Thursday, February 22, 2024

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমদাওয়াবিশ্বাস, বিজ্ঞান ও যুক্তিঃ নাস্তিকতার অপনোদন ও স্রষ্টার অস্তিত্বের যৌক্তিক প্রমাণ- ৩য়...

বিশ্বাস, বিজ্ঞান ও যুক্তিঃ নাস্তিকতার অপনোদন ও স্রষ্টার অস্তিত্বের যৌক্তিক প্রমাণ- ৩য় পর্ব

নাস্তিক্যবাদ এবং অজ্ঞেয়বাদ এর ইতিহাসঃ

ইংরেজীতে Atheism (নাস্তিকতা) শব্দের উৎপত্তি হয় ষোড়শ শতাব্দীতে ( উইকিপিডিয়া), এই নাস্তিক্যবাদের উৎপত্তি হয় ইউরোপে। তবে প্রাথমিক সময়ে  নাস্তিক শব্দটি একটি নেতিবাচক শব্দ ছিলো, মানুষ সাধারণত সেই সময় পরিচিতি পেতে চাইতনা, সমাজে তাদের ঘৃনার চোখে দেখা হতো। ইউরোপে মধ্যযুগে ছিলো গীর্জার কঠোর শাসন, গীর্জার ধ্যান-ধারনার সাথে কারো যদি মতভিন্নতা পরিলক্ষিত হলে, সেই সময় তাদের উপর নেমে আসত নিষ্ঠুর নির্যাতন। কত মানুষকে তখন ধর্মত্যাগী আখ্যায়িত করে শাস্তি দেয়া হয়েছে, কতজনকে হত্যা করা হয়েছে! কত নারীকে ডাইনী উপাধি দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কত বিজ্ঞানীর সত্য বাক্যকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে যেমন, গ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২), প্রান বাঁচানোর জন্য তিনি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন কোপার্নিকাসের তত্ত্ব ভুল, পৃথিবীই সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত। এই সময় কিছু ব্যাক্তি বিচ্ছিন্ন ভাবে গীর্জার কর্তৃত্ব কে চ্যালেঞ্জ করে শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তারাই তখন নাস্তিক হিসাবে পরচিতি লাভ করেন, সমাজে তাদের ঘৃনার চোখে দেখা  হতো।

অন্ধকারচ্ছন্ন ইউরোপ এই অচলায়তন থেকে বের হওয়ার পথ দেখলো ফরাসী বিপ্লব ও শিলপ বিপ্লবের হাত ধরে। আড়ালে থেকে ফরাসী বিপ্লবের কলকাঠি নেড়েছিলো ফ্রীম্যাসন্স ( ফ্রীম্যাসন্সরা ছিলো শয়তানের উপাসক, অদ্যবধি তাদের অস্তিত্ব আছে, এই ব্যাপারে এই লেখক কর্তৃক লিখিত, বুদ্ধি বৃত্তিক ভাবে বিশ্ব কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়  এদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)  নামক এক গুপ্ত গোষ্ঠী, ফরাসী বিপ্লবের চালিকা শক্তি হয়েও তারা ফ্রান্সের শাসন ক্ষমতায় আসীন হতে পারেনি, বিপ্লবের ফসল ভোগ করেছিলো নেপোলিয়ান বোনাপার্ট, কিন্তু এরাই নতুন এক আন্দোলনের চালিকা শক্তি হলো, এই আন্দোলনের নাম Enlightenment ( আলোকায়ন) , এই আন্দোলন অন্ধকার থেকে তথাকথিত আলোর দিকে যাত্রা। গীর্জার কর্তৃত্ব তখন ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়, বলা যায় গীর্জার বিরূদ্ধে এক অভ্যুথ্যানের সূচনা হয়। নতুন নতুন দর্শন তত্ত্ব, ধ্যান-ধারনা, জ্ঞান- বিজ্ঞানের নয়া আবিস্কার, নব নব প্রযুক্তি যেন তাদের দুর্বার করে তুলল। গীর্জার সাথে মানুষের বন্ধন ঢিলে হয়ে গেল, শুধু মাত্র  গীর্জার  রবিবার কেন্দ্রিক গুরুত্ব বজায় থাকলো। পরবর্তীতে  বার্ট্রান্ড রাসেল, ইমানুয়েল কান্ট, সিগ্মুন্ড ফ্রয়েড, চার্লস ডারউইন, কার্ল মার্ক্স  ইত্যাদী ব্যক্তি বর্গ তাদের নাস্তক্যবাদী তত্ত্ব, দর্শন, চিন্তা-চেতনা দ্বারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আবেশিত করে করে ফেলল। ধীরে ধিরে অনেক দার্শনিক, বিজ্ঞানী, সমাজ চিন্তকের আবির্ভাব হলো, যারা নিজেদের  নাস্তিক দাবী করত।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে ডারউইন কিংবা ফ্রয়েডের তত্ত্ব বিজ্ঞানের একমাত্র সত্য বলে পরিগণিত হলো। মূলতঃ মানুষ গীর্জার শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এমন কিছু রসদ খুজছিলো যা গীর্জার শিক্ষাকে মোকাবেলা করতে পারে, এই ধরনের দার্শনিক ও ব্যাক্তি বর্গ তাদের তা দিতে সমর্থ হলো। যা কিছু দেখা বা ছোয়া যায়, তাই সত্য, এর বাহিরে কোনো সত্য নেই। এই ভাবে বস্তুবাদী সভ্যতার সুত্রপাত হলো। বিজ্ঞান দিয়ে স্রষ্টাকে খুঁজে পাওয়া যায়না, তাই স্রষ্টা নেই, এমন ধ্যান ধারনা অনেকের মধ্যেই বধ্যমুল হলো। ইউরোপীয় উপনিবেশ গুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান উপনিবেশগুলোতে রপ্তানী করা হলো, সেই সাথে নাস্তিক্যবাদী ধ্যান ধারনাও। ধর্ম থেকে রাস্ট্রকে পৃথক করো এরূপ স্লোগান চারিদিকে উঠলো। কার্ল মার্ক্স/ ফেডরিক এঙ্গেলস এর সমূহবাদ (Communism) এক সময় জনপ্রিয় রাজনৈতিক/ অর্থনৈতিক মতবাদ হিসাবে গৃহীত হলো।

অজ্ঞেয়বাদ শব্দটি মূলতঃ প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৮৬৯ সালে, লন্ডনে এক সেমিনারে,  টি এইচ হিউক্সলি, ডারউইন বাদের একজন ধারক প্রথম তা ব্যবহার করেন। নাস্তিক্যবাদ এবং অজ্ঞেয়বাদের মধ্যে যা সাধারণ তা হলো উভয়ই স্রষ্টার অস্তিত্বের ইতিবাচক বিবৃতি দেয়না। আmaদের আলোচনা যেহেতু তাদের এই সাধারণ বিশ্বাসের অপনোদন করা, তাই নাস্তিক্যবাদকে অপনোদন করলেই অজ্ঞেয়বাদও  এর অনন্তর্ভুক্ত হবে। আর তাই এই নিবন্ধের  পরবর্তি অংশে  আমরা শুধু  নাস্তিক্যবাদ শব্দেরই ব্যবহার করবো। 

কেনই বা ইউরোপে ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা পিছু হটলো, নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মহীনতা বা সেকুলারিজমের কাছে তার পরাজয় বরন করে নিতে হলো, সংক্ষেপে তার কারন গুলো একত্রিত করা যাকঃ

১। ইউরোপে ধর্মীয় শাসন বলতে ছিলো খৃস্ট ধর্মের শাসন, বিচ্ছিন্ন ভাবে ইহুদীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করলেও, মূলধারার সমাজে তারা কোনো ধর্মীয় প্রভাব তৈরী করতে পারেনি। খৃস্ট ধর্মের যাজকগণ সাধারণ জনগনের উপর যে রকম নির্যাতন চালিয়েছিলো, তাতে তাদের পতন এক সময় অবশ্যম্ভাবী ছিলো।

২। খৃস্টানদের বাইবেল  ঐশী গ্রন্থ দাবী করা হলেও এর মধ্যে আসমানী গ্রন্থের যে অবশিষ্টাংশ ছিলো তা নানা ভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো, যার ফলে অনেক সত্যই সেখান থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো। যেমন বাইবেলের পুরাতন নিয়মের আদি পুস্তকে সৃষ্টি প্রক্রিয়া নিয়ে যা বলা হয়ে থাকে তা প্রত্যক্ষ ভাবে পর্যবেক্ষণমূলক সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই বৈজ্ঞানিক মহলে বাইবেলের সৃষ্টি প্রক্রিয়া অগ্রহণযোগ্য ছিলো। এ ছাড়া বাইবেল অসংখ্য ভুলে ভরা, যা নব্য আলোয় আলোকিত অনেকে একে সত্য বলে মানতে পারেনি। 

৩। গীর্জার শিক্ষা অনুসারে  ঈসা আলায়হিসসালাম কে ঈশ্বরের পুত্র এবং অনেক ক্ষেত্রে ঈশ্বর হিসাবে বর্ণনা করা হয়। একজন মরনশীল মানবকে অনেকেই ঈশ্বর হিসাবে মেনে নিতে পারেনি।

৪। ঈশ্বরের সত্য প্রকৃতির ধারনা খ্রীস্ট ধর্ম দিতে পারেনি। উপরের আলোচনা হতে আমরা জেনেছি যেখানে বিজ্ঞান ভৌত বস্তু বা প্রকৃতি নিয়ে কাজ করে, সেই ভৌত বিজ্ঞান দিয়েই ঈশ্বরের অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এবং যথারীতি ব্যর্থ হয়েছে। ভৌত বিজ্ঞান দিয়ে যাচাই করলে, পৃথিবীর সকল মিথ্যা উপাস্যের ধারনাই দুরীভূত হয়। একদিকে তারা সত্য ধর্মের পক্ষেই কাজ করেছে।

৫। ইউরোপ কখনোই ইসলামে বর্ণিত স্রষ্টার প্রকৃতি কে কখনোই আমলে নেয়নি, তার প্রধান কারন ছিলো মুসলমানেরা তাদের কাছে শত্রু ভবাপন্ন জনগোষ্ঠী, ক্রুসেডের যুদ্ধে মুসলমানদের কাছে পরাজয়, জাতিগত ভাবে ইসলামের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী ঘৃনার জন্ম দেয়, যা তাদের ইসলামে বর্ণিত স্রষ্টার প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করাকে নিরুৎসাহিত করে।

৬। ইউরোপে যে বস্তুবাদী সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো বস্তুর বাইরে কোন কিছুই তাদের কল্পনায়  ছিলোনা। বিশ্বাস কে বস্তুবাদ নির্ভর করা হয়েছিলো।

৭। যুক্তি বিদ্যার বহুল প্রচলন, যা মিথ্যা  উপাস্যকে মিথ্যা হিসাবেই প্রতিভাত করে। অনেক নাস্তিক দার্শনিকের আবির্ভাব হলো রঙ্গমঞ্চে।  

৮। গোপন সংগঠন  শয়তানের পুজারী ফ্রীমেসনসদের  প্রভাব, যাদের মূল এজেন্ডা ছিলো, মানুষকে স্রষ্টা বিমুখ করা, যা তারা করতে বহুল ভাবে সফল হয়েছে।  প্রমিথিউসের ধারনার আলোকে শয়তান কে ত্রাতা হিসাবে দেখানোর প্রয়াস অনেক ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছিলো। 

৯। বিকৃত ধর্ম বা মিথ্যা উপাস্যকে অনেকাংশে বর্জনের ফলে, যে শুন্যতার সৃষ্টি হয় সেখানে নাস্তিকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। এই শুন্যতা পুরনের জন্য মুসলমানেরা সত্য ধর্ম বা সত্য উপাস্যের প্রকৃতি নিয়ে সেই শুন্যস্থান পুরনে এগিয়ে আসতে পারেনি। তার কারন ঔপনিবেশিক শাসনে, শোষনে নিষ্পেষিত মুসলিম বিশ্বের তখন বেহাল দশা, নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে তারা রত ছিলো, অন্য দিকে নজর দেয়ার কোনো উপায় ছিলোনা।

১০। কার্ল মার্ক্স এর কম্যুনিজম বা সমূহবাদ  হলো মানুষকে রাজনৈতিক কারনে নাস্তিক বানানোর মূল কারন বলে বিবেচিত হয়। কার্ল মার্ক্স এর মতে ‘ ধর্ম বিশ্বাস  আফিম এর মতো’ আর তাই মূলতঃ কম্যুনিস্ট মাত্রই নাস্তিক হয়।  

১১। সর্বোপরি একটি জনগোষ্ঠিকে যখন অযৌক্তিক ধর্ম বিশ্বাস ও নিয়ম নীতির নাগপাশে  বল পুর্বক আবদ্ধ রাখা হয়, সেটা যেমন এক চরম পন্থা, এই বন্দীদশা থেকে হঠাৎ যখন তাদের মুক্তি ঘটে, তখন তারা  বাঁধ ভাংগা প্লাবনের মত সর্বকুল ব্যাপী প্লাবিত হয়ে অপর এক চরম অবস্থার সৃষ্টি করে আর সেই চরম অবস্থাই হলো নাস্তিক্যবাদ।

নাস্তিকদের পক্ষ থেকে একটি আপত্তি ও তার জবাবঃ 

নাস্তিকদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, নাস্তিকতা ( Atheism) শব্দটির উৎপত্তি ষোড়শ শতাব্দীতে হলেও নাস্তিকতার ধারনাটি অনেক পুরনো। তারা খৃস্টপুর্ব ৫০০ শতাব্দীর ভারত বর্ষের দিকে দিকে দৃষ্টি দিতে বলেন, যখন বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম এমনকি হিন্দু ধর্মের ধ্যান- ধারনার অবতারনা করেন, যেখানে সৃষ্টি সংক্রান্ত কোনো বর্ণনার অস্তিত্ব নেই। এমনকি তারা গ্রীক দার্শনিকদের বিশ্ব পরিচালনার কার্যকারন সংক্রান্ত ব্যখ্যা অন্বেষনের প্রক্রিয়াকে নাস্তিকতা বাদের উন্মেষের প্রক্রিয়া বলে অভিহিত করেন। তারা প্লেটোর সেই কথোপকথন কে নাস্তিকতার প্রমাণ হিসাবে টানেন, যেখানে এক ব্যাক্তি তাদের দেব-দেবীকে অস্বীকার করেছিলেন , যাকে প্লেটো বলেছিলেন, তুমিই প্রথম ব্যাক্তি নও তোমার আগেও এরকম অনেকেই ছিলো। এই কথার মাধ্যমে প্লেটো নাস্তিকদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়েছেন।

আমরা নিম্নে তাদের উপরোক্ত যুক্তিগুলো খন্ডন করব  ইন শা আল্লাহঃ

১। বৌদ্ধ ধর্ম কিংবা জৈন ধর্মের গ্রন্থে সৃষ্টি প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বর্ণনা পাওয়া যায়না সত্য। আবার স্রষ্টা নেই তাও বলেনা, বরং তারা স্রষ্টার ব্যাপারে নিরব। কিন্তু, আমরা দেখি, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা গৌতম বুদ্ধকে তাদের উপাস্য হিসাবে নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। তার তাকে ভগবান বলে সম্মোধন করে। অপর পক্ষে জৈন ধর্মে তির্থংকরদের ঈশ্বর হিসাবে উপাসনা করা হয়। জৈন ধর্মে বলা হয় সকল মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের উপাদান রয়েছে। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্ম বা জৈন ধর্মে ঈশ্বরের ধারনা কে স্বীকার করা হয়। যেখানে ঈশ্বরের ধারনা স্বীকার করা হয় সেটাই আস্তিকতা।

২। এই ধর্মগুলোর মূল শিক্ষা  অবিকৃত থাকেনি। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে বসে যা আমদের হাতে পৌঁছেছে, তাতে সৃষ্টি সংক্রান্ত বর্ণনা হয়ত পৌছেনি, কিন্তু তাদের ধর্মেও যে স্রষ্টার ধারণা ছিলো তার পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন; মৃত্যু শয্যায় গৌতম বুদ্ধের তার শিস্য আনন্দকে দেয়া উপদেশের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারেঃ 

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যু শয্যায় সে তার শিস্য আনন্দকে বলেছিলেন “আমি একমাত্র বুদ্ধ নই, আমার পরেও অনেক বুদ্ধ আসবে, অবশেষে চুড়ান্ত রূপে একজন বুদ্ধ আসবে, যার নাম মৈত্রেয়।” (Gospel of Buddha)  উনি এর পরে মৈত্রেয়র যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন, গবেষকদের মতে তা ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ইঙ্গিত করে। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্রষ্টার সব চেয়ে নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে গেছেন।

৩। বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম বা হিন্দু ধর্ম কর্মফলের উপর ভিত্তি করে পুনর্জন্ম বিশ্বাস করে। যদি কোনো স্রষ্টার বিশ্বাসই না থাকে তাহলে এই পুনর্জন্মের বিষয় বা কর্মফলের ব্যাপারে কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ  করেন?

৪। গ্রীক দার্শনিকদের বিশ্ব পরিচালনা পদ্ধতির কার্যকারন সংক্রান্ত ব্যাখ্যা অনুসন্ধান, নাস্তিকতার দিকে ধাবমানের ইঙ্গিত বহন করেনা। আস্তিকতা অর্থ এই নয় যে, বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ কে অস্বীকার করা। তার প্রমাণ ইসলাম, এখানে কার্যকারণ সংক্রান্ত অনুসন্ধানকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। কিন্তু  ইসলাম সবচেয়ে  বিশুদ্ধ একত্ববাদী ধর্ম, যেখানে স্রষ্টার বিশ্বাসের সামান্যতম বিচ্যুতিও গ্রহণযোগ্য নয়।

৫। গ্রীক দার্শনিকদের যুগে মানুষের মধ্যে বহু দেবতার বিশ্বাস ছিলো। এর মাঝেও কিছু দার্শনিক ছিলো যারা প্রচলিত বহুত্ববাদের বিরূদ্ধে একেশ্বরবাদী ধ্যান-ধারনা লালন করতেন। যেমনঃ জেনোফেন। এমনও হতে পারে, প্লেটো যে ব্যক্তির সাথে কথোপকথন করেছিলেন তিনি ছিলেন বহুত্ববাদে অবিশ্বাসী, আর একারনেই প্লেটো তাকে তিরস্কার করেছেন। সুতরাং  এটা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করেনা যে, তখন নাস্তিকের অস্তিত্ব ছিলো।    

নাস্তিকদের শ্রেণীবিভাজন? 

একটি হিসাব মতে জানা যায়, বর্তমানে পৃথিবীতে নাস্তিকদের সংখ্যা ১.২ বিলিয়ন। আমরা যদি নাস্তিক্যবাদকে একটি ধর্ম হিসাবে অভিহিত করি তাহলে সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে তাদের  অবস্থান হবে তৃতীয়  যা মূলতঃ খৃস্টানদের এবং মুসলমানদের পরেই অবস্থানকারী। কিন্তু এই ধর্মাবলম্বীর সবার বিশ্বাস একই রকম নয়, আর তাই ‘Mental Health, Religion & Culture’  নামক একটি জার্নালে নাস্তিকদের ৬ টি শ্রেনীর বর্ণনা করা হয়েছে। ( Volume 17, 2014 – Issue 10 )  নীচে এই শ্রেণী গুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলোঃ

১। একাডেমীক নাস্তিতকতা (Academic Atheism): এই শ্রেনীর নাস্তিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক নাস্তিকও বলে। এই শ্রেনীর নাস্তিকরা সাধারণতঃ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা অথবা গবেষনা মূলক কাজে ব্যাস্ত থাকেন অথবা কোনো বুদ্ধি বৃত্তিক পেশার সাথে সম্পৃক্ত থাকেন। আমার বিবেচনাতে এদের তিনটি উপ ভাগে ভাগ করা যায়, আর তাহলোঃ

ক) বিজ্ঞানী গনঃ এরা সাধারণত নানাবিধ বৈজ্ঞানিক গবেষনার সাথে যুক্ত থাকেন এবং দাবী করেন যে, তাদের গবেষনাতে তারা কখনো স্রষ্টার অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। এই শ্রেনীর নাস্তিকগণ তাদের উত্তরসুরী বিজ্ঞানী বা শিক্ষকদের কাছে থেকে প্রাপ্ত একটি প্রবণতাকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। এরা যদিও নিজেদের মুক্ত চিন্তার অধিকারী বলে দাবী করেন, কিন্তু মূলতঃ তাদের চিন্তা-চেতনা পুর্ব থেকে প্রাপ্ত একটি ধারাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এই ধারার বিপরীতে চিন্তা -গবেষনা তাদেরকে  অনেক সময় বিজ্ঞানী মহলে অপাংক্তেয় করে তোলে। এই ধরনের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাদের কেরিয়ার ধ্বংসের হুমকির মুখে থাকতে হয়। এদের ভ্রান্তির বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ।

খ) দার্শনিক গণঃ এরা মুলতঃ নির্দিষ্ট মতবাদের চর্চা করেন, এ ক্ষেত্রে তারা নাস্তিক্যবাদী দর্শন কেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। বিশুদ্ধ ইসলাম মতে দর্শন চর্চা ক্ষতিকর, তা মানুষকে সত্য বিমুখ করে তোলে। ইসলামের ইতিহাসে দর্শন চর্চার ফলে মানুষের আক্বীদা- বিশ্বাস মারাত্মক ভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। জাহমিয়া, মুতাজিলা, আশারি, মাতুরিদী ইত্যাদী ফেরকা দর্শন চর্চার ফলেই উদ্ভুত হয়েছে। দার্শনিকগণ নানা রকম প্রশ্নের অবতারনা করেন, মানুষকে সুষ্ঠু উত্তর না দিয়ে অনেক সময় তাদের  বিভ্রান্তিতে রাখেন এবং নিজেরাও বৃভ্রান্তিতে নিপতিত হন।  

গ) শিল্পী ও সাহিত্যিকগণঃ এই শ্রেনীর ব্যক্তির নাস্তিকতার মূল কারন উত্তর সুরীদের থেকে প্রাপ্ত ধ্যান-ধারনা। এরা স্রষ্টার অস্তিত্ত্বের অনুসন্ধানেরও যোগ্যতা রাখেন না। মানব জীবনে ধর্ম কর্তৃক আরোপিত নানা রকম বিধি-নিষেধ তাদের আক্রমনের মূল লক্ষ্যবস্তু করেন। এই শ্রেনীর লোকদের কাছে নাস্তিকতা অনেকটা ফ্যাশনের মত। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দুই একটি ব্যতিক্রম ব্যাতিত, এই শ্রেনীর লোকদের মৃত্যু পরবর্তী সকল আচার ধর্মীয় রীতিতেই সম্পন্ন হয়।

২। ধর্ম বিদ্বেষী নাস্তিকঃ এই শ্রেনীর নাস্তিকদের অন্তর সব সময় প্রচলিত ধর্মমত গুলোর বিরুদ্ধে বিদ্বেষে ভরা থাকে, সুযোগ পেলেই তারা তাদের কথা ও লেখনী দ্বারা সর্বদা ধর্মকে আক্রমণ করেন। এদের হাতে ক্ষমতা গেলে এদের মুল উদেশ্য থাকে ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করা। যে শ্রেনীর লোকেরা এদের সম্মুখের কাতারে অবস্থান করে তারা হলো কম্যুনিস্ট গণ। সোভিয়েত ইউনিয়নে মানুষ এদের কদর্য রূপ দেখেছে, এখন চায়নাতে (উইঘুর) দেখছে। বিশেষ করে ইসলামের প্রতি এদের বিষোদগার সর্বাধিক। কারন অন্যান্য ধর্মগুলোকে তাদের নির্দেশনার আলোকে নিয়ন্ত্রন করা গেলেও, ইসলামকে সম্ভব হয়না। আমাদের দেশেও এই শ্রেনীর নাস্তিকদের অস্তিত্ব রয়েছে। এদের ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসের পিছনে মূল কারন,  কম্যুনিস্ট মতবাদের প্রতিষ্ঠাতাদের চিন্তা- চেতনাকে তারা অকাট্য অবশ্য পালনীয় হিসাবে গ্রহণ করেছে। (বাংলাদেশের আরেক শ্রেনীর তথাকথিত ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক আছেন, তারা আসলে নাস্তিক নয়, তারা মূলতঃ হিন্দুত্ববাদের প্রতি সহানুভুতিশীল, তারা আসলে ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। ‘শাহবাগ আন্দোলন’ একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ)

৩। ধর্মহীন নাস্তিকঃ এরা নিজেরা প্রতিষ্ঠিত কোনো ধর্মমত বা স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনা, তবে আস্তিকদের প্রতি বা ধর্মানুসারীদের প্রতি এদের কোনো রকম বিদ্দ্বেষও পরিলক্ষিত হয়না। এরা সাধারণতঃ পারিবারিক আবহেই নাস্তিক হয়ে বেড়ে উঠে। ধর্ম তাদের জীবনে কোনো ভুমিকা রাখেনা। এরা অন্যদের মত প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করে। আমাদের দেশেও অনেক সময় এই ধরনের কিছু ব্যক্তি বর্গ দেখা যায়, ব্যাক্তিগত জীবনে নাস্তিক হলেও অন্য ধর্মের মানুষের অধিকারের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল, অনেক সময় সেই অধিকারের প্রতি ওকালতি করতে দেখা যায়।

৪। ধর্মীয় আচার পালনকারী নাস্তিকঃ এই ধরনের নাস্তিক গণ যদিও স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেনা, কিন্তু সামাজিক ভাবে ধর্মীয় অনেক আচার বা রীতি মেনে চলে। অনেক সময় ধর্মের অনুসারী ব্যাক্তিদের থেকে এদের পৃথক করা মুশকিল হয়। এরা নিজে থেকে এদের বিশ্বাসের কথা প্রকাশ না করলে, মানুষ তাদের নাস্তিকতা সম্পর্কে জানতে পারেনা।

৫। অন্বেষনকারী অজ্ঞেয়বাদীঃ এরা যদিও স্রষ্টার অস্তিত্ত্ব নয়ে সংশয়ে নিপতিত, তবুও তাদের মধ্যে একটা আকাঙ্ক্ষা থাকে আধ্যাত্মিকতার, তারা নিরন্তর স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন এবং প্রতিষ্ঠিত ধর্মের আচার ও রীতি-নীতি পালন করেন। ৪ নম্বরে বর্নিত শ্রেনীর সাথে এদের যথেষ্ট মিল রয়েছে, অনেক সময় এ দুই শ্রেনীকে পৃথক করা যায়না।

৬। বিভিন্ন ধরনের এক্টিভিস্ট বা আন্দোলনকারীঃ  এই শ্রেনীর নাস্তিকরা সাধারণত অধিকার আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকে, যেমন পরিবেশ আন্দোলন, নারী অধিকার আন্দোলন, প্রানী অধিকার আন্দোলন ইত্যাদী।  এরা সব সময় ধর্ম কে  তাদের প্রতিপক্ষ হিসাবে মনে করে । ( বিভিন্ন মুসলিম দেশেও এই ধরনের আন্দোলনকারী রয়েছে, তারা মূলতঃ পাশ্চাত্য সভ্যতারই অনুসরণ কারী। অনেকে নিজেদের মুসলমান দাবী করলেও, ঈমান ভঙ্গের কারন গুলোর ব্যাপারে তারা অজ্ঞ)

( গার্ডিয়ান পত্রিকার ১৫ জুলাই ২০১৩ অন লাইন ভার্সনে নাস্তিকতার এই শ্রেনীগুলোর ব্যাপারে Andrew Brown আলোচনা করেছেন।) 

উপরোক্ত যে ৬ প্রকারের নাস্তিকতার আলোচনা এখানে করা হলো, তার মূল কারন ইসলাম ব্যতিত অন্যান্য যে ধর্ম মত গুলো রয়েছে, একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি যে সত্যকে  জানতে চায়, সে অবশ্যই  ঐ গুলোকে অধ্যয়ন করলে তা  প্রত্যাখ্যান করবে। তারা অধিকাংশ সময়ই ইসলামকে অধ্যয়ন করার জন্য উপযুক্তই মনে করেনা ( ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা তাদের মন ও মগজে জন্মলগ্ন থেকেই বদ্ধমুল করে দেয়া হয়েছে)। আর তাই আধ্যাত্মিকতার তাড়নায় যখন তারা স্রষ্টা সম্পর্কে জানতে চায়, তখন মিথ্যা বা বিকৃত ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর শরনাপন্ন হয়, এবং সত্যের দেখা পায়না, তখন তারা নাস্তিক হয়ে যায়। পাশ্চাত্য সভ্যতায় যারা ইসলাম গ্রহনের সৌভাগ্য লাভ করেছে, ইসলাম গ্রহণের কাহিনী পড়লে, ব্যাপারটি আরো পরিস্কার হয়ে যায়। 

(চলবে)       

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

one × three =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য