Thursday, February 22, 2024

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমদাওয়াআল্লাহ্‌ ও আল্লাহ্‌র রাসুলের (সঃ) কথা ব্যক্ত করুন

আল্লাহ্‌ ও আল্লাহ্‌র রাসুলের (সঃ) কথা ব্যক্ত করুন

〽️লেখাঃ সাইদুর রহমান সৈয়দ

আলজেরিয়া তখন ফ্রান্সের অধীন ৷ ফ্রান্সের খৃষ্টানদের শাসনাধীনে হলেও সেখানকার লোকেরা ধর্মপ্রাণ মুসলমান ৷ ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ সব সময়েই ওলামা- মাশায়েখদের ভক্তি করেন ৷ আলজেরিয়ার মুসলমানদের কাছেও সেখানকার আলেমগণ ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র ৷ আলেমগণের সেখানে এত প্রভাব ছিলো যে, জনগণ ফ্রান্স সরকারের আইন না মানলেও আলেমগণের কথা মান্য করতেন ৷

সহজ সরল সাধারণ মুসলমানদের এই দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সেখানকার আলেমগণ কে কত বড় বুজুর্গ, কে কত বড় জ্ঞানী তা প্রমাণ করার জন্য কোরআন এবং সুন্নাহর কথা বাদ দিয়ে নিজস্ব মনগড়া বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করলেন ৷ আমাদের দেশে বর্তমানে যেমন এক শ্রেণীর আলেম বিভিন্ন কেরামতির কথা বলেন, দুনিয়াতে বসেই মানুষকে শহীদ বানিয়ে বেহেশতে পাঠিয়ে দেন, ইমাম মাহদীকে স্বপ্নে দেখেন, কোরআন এবং হাদীসের শব্দ বাদ দিয়ে আধুনিক সিক্স প্যাক, ক্রিকেট শব্দ বাছাই করে ইসলামের শিক্ষা দেন অনেকটা সেই রকম ছিলো আলজেরিয়ার আলেমদের অবস্থা ৷

এর মাঝে এক শ্রেণীর আলেম প্রচার করতে লাগলেন, তারা আল্লাহর কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে আলজেরিয়ায় ফ্রান্স সরকারের দিন ফুরিয়ে এসেছে ৷ স্বয়ং আল্লাহর কথা! সুতরাং জনগণ ফ্রান্স সরকারকে তেমন একটা পাত্তা দিতে চাইলো না ৷ আলজেরীয় ফরাসী সরকার বিপদে পড়লেন ৷ ফ্রান্সের ফরাসী সরকার দীর্ঘ আলোচনা পর সিদ্ধান্ত নিলো যে, সেনা পাঠিয়ে সাময়িকভাবে দমন করা গেলেও এটি কোন স্থায়ী সমাধান নয় ৷ স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন আলেমদের প্রভাব নষ্ট করা ৷ জনগণকে বুঝিয়ে দিতে হবে এসব আলেমগণের কোন আধ্যাত্মিক গুণ নেই ৷

ফ্রান্স সরকার এই কাজের ভার দিলেন ফ্রান্সের সেরা জাদুকর রবেয়ার উঁদ্যাকে ৷ এতদিন শুধু মানুষকে বিনোদন দেওয়ার জন্য উঁদ্যা জাদুর খেলা দেখিয়েছেন, এবার দেশের জন্য অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন আলেমদের মুখোমুখি হলেন ৷ আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সের সেরা থিয়েটারে উঁদ্যার জাদু প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলো ৷ শহরের গণ্যমান্য মুসলমান নেতা এবং বড় বড় আলেমদের উঁদ্যার জাদু দেখার জন্য বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হলো ৷

জাদুর অনেক কলা কৌশল দেখানোর পর, উঁদ্যা মঞ্চে আলজিয়ার্সের সেরা পালোয়ানকে আমন্ত্রণ জানালেন ৷ মঞ্চে লোহার একটি বাক্স দেখিয়ে বললেন, “দেখুনতো, আপনি ঐ লোহার বাক্সটি তুলতে পারেন কি না?” পালোয়ান অতি তাচ্ছিল্যে তার বাম হাত দিয়ে বাক্সটি তুলে ফেললো ৷ তারপর উঁদ্যা বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে পালোয়ানকে বললেন, “আমি আপনার সব শক্তি কেড়ে নিয়েছি ৷ আপনি আর এই বাক্সটি তুলতে পারবেন না ৷ বিশ্বাস না হয় চেষ্টা করে দেখুন ৷”

পালোয়ান হাসতে হাসতে অতি তাচ্ছিল্যে তার বাম হাত দিয়ে বাক্সটির হাতল ধরে টান দিলো ৷ কিন্তু এ কি! বাক্স উঠছে না ৷ এবার সে তার দুই হাতে বাক্সটি টানতে লাগলে, কিন্তু বাক্স এক ইঞ্চিও সরাতে পারছে না ৷ তার তাচ্ছিল্যের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেলো ৷ দর্শকদের চোখে বিস্ময় ও আতঙ্ক ৷ এমন বিশাল দেহী দৈত্যাকার লোককে জাদুকর মুহূর্তের মাঝে শিশুর চেয়েও দূর্বল করে দিলো ৷ উঁদ্যা এবার শহরের আলেমদের আহবান জানালেন পালোয়ানের শক্তি ফিরিয়ে দিতে ৷

মঞ্চে শহরের দু’জন সেরা আলেম এলেন ৷ এ যেন ফেরাঊনের জাদুকরের সাথে মূসা’র লড়াই ৷ আলেমদ্বয় এসে ঝাড়ফুঁক করলেন, দোয়া করলেন ৷ কিন্তু মুসা (আঃ) এর সামনে ফেরাঊনের জাদুকররা যেভাবে পরাজিত হয়েছিলো, তাদের সামনে ফ্রান্স সরকারের জাদুকর সেভাবে পরাজিত হয় নি ৷ তারা অনেক চেষ্টা করেও পালোয়ানকে ঐ বাক্সটি তোলার শক্তি ফিরিয়ে দিতে পারেননি ৷ শেষ পর্যন্ত উঁদ্যাই পালোয়ানের শক্তি ফিরিয়ে দিলেন ৷

উঁদ্যা যে খেলাটা দেখিয়েছিলেন যাদু বিদ্যায় একে “light and heavy chest” খেলা বলে ৷ পালোয়ানের শক্তি হরণের খেলায় উঁদ্যা বৈদ্যুতিক চুম্বকের সাহায্য নিয়েছিলেন ৷ মঞ্চের আড়ালে উঁদ্যার সহকারী ইশারা পেলেই বিদ্যু তরঙ্গ চালু করে দিতেন ৷ বাক্সের তলার লোহা, মঞ্চের উপরের লোহার পাটাতনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক চুম্বকের আকর্ষণে আটকে থাকত ৷ সেই লোহার মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীর কোন মানুষের পক্ষেই বাক্সকে উপরে তোলা সম্ভব নয়, কারন তখন বাক্সকে উপরে তুলতে হলে তাকে চুম্বকের আকর্ষণের চেয়েও বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হবে ৷

আলজেরিয়া এক সময় স্বাধীন হয় ৷ কিন্তু যেসব আলেমগণ কোরআন-সুন্নাহ’র কথা বাদ দিয়ে নানা রকম কিচ্ছা, কাহিনী, আধ্যাত্মিক গল্প বলে সাধারণ মানুষের ভক্তি আদায় করেছিলেন, উঁদ্যার যাদু বিদ্যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের সম্মান অনেকটাই হ্রাস পায় ৷

কেরামত, মুজিযা এসব নিয়ে ডঃ খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহিঃ) বলেন, “কোরআন নিজেই একটি মুজিযা ৷ সাত বছরের একটা শিশু আরবী ব্যকরণের নিয়ম মেনে সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্ত বলতে পারে ৷ কিন্তু ভার্সিটি পড়ুয়া বাংলা সাহিত্যের ছাত্র নির্ভূলভাবে গীতাঞ্জলী বলতে পারবে না ৷ মুজিযা বা কেরামত দিয়ে ইসলাম প্রচার হয় না ৷ ইসলাম প্রচার হয় কোরআন এবং সুন্নাহ দিয়ে ৷”

বৃটিশ শাসিত ভারতেবর্ষেও আলেমগণের বিশাল প্রভাব ছিলো ৷ ভারতবর্ষের মুসলমানরা বৃটিশদের আইন না মানলেও আলেমগণের কথা মান্য করতেন ৷ ভারতের কেরেলার কিছু কিছু খৃষ্টান পরিবারের খোঁজ নিলে দেখা যাবে এদের পূর্ব পুরুষ মুসলমান ছিলো ৷ বৃটিশ আমলে খৃষ্টান মিশনারীরা প্রথম যখন সেখানে খৃষ্ট মতবাদ প্রচার করতে শুরু করলো, তখন এক শ্রেণীর আলেম বলতে লাগলো, খৃষ্টানরা এতটাই নাপাক যে তাদের থু থু যেখানে পড়ে সেখানে ভালো ফসল হয় না ৷

আলেমরা যখন বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলের আসনে এ ধরনের কথা প্রচারে ব্যস্ত, খৃষ্টান মিশনারীরা তখন কিভাবে চাষ করলে অধিক ফসল ফলানো যায় কৃষকদের হাতে কলমে সে শিক্ষা দেওয়ার জন্য মাঠে কাজ করছিলো ৷ সহজ সরল মুসলমানদের অনেকেই সেদিন আলেমদের কথা শোনে, খৃষ্টানদের ঘৃণার চোখে দেখছিলো ৷ কিন্তু দু’চারজন অভাবী মুসলমান কৃষক খৃষ্টান মিশনারীদের কথামত চাষাবাদ করছিলো ৷ পরবর্তীতে দেখা গেলো, খৃষ্টানদের কথামত যারা চাষ করেছিলো অন্যদের তুলনায় তাদের জমিতে অধিক ফলন ফলেছিলো ৷ আলেমদের কথা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় অনেকেই তাদের প্রত্যাখ্যান করে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে ৷

যদিও কোরআন এবং হাদীসের কথাই ইসলাম, তবুও অধিকাংশ মুসলমান আলেমদের কথাকেই ইসলাম মনে করেন ৷ অনেকে বিশ্বাস করেন আলেমগণই তাদের আদর্শ ৷ সাধারণ মানুষের এই বিশ্বাসের তারা কতটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে ৷ আলেম সাহেব যে প্যান্ডেলে বসে গায়ে চাদর জড়িয়ে শীতের রাতে নবী-রাসূলের জীবনী বয়ান করছেন, সেই প্যান্ডেলের বাঁশ, চাল, ডাল, টাকা জোগাড় করা এতিম মাদ্রাসার ছাত্রটির গায়ে শীতের কাপড় আছি কিনা সে খবরটাই তিনি রাখেন নি ৷

যে ছেলেটা ভার্সিটি থেকে বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে বেকার বসে আছে, মূসা’র কাছে ফেরাঊনের যাদুকরদের হেরে যাওয়ার ইতিহাস তার কোন কাজে আসবে না ৷ যে মেয়েটার স্বামী যৌতুকলোভী, অযোগ্য, অপদার্থ, স্ত্রী’র হক্ব আদায় করে না; সে মেয়েকে যতই স্বামী ভক্তির হাদীস শোনান কোন লাভ না ৷ যে অসুস্থ লোকটার পকেটে ঔষধ কেনার টাকা নেই, তাকে যতই ঈমাণদীপ্ত দাস্তান শোনান কোন লাভ নেই ৷

আমাদের আলেমগণ সবকিছুতেই ইয়াহুদী, নাসারা, কাফেরদের ষড়যন্ত্র দেখেন; শুধু নিজেদের ব্যর্থতা দেখেন না ৷ অমুসলিমদের সমালোচনায় যতটা সরব, আত্মসমালোচনা- আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে তারা ততটাই নিরব ৷ শুধু ওয়াজ-মাহফিলে আধ্যাত্মিক কিচ্ছা কাহিনী বলে নিজের পান্ডিত্য জাহির না করে বাস্তবে সমাজের সকল ক্ষেত্রে কোরআন এবং সুন্নাহ’র আদর্শ বাস্তবায়ন করতে আলেমদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে ৷ কারন দিনশেষে সবাই আলেমদের কাছেই ইসলামী জ্ঞান অর্জন করে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

2 × five =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য