবিত্ত গ্রামে গিয়ে বলুক—আমাদের কথা শুনতে হবে। কেউ শুনবে না।

প্রথম আলো: 

পাকিস্তান আমলে স্বাধীনতার লক্ষ্যে যত আন্দোলন বা তৎপরতা ছিল, তার বেশির ভাগই শেখ মুজিবকে কেন্দ্র করে। যদিও বামপন্থীরা ইয়া আজাদি ঝুটা হ্যায় আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন।

আফসান চৌধুরী: মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবও তো এসেছেন মুসলিম লীগ থেকে। বেঙ্গল মুসলিম লীগ থেকেই প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ হলো, পরে আওয়ামী লীগ। ’৪৭ সালে কলকাতায় ইনার গ্রুপ প্রথম স্বাধীনতার কথা বলেছে। শেখ মুজিবও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সবাই স্বাধীনতা চেয়েছে। ১৯৬২ সালে শেখ মুজিবের সঙ্গে মণি সিংহ ও খোকা রায় বৈঠক করেছেন। বামদের সমস্যা ছিল আন্তর্জাতিক সংযোগ। তাঁরা মস্কো বা বেইজিংয়ের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারেননি। মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে শেখ সাহেবের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল না। ভাসানীর দ্বন্দ্ব ছিল সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ সাহেবের সামনে কোনো বাধা ছিল না। তিনি ছয় দফা দিলেন। ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিব জেলখানা থেকে ভাসানীকে বার্তা পাঠালেন, ‘এখন সময় হয়েছে।’ অতএব এই জোট বাঁধলেই কিছু হয়। মুজিব ও ভাসানীর মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা তাঁদের শিষ্যরা বলেন। আমি এই দুই নেতার একসঙ্গে কাজ করার প্রবণতা বেশি দেখি।

প্রথম আলো: 

আপনি গ্রামের একাত্তর নিয়ে আলাদা বই লিখেছেন। এর কারণ কী?

আফসান চৌধুরী: পাকিস্তানি সেনারা ভেবেছে আক্রমণ করলে মানুষ প্রতিরোধ করবে না। এটা ছিল নির্বোধের ভাবনা। সবাই প্রতিরোধ করেছে কিন্তু ইতিহাসে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কৃষকসমাজের কোনো কথা নেই, নারীর কথা নেই, হিন্দুদের কথা নেই। আর্মি যখন কৃষকের খাবার লুট করে, মেয়েদের ঘর থেকে নিয়ে যায় তখন তাঁরাও রাষ্ট্রিক যুদ্ধের অংশ হয়ে গেলেন। সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও যুদ্ধ গ্রামে হয়েছে কিন্তু তাদের কথা লেখা খুব কম।

প্রথম আলো: 

বাংলাদেশের এখনকার সাংবাদিকতার দুর্বলতার দিক নিয়ে যদি কিছু বলেন?

আফসান চৌধুরী: বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সমাজ নেই, রাষ্ট্রই মুখ্য। কিন্তু বাংলাদেশ একটা রাষ্ট্রিক দেশ নয়, সামাজিক দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমাদের দেশের মানুষ রুটিরুজির বাইরে কেউ কিছু ভাবে না। শহরে বসে গ্রামের রূপান্তরটি বোঝা যাবে না। গত এক–দুই দশকে গ্রামে মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামের মানুষ শহরের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি নিয়ে ভাবে না, সে তার নিজের অর্থনীতি গড়েছে, বিশেষ করে অভিবাসন দিয়ে। সেখানে টাইলসের দোকান আছে, কফিশপ আছে। ফ্রিজ আছে। একজন ব্যবসায়ী ইলেকট্রনিক পণ্যের ডিলারশিপ পেতে কোম্পানিকে পাঁচ কোটি টাকা জামানত দিয়েছেন শুনেছি। গ্রামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি যাঁরা করেন, তা নিজেদের স্বার্থে, দলীয় ভাবনা থেকে নয়। সবই অর্থনীতি। কিন্তু মিডিয়ায় সামাজিক রূপান্তরের বিষয়টি আসে না।

বিদেশে যে আমাদের দেড়–দুই কোটি প্রবাসী আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের হাতে মোবাইল ফোন আছে। দেশে যে তাঁদের পরিবারের সদস্য আছেন, তাঁদের কাছেও। ফলে এখন আর প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক কিংবা অনলাইন পত্রিকা খবরের বড় উৎস নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় উৎস। সব মিলিয়েই মিডিয়া। লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল দিয়েই সাংবাদিকতা এগিয়ে নিতে হবে। ডিজিটালকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, মানুষ সরকারি ভাষ্য শুনতে চান না; বিরোধী কণ্ঠ শুনতে আগ্রহী। বিরোধী মানে ভিন্নমত।

প্রথম আলো: 

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ কী?

আফসান চৌধুরী: চ্যালেঞ্জ হলো আমি যে খবর দিতে চাই, তার প্রতি পাঠকের  আগ্রহ আছে কি না, সেটা দেখা। এখানে আমার ভাবনা বা ইচ্ছা চাপিয়ে দিলে হবে না। প্রথম আলোকে সাংবাদিকতা করতে হলে ডিজিটালকে শক্তিশালী করতে হবে, সবাই করছে। দ্বিতীয়ত, আমি দেশ ও জাতির জন্য সাংবাদিকতা করছি, এটা ভুলে যেতে হবে। একমাত্র খবরের সঙ্গে সাংবাদিকের সম্পর্ক। দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করা তার কাজ নয়, সেটা রাজনীতিকের ও সমাজকর্মীর। তবে আমাদের দেখার বিষয়, খবর বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে কি না।

প্রথম আলো: 

আপনি বিবিসিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এর সবলতা–দুর্বলতার দিক?

আফসান চৌধুরী: আমাদের খবর পরিবেশন করতে গিয়ে কোনো চাপ ছিল না। কিন্তু তাদের দেশে তো চাপ আছে। বিবিসি অনেক বেশি হুংকার ছাড়ে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে। নিজের দেশে পারে না। সেখানে বিবিসি তো সরকারি মাধ্যম। বিবিসিও পশ্চিমা ধ্যানধারণাপুষ্ট। একবার বিশ্ব ইজতেমার খবর পাঠালাম। তারা বলল, তবলিগ ইসলামিস্ট কোনো সংগঠন কি না। এই হলো তাদের জানাশোনার দৌড়। তবে একাত্তরে বিবিসি আমাদের খবরের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। সে সময় রেডিও প্রধান মাধ্যম ছিল। এখন তো সেটা হবে না। এখনো আমরা দেখছি, গাজার বিষয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম কী করছে। আবার রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ঠিক উল্টোটা করেছে। বর্ণবিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়েছে। ওরা নিজ দেশের সমালোচনা করে না।

প্রথম আলো: 

একাত্তর নিয়ে আপনার নতুন পরিকল্পনা কী?

আফসান চৌধুরী: আমি আটটি নতুন বই করার চিন্তা করছি। এর মধ্যে একটি হলো ‘একাত্তরপিডিয়া’। ৮০০ পাতার মধ্যে পুরো একাত্তরকে তুলে ধরার চেষ্টা করব। আরেকটি লিখব ‘একাত্তরটা কী ছিল’। সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। আমি জওয়ানদের নিয়ে একটি বই লেখার কথা ভাবছি। আমার কাছে দলিল আছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একাত্তর নিয়েও আলাদা বই লেখার ইচ্ছে আছে।

প্রথম আলো: 

আপনাকে ধন্যবাদ।

আফসান চৌধুরী: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

13 + 7 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য