পৃথিবী কি ঘুরে? শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ কর্তৃক এ প্রশ্নের উত্তর:
সম্মানিত পিতা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। পর কথা :
বর্তমানে সৌদি আরব পঞ্চম সম্মেলনে একদল মহাকাশ গবেষকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
তাদেরই একজন আজ সকালে বিজ্ঞান বিভাগে একটি সম্মেলন করে। সেখানে সবাই আমরা এই মহা সৃষ্টি জগতে স্রষ্টার মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অবলোকন করেছি।
আমরা তাতে সবাই গোল পৃথিবী দেখেছি। দেখেছি, এই পৃথিবী মহাশূন্যে ভাসছে। সামান্য সন্দেহের অবকাশ নেই যে, জমিন, নক্ষত্ররাজি, সূর্য ও মহাশূন্যের সবকিছুই অহর্নিশ চলছে।
পৃথিবী ঘুরে না—কিছু আলিমের এই মতের মাধ্যমে দ্বীনের কিছু দুশমন ও দ্বীনের শত্রু বিরোধিতা করছে। এই মতকে সুযোগ লাগিয়ে তারা দ্বীনের আলিম ও ছাত্রদের সমালোচনা করছে।
অনুগ্রহপূর্বক এই মহাকাশ ও মহাজাগতিক বিষয়ে শরীয়াতের দৃষ্টিকোণ যদি উল্লেখ করতেন।
জবাব :
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের জানিয়েছেন যে, তিনি জমিনকে করেছেন স্থির, তিনি তা পাহাড়ের মাধ্যমে করেছেন প্রতিষ্ঠিত ও অটল।
তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য জমিনকে স্থির করেছেন। জমিনে তারা চলবে। জমিনে তারা ঘুমাবে। জমিনে তারা চাষাবাদ করবে। জমিনে তারা গাছগাছালি লাগাবে।
অনুরূপভাবে তারা জমিনের সমুদ্রে রিজক অন্বেষণের জন্য যা কাজ করার করবে।
অতএব, কেউ যদি মনে করে বা বিশ্বাস করে যে, পৃথিবী শূন্যে ভাসছে—তাহলে তার কথা সত্য হওয়া আবশ্যক নয়; তাতে হোক সে কমিউনিস্ট বা খৃষ্টান বা ইহুদী বা মুসলিম। আল্লাহর কালাম সবচেয়ে সত্য।
মানুষ কখনো কোনো কিছুর ব্যাপারে মনে করে যে, জিনিসটা নড়াচড়া করার মাধ্যমে ভাসছে বা ঘুরছে। অথচ তার সেই কথাটা বাস্তবসম্মত নয়।
তা কখনো বায়ুমণ্ডলে হতে পারে আবার কখনো তার বাহ্য দৃষ্টিতে মনে হতে পারে। সেই জিনিসটা তার থেকে অনেক দূরে।
তারা সেই জিনিসটা স্পর্শ করেনি আবার তারা যা বলে বা বিশ্বাস করে, সেই ব্যাপারে নিশ্চিতও নয়।
তার ব্যাপারে আল্লাহ বলেননি, তা নড়ছে। তিনি যা বলেছেন তাই বাস্তব ও সত্য। আর মানুষেরা দেখে নক্ষত্ররাজি চলছে, এটা তেমন যেমনটি তিনি বলেছেন।
এ থেকে তারা মনে করে যে, পৃথিবী ঘুরছে, পৃথিবী ভাসছে। তা নড়াচড়া করছে।
অথচ আল্লাহ বলেছেন, তিনি আমাদের জন্য তা স্থির করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, তিনি জমিনে সুদৃঢ় পাহাড় বসিয়েছেন, যাতে তোমাদের নিয়ে তা হেলে না পড়ে।
আল্লাহ জানাচ্ছেন যে, তিনি জমিনকে পাহাড় দিয়ে স্থির করেছেন ও গেড়ে দিয়েছেন। জমিনের পেরেক করেছেন।
অতএব, আল্লাহর কথা আঁকড়ে ধরা ও তা গ্রহণ করা ওয়াজিব। জমিন হেলে পড়ে না, নড়েচড়ে না এবং তা ঘুরে না।
জমিন ঘুরলে, কম্পনের কারণে মানুষ তা বুঝতে পারত। সামান্য কম্পন হলেই তো মানুষ বুঝে ফেলে।
বড় কম্পন হলে তার আশপাশ ধ্বংস হয়ে যেত। সামান্য কম্পন হলেই ঘরবাড়ি ভেঙে যায় এবং গাছগাছালি উপড়ে যায়।
এইসব মহাকাশবীদপ্রমুখদের থেকে মানুষেরা এসব কথা বলে। তারা মনে করে যে, এসব প্রমাণ করে জমিন নড়াচড়া করে এবং ঘুরে।
আমরা তাদের এসব মানি না। কুরআন ও সুন্নাহর দলীল ছাড়া আমরা এসব মানব না অথবা তখন মানব যখন আমরা তা স্পর্শ করতে পারব বা স্বচক্ষে দেখব বা সন্দেহাতীতভাবে বুঝতে পারব।
এমনটা হলে সেই সময় আমরা আয়াতের তাবীল করবো যে, মানুষের জন্য ক্ষতিকর এমন অস্থিরতা ও কম্পন থেকে সুদৃঢ় করেছেন এবং ঘুরার কারণে যে নড়া মানুষের জন্য ক্ষতিকর না এমন নড়া আয়াতের পরিপন্থি নয়।
আমরা হেলে পড়াকে অস্থিরতা ও কম্পন দ্বারা তাফসীর করব এবং বলব, জমিন ঘুরে ও চলে তবে হেলে পড়ে না। তবে এ তাফসীরের জন্য দলীল প্রয়োজন।
যে ব্যক্তি মহাকাশবীদদের তত্ত্বে সন্তুষ্ট এবং তা দেখেছে, অবলোকন করেছে এবং তা-ই বিশ্বাস করে—তাহলে তার ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই।
আর যে ব্যক্তি তাদের তত্ত্ব বিশ্বাস করে না এবং এর বিপরীতে কোনো কিছু প্রকাশও পায়নি—তাহলে তার ব্যাপারেও সমস্যা নেই। কারণ, সে তার বিশ্বাসকে সঠিক মনে করে এবং কুরআনের অনুকূলে বলে বিশ্বাস করে।
প্রত্যেকে নিজ বিশ্বাসে বিশ্বাস করতে পারে।
যে ব্যক্তি কুরআন থেকে যা বুঝেছে তা যদি বিশ্বাস করে, (করতে পারে)।
অপরপক্ষে যে ব্যক্তি তাদের তত্ত্ব অবলোকন করে ও তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং মনে করে যে, জমিনের নড়া হেলে পড়া পরিপন্থি নয়।
এছাড়া বিশ্বাস করে জমিন স্থির তবে তা ঘুরে। আর ঘুরাটা স্থিরতা পরিপন্থি নয়, পাহাড় দিয়ে সুদৃঢ় করে দেওয়া পরিপন্থি নয় এবং হেলে পড়া পরিপন্থি নয়।
যে ব্যক্তি এমনটা বিশ্বাস করবে, অন্তর দিয়ে মানবে এবং জ্ঞানের মাধ্যমে সত্যায়ন করবে—তাকেও দোষারোপ করা যাবে না।
কেউ এমনটা বিশ্বাস করলে, অন্যদেরকে দোষারোপ করার তার কোনো সুযোগ নেই, অন্যদের সমালোচনা করারও সুযোগ নেই।
কারণ, সে যা জেনেছে তারা তা জানতে পারেনি। প্রত্যেকে তার জানা অনুযায়ী বিশ্বাস করবে।
যেমন কারো জ্ঞানে মনে হয়েছে, অমুক জিনিসটা হারাম বা ওয়াজিব কিন্তু আরেকজনের কাছে তা মনে হয়নি, সন্দেহপূর্ণ রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয়জন প্রথমজনকে দোষারোপ করতে পারবে না।
অতএব, দলীল হচ্ছে, যে জানে না তার ওপর। যে ব্যক্তি জানতে পেরেছে এবং মুখস্থ করেছে, সে দলীল তার ওপর যে জানতে পারেনি ও মুখস্থ করেনি।
সবার দলীল রয়েছে। সবার প্রমাণ রয়েছে।
আমি বিশ্বাস করি এবং কয়েকবছর আগে এ নিয়ে আমি একটি কিতাবও লিখেছি—আমি বিশ্বাস করি, জমিন স্থির, যেমনটি আল্লাহ বলেছেন; জমিন ঘুরে না, অস্থিরও নয় এবং নড়েও না। বরং তা সুদৃঢ়।
এ ব্যাপারে আলিমদের মতামত উল্লেখ করেছি।
কেউ যদি এর বিপরীতে বিশ্বাস করে এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়—তবে তাকে দোষারোপ করা যাবে না। সে তার বিশ্বাসে বিশ্বাস করবে।
আমাদের জন্য আবশ্যক নয় যে, তার সাথে একমত হতে হবে এবং তার কথা অন্ধভাবে মেনে নিতে হবে।
তার জন্যও আবশ্যক নয় যে, আমাদের মত এবং আমাদের মতের সাথে যারা মত দেয় তাদের মতকে অন্ধভাবে মেনে নিতে হবে।
হ্যাঁ।
