Wednesday, February 28, 2024

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমযুগ জিজ্ঞাসাইসলামকে বদলে দিতে, অস্ত্র যখন নুয়ান্স

ইসলামকে বদলে দিতে, অস্ত্র যখন নুয়ান্স

অনুবাদক: সাইফুল্লাহ বিন ইউসুফ

‘নুয়ান্স’ কথাটা শুনতে ইদানীং বিরক্তই লাগে।

[নোটঃ ‘Nuance’ শব্দটির সম্ভবত কোন সঠিক বাংলা পরিভাষা নেই। এর অর্থ করা যায় এমন – ‘কোনোকিছুর অতি সূক্ষ্ম অন্তর্নিহিত অর্থ বা ডিটেইল’। এই অনুবাদে কিছু জায়গায় প্রায়োগিক অর্থ দেখে অনুবাদ করা হয়েছে- অনুবাদক]

হার্ভার্ডে থাকতে একটা কোর্স করেছিলাম, ইসলামে নারীদের অবস্থান নিয়ে। পড়িয়েছিলেন একজন মিশরীয় মুসলিম নারী। ফেমিনিস্ট ছিলেন, হিজাবও করতেন না। শুধু তাই না, তার ক্লাসের মূল আলোচ্যই যেন ছিল তার এই অ-হিজাবী, মুসলিম-ফেমিনিস্ট অবস্থাটাকে সূক্ষ্মভাবে বুঝা! ছোট ওই ব্যাচটায় একমাত্র আমাকেই দেখে মনে হতো যে- আমি মুসলিম। আমার ইসলামী ধাঁচের চলাফেরার ব্যাপারে কারোই কোন আগ্রহ ছিল না। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল- এই ধরণের চলাফেরায় আমরা মুসলিমরা কেমন অনুভব করি।

কোনো এক সপ্তাহে আমাদের পড়ার টপিক ছিল- ইসলামে নারীর পোশাক। যে বই পড়ানো হচ্ছিল, সেখানে লেখিকা (ফাতিমা মেরনিসি, ‘মুসলিম’ নারীবাদী) জোর দিয়ে বলতে চান যে পরিপূর্ণ কালো পোশাক একধরণের অত্যাচার, এই ‘জঘন্য’ ব্যাপারটা নারীদের কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করে।

তো আমি কি করলাম, ক্লাসে গেলাম একেবারে ফুল-ব্ল্যাক পরে; কালো আবায়া, কালো হিজাব, কালো জুতো। ইসলাম, নারীবাদ আর পোশাকের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে সেই ক্লাস করতে করতে সবাই খেয়াল করতে লাগলো যে, আমি ঠিক সেই ড্রেসটাই পড়ে এসেছি যেটার ব্যাপারে লেখিকা বেশ তাচ্ছিল্যভরে বলেছেন যে কেউ নিজের ইচ্ছায় এই পোশাক পরতে পারে না। কেমন না ব্যাপারটা!

শেষমেশ প্রফেসর সাহেবা সরাসরি জিজ্ঞেস করেই বসলেন, “এই আগাগোড়া কালো কি ইচ্ছে করে আজকেই পরে এসেছো?”

বললাম, “হতে পারে। হয়তো আমি আসলেই একজন স্বাধীন, কর্তৃত্বশালী, শিক্ষিত হার্ভার্ড মুসলিমা, যে নিজের ইচ্ছায়ই যা খুশি পরেছে। অথবা হয়তো আমার বাবা আমাকে জোর করে পরিয়েছে। আসলে ব্যাপারটার সূক্ষ্মতাটা বুঝা দরকার। আমরা তো আর নিশ্চিত জানতে পারবো না!”

হার্ভার্ড প্রফেসরদের এমনিতে ‘সূক্ষ্মভাবে বুঝা’ জিনিসটা অনেক পছন্দ। কিন্তু এই প্রফেসর সাহেবাকে দেখে তখন খুব একটা খুশি হলেন বলে মনে হলো না, বরং তাজ্জব বনে গেলেন!

‘সূক্ষ্ম বুঝ’ কথাটা ততদিনে আমার খুবই বিরক্ত লাগা শুরু করেছে।

শুধু একাডেমিয়া না, এর বাইরেও প্রতিদিন মানুষের সাথে কথা বলতে,স্যোশাল মিডিয়ায় আলাপে বারবার এই নুয়ান্স বা সূক্ষ্মভাবে বোঝার ব্যাপারটা চলে আসে।

এভাবে গত ১০ বছরে বুঝলাম যে, এই ‘নুয়ান্স’ আসলে একটা কোডওয়ার্ড। এটা দিয়ে আসলে বুঝায় “ইসলামে যেসব জিনিস থাকা দরকার বলে আমার মনে হয়।”

একদম সবাই জানে এমন জিনিস, যেটা আজীবনই সাদা-কালো ই ছিলো, এই ‘নুয়ান্স’ এর দোহাই দিয়ে সেখানেও বলা হয় যে “সব এত সাদা-কালো না, মাঝে অনেক অস্পষ্ট জায়গা আছে।” যেই ব্যাপারে “আমার কি মনে হয়” এর কোন দাম নেই, জাস্ট মেনে নিতে হবে আল্লাহর হুকুম, সেখানে এই ‘নুয়ান্স’ এর কথা এনে বলা হয় যে, আসলে সব বিধান এত কাট-কাট না; আমাদের ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিকেও মাঝেমধ্যে প্রশ্রয় দেওয়া উচিৎ। সালাফদের মত “سمعنا و أطعنا” (শুনলাম ও মানলাম) না বলে এই সূক্ষ্মভাবে বুঝা নিয়ে বিশাল আলাপ তোলা হয়।

কিছু সেলেব্রেটি মুসলিম স্পিকার তো এই নুয়ান্স এর ওস্তাদ। সমকামী অধিকার কি সমর্থন করা যাবে? এটা সোজাসুজি বলা যায় না, সূক্ষ্মভাবে বুঝা লাগবে। ইসলামকে অবমাননা করা কি মেনে নেওয়া যায়? এটা সোজাসুজি বলা যায় না, সূক্ষ্মভাবে বুঝা লাগবে। ‘উলুমুল কুরআন আর ক্বিরাত এর বিষয়গুলো কি নির্ভরযোগ্য? এটা সোজাসুজি বলা যায় না, সূক্ষ্মভাবে বুঝা লাগবে।

একটা জিনিস বলে নেই, যেন ভুল বোঝার অবকাশ না থাকে। কিছু জিনিস আসলেই অনেক জটিল আর সেগুলো বুঝতে সাদা-কালোর বাইরেও কিছুটা ভাবা লাগে, আমাদের আলিমরা হাজার বছর ধরে এসব ব্যাপারগুলো প্রতিটা দিক নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করেছেন আর বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সেইসব ব্যাপারের পরিবর্তিত বিধান কি হবে তা নিয়ে কার্যকর ফ্লেক্সিবল সমাধানও দিয়েছেন। কিছু ব্যাপার নিয়ে বৈধ মতপার্থক্যও রয়েছে আমাদের মাজহাবগুলোর মাঝে। ইসলামের সবই যে একদম হয় সাদা নয়তো কালো– এমনটা কেউ বলছে না।

কিন্তু– আর এই কিন্তুটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ– এগুলো ছাড়া অন্যান্য ব্যাপারগুলো সবসময়ই একদম স্পষ্ট আর সোজা-সাপ্টা ছিল আর তেমনটাই থাকা উচিৎ। এখানে না বুঝার মতো কিছু তো নেই। ‘নুয়ান্স’ এর নামে দ্বীনের মধ্যে বিদ’আত আনার, দ্বীনকে বদলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহর দেওয়া দ্বীন স্বয়ংসম্পূর্ণ, এখানে অকারণে ‘নতুন করে ভাবার’ কোনো সুযোগ নেই। এগুলো আসলে মডার্নিস্ট আবেগ-অনুভূতির সাথে খাপ খাওয়ানো, মডার্নিস্ট বুঝ এর কাছে ইসলামকে পাশ করাতে চাওয়া আর দ্বীন মানতে চায় না এমন আধুনিক মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া- এসবের ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়া কিছুই না। এসব না করলে তো আবার আজকাল দাম পাওয়া যায় না!

এই ‘নুয়ান্স’ কথাটাকে একপ্রকার অস্ত্রই বানিয়ে ফেলা হয়েছে। খুব কাজেও দিচ্ছে সেটা। কেউ ইসলামে সমকাম হারাম হওয়া নিয়ে যা বলছে সেটা আপনার পছন্দ হচ্ছে না? বলে দিন যে, সে এটা সূক্ষ্মভাবে বুঝতে পারছে না। কুরআনে ক্বওমে লুত এর ধ্বংস হওয়ার আয়াতের সোজাসাপ্টা তাফসির ভালো লাগছে না? বলে দিন যে মুফাসসির একদমই ব্যাপারটার সূক্ষ্মতা ধরতে পারেনি, আসলে ক্বওমে লুতের অপরাধ ছিল শুধু ‘কনসেন্ট’ ছাড়া কাজটা করা। হিজাব ওয়াজিব বলতে চাচ্ছে? পছন্দ হচ্ছে না ব্যাপারটা? বলে দিন যে আসলে কোনোকিছুই এভাবে নিশ্চিত বলা যায় না।

সমাজের সাথে খাপ খাওয়াতে আপনি নিজে থেকে আপনার মনগড়া জগাখিচুড়ী ‘ইসলাম’ বানিয়ে নিয়েছেন। এবার সেটা নিয়ে যারই আপত্তি থাকবে, বলে দিন যে সে নুয়ান্স বুঝে না, ব্যাস!

এই প্রবণতা আমাদের আশেপাশের প্রিয় ‘জনদরদী’ ইমামদের থেকে শুরু করে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এক মুসলিম মহিলা আমাকে বলেছিলেন, “সবকিছু সাদা-কালো থাকলে কেমন যেন লাগে,যে কিছু বদলানো যাবে না। ভয়ই লাগে এমনটা ভাবলে! এর চেয়ে ধূসর জায়গাগুলোই ভালো লাগে। ধূসর জায়গা মানে নিজের মতো করে কিছু বুঝে নেওয়া যাবে, এরকমটা ভালো লাগে আমার।”

কথাগুলো বলেছিলেন উনি আট বছর আগে, কিন্তু এখনও স্পষ্ট মনে আছে। খুবই কেমন যেন লেগেছিল কথাগুলো, ভুলতে পারিনি কখনো। তার এই কথাগুলো থেকেই বুঝা যায় যে আধুনিক মানুষ আসলে কি চায়; সে পরম কোনো মানদন্ড চায় না, পরিবর্তনশীল কিছু চায়।

সত্যের চেয়ে, তার মন কি বলে সেটা মানতেই তার ভালো লাগে।

আধুনিকতার খাতিরে আমরা ‘ব্যক্তি’ কে এত বেশি ওপরে অবস্থান দিয়ে ফেলছি যে ব্যক্তির নিজের ইচ্ছা, সুবিধা, আবেগ এসবকে সত্যের ওপর স্থান দিচ্ছি। কেন? নুয়ান্স!

অনেকে আবার এই নুয়ান্সের পথ ধরেই আরেকটা পুরোনো লাইন কপচায়– “সবকিছুই তো আসলে আপেক্ষিক।”

পোশাকের ব্যাপারে আমার এক পরিচিত মুসলিম নারী বলেছিলেন, “শালীন পোশাক বলতে আসলে কি বোঝায়? আমি যদি শার্ট আর শর্টস পরি, সেটা বোরখার চেয়ে কম শালীন, কিন্তু আবার বিকিনির চেয়ে তো বেশি শালীন! আসলেই, সবই আপেক্ষিক।”

আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। এটা আসলে একটা সস্তা কৌশল, যেটা দিয়ে অনেকে চায় কোনো পরম মানদন্ড না রাখতে। সবই যদি আপেক্ষিক হয়, তাহলে তো কোনো ধ্রুব কোনোকিছুই নেই। কিছুই নিশ্চিত না আর। সবই উন্মুক্ত; আরেকবার ভেবে দেখার জন্য, নতুন করে বুঝার জন্য, যাচাই করার জন্য। সেটার জন্য অবশ্য স্কলারও হতে হবে না, সবাই-ই পারবে করতে। সবাই-ই চায় ইসলামকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিতে, ইসলামের কি কি সে রাখতে চায় আর কি কি বাদ দিতে চায় তা বলতে, বলতে চায় কোন কোন বিষয়গুলো একদম তাদের মনমতো করে বদলে নিতে চায় সেটাও। এই যেমন, শালীনতার নতুন সংজ্ঞা পাওয়া গেলো!

সেই মহিলা আরেকদিন আমাকে বলছিলেন, “আমরা তো কিছুই জানি না,আর জানা সম্ভব ও না। ভবিষ্যতে কি হবে কেউ জানে? আমাদের আছে শুধু বর্তমানটা, এই মুহূর্তটা, আর তাই আমাদের সেটাই করা উচিৎ যেটা করতে আমাদের ভালো লাগে, আমরা খুশি হই যেটায়। ভাল মানুষ হলেই তো হলো।”

এটা আসলে আমাদের ইলমের উৎসগুলোকেই অস্বীকার করার একটা চেষ্টা। মুসলিমদের জ্ঞানের উৎস- কুরআন ও সুন্নাহ। আল্লাহর বাণী ও তার রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ। এখন আপনি যদি বোকা সেজে ভান করেন যে আমাদের আসলে দুনিয়া, ভবিষ্যত, জীবনে কিভাবে চলবো এসব সম্বন্ধে জানার জন্য কোন উৎস নেই; তাহলে আপনি ওই নুয়ান্স দিয়েই সব চালিয়ে দিতে পারবেন,নিজের নফসের খাহেশাত ছাড়া অন্য কিছুর কথা না ভাবলেও চলবে।

এসব নুয়ান্সের ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার উপায় আল্লাহ কুরআনেই সুন্দরভাবে বলে দিয়েছেনঃ

هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ ۖ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ ۗ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ ۗ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ (7)رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ (8)

“তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেনঃ আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।

হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করোনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সব কিছুর দাতা।” [সূরা ইমরান(৩): ৭-৮] আর নিশ্চয়ই আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

1 × 1 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য