Wednesday, February 28, 2024

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমদৈনন্দিন খবরমুসলমানদের বিরুদ্ধে বয়কটের ঘোষণা

মুসলমানদের বিরুদ্ধে বয়কটের ঘোষণা

এটা বিস্ময়কর কাকতালীয় ঘটনা যে, ০৩ জুলাই যে সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হায়দরাবাদের এক জনসভায় বিজেপি নেতাদের পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন, ঠিক সে সময় বিজেপি শাসিত রাজ্য হরিয়ানায় মুসলমানদের অর্থনৈতিক বয়কট করার ঘোষণা করা হয়। যদিও আহ্বানকারী বিজেপির লোক নয়, কিন্তু সে সেই সঙ্ঘ পরিবারের লোক, যার একটি রাজনৈতিক শাখা বিজেপিও। আরএসএস-এর অঙ্গ সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরঙ্গ দল হরিয়ানার মানেসারে এক পঞ্চায়েত আয়োজন করে স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বেশ উসকানি দেয়। ওই পঞ্চায়েতে মুসলমানদের পাকিস্তানি, রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী অভিহিত করে হরিয়ানা থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা করা হয়।

পঞ্চায়েতে মুসলমান ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক বয়কটের ঘোষণা করে বলা হয়েছে যে, মানেসারে রোহিঙ্গা, বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি মুসলমানরা নিজেদের পরিচয় গোপন করে রেখেছে। তারা মানুষদের ধোঁকা দেয়ার জন্য নিজেদের কয়েকটি জুসের দোকান ও সেলুনের নাম হিন্দু দেবদেবীদের নামে রেখেছে। সুতরাং তাদের চিহ্নিত করে এখান থেকে বের করে দিতে হবে। পঞ্চায়েতে উপস্থিত কয়েকজন উগ্রপন্থী শপথ করেছে, তারা মুসলমান ব্যবসায়ীদের সাথে কোনো ধরনের বেচাকেনা-লেনদেন করবে না। তাদের সর্বাত্মক বয়কট করবে। এ সময় হালাল পণ্যেরও বয়কটের ঘোষণা দেওয়া হয়। হিন্দুদের বলা হয়, তারা যেন মুসলমানদের সেলুনে গিয়ে চুল না কাটে। তাদের যেন ঘর ভাড়া না দেয়। তাদের দোকান থেকে ফল ক্রয় না করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এর আগে হরিয়ানারই শিল্প এলাকা গুরগাঁওয়ের উদয়পুর ও অমরাবতীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সব হিন্দু সংগঠনের এক পঞ্চায়েতে অসংখ্য মানুষ এলাকায় বসবাসকারী সব ‘বহিরাগত’ লোকদের চিহ্নিত করে তাদের উচ্ছেদ করার পথ দেখানোর কথা বলেছিল। ওই ইস্যুতে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটকে এক স্মারকলিপির মাধ্যমে সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়ে বলা হয়েছিল, যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে হিন্দুরা নিজেরাই তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এর চেয়ে বিশাল এক পঞ্চায়েতের ডাক দেওয়া হবে। সেখানে পরবর্তী কর্মসূচি চ‚ড়ান্ত করা হবে। সেই পঞ্চায়েতেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বেশ উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয় এবং পুলিশ নীরব দর্শকের ভ‚মিকা পালন করে। অথচ এই পঞ্চায়েতের আগে আয়োজকরা পুলিশকে আশ্বস্ত করেছিল যে, তারা শান্তিপূর্ণভাবে পঞ্চায়েত করবে এবং এ ধরনের বিদ্বেষমূলক উসকানি বক্তব্য দেবে না। তার পরও এই পঞ্চায়েতে প্রকাশ্যে মুসলমানদের পাকিস্তানি, বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কট করা ও বহিষ্কার করার কথা বলা হয়। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

সবাই জানেন যে, আইনত ভারতে যেকোনো নাগরিক যেকোনো স্থানে বসবাস করা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার স্বাধীনতা রয়েছে। মুসলমানরা হরিয়ানার বেশ কিছু স্থানে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে এবং তারা সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু বিজেপি যখন থেকে এখানে ক্ষমতায় আসে, তখন থেকে এখানকার মুসলমানদের বেঁচে থাকাকে হারাম করে দেওয়া হয়েছে। আপনাদের স্মরণে থাকার কথা, এই গুরগাঁওয়ে হাজার হাজার মুসলমান বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে কর্মরত আছে। তাদের জন্য জুমার নামাজ আদায়ের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। যুগ যুগ ধরে যেসব স্থানে জুমার নামাজ আদায় করা হতো, সেগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

হরিয়ানায় মুসলমানদের বাকশক্তি রুদ্ধ করার কার্যক্রম উদয়পুরকাণ্ডের পরই বেড়ে গেছে। সঙ্ঘ পরিবারের লোকজন বিভিন্ন অংশে পঞ্চায়েত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। অথচ বাস্তবতা হলো, উদয়পুরে কানহাইয়া লালের নির্মম হত্যাকাণ্ডে মুসলমানরা ব্যাপক আকারে যেভাবে নিন্দা জানায়, তার কোনো নজির পাওয়া যায় না। সব মুসলমান নেতা ও সংগঠন এই পাশবিক হত্যাকে স্পষ্ট ইসলামী শিক্ষাবিরোধী অভিহিত করে অপরাধীদের অবশ্যই শাস্তির দাবি করে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পক্ষে একজন মুসলমানও আওয়াজ তোলেনি। অথচ এর আগে গোহত্যার মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে ভারতের বিভিন্ন অংশে পাশবিকতা ও বর্বরতার সাথে মুসলমানদের হত্যাকারীদের সমর্থনে অসংখ্য সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞ ময়দানে নেমে আসে। এখানেই শেষ নয়, ঝাড়খণ্ডের এক নিরপরাধ মুসলমানকে গণপিটুনিতে হত্যাকারীদের জামিনে মুক্তির পর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রীতিমতো ফুলের মালা দিয়ে তাদের উৎসাহ জোগান। স্বয়ং সেই রাজস্থানের রাজসামান্দ অঞ্চলে ২০১৮ সালে যখন বর্বর হিংস্র পশু শম্ভুলাল রেগার কুড়াল দিয়ে বাঙালি শ্রমিক মুহাম্মদ আফরাজুলকে হত্যা করে এবং রীতিমতো তার ভিডিও ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়, তখন তার সমর্থনে অসংখ্য মানুষ ময়দানে নেমে এসেছিল। এমনকি ২০১৯ সালের নির্বাচনে তাকে প্রার্থী বানানোরও কথা হয়েছিল।

শম্ভুলালকে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য যথারীতি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হয়। যার ফলে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে তিন লাখ রুপি জমা দেয়। এ দেশে নিকৃষ্ট অপরাধী ও আইন ভঙ্গকারীদের রক্ষা করার এক বিশাল ইতিহাস বিদ্যমান আছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট নূপুর শর্মার প্রগলভতা এবং দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করলে ভক্তদের পুরো বাহিনী সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে এমন এমন অনর্থক বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেগুলো এখানে উদ্ধৃত করাও সম্ভব নয়। যখন এতে কাজ হলো না, তখন সরকারপন্থী প্রাক্তন বিচারক ও সরকারি কর্মকর্তারা এক বিবৃতি প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের কাছে মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। ১৫ জন প্রাক্তন বিচারক এবং ৭৭ জন প্রাক্তন আমলা অভিযোগ করেছেন, আদালত এ ইস্যুতে ‘লক্ষণ রেখা’ (আইনবিধির সীমা) অতিক্রম করেছেন। তারা তাদের বিবৃতিতে বলেন, ‘আদালতের ইতিহাসে এ মন্তব্য দুর্ভাগ্যময় জুড়িহীন। সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের ন্যায়বিচারের ব্যবস্থাপনার জন্য এমন এক দাগ, যা মিটানো যাবে না।’

বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, এই প্রাক্তন বিচারকরা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা নূপুর শর্মার প্রগলভতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতের বক্তব্য নিয়ে তো কঠোর ভাষায় সমালোচনা করলেন, কিন্তু তাদের বিবৃতিতে কোথাও নূপুর শর্মার কোটি কোটি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাতকারী বক্তব্যের নিন্দা করা হয়নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, এই প্রাক্তন বিচারকরা ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সেই ফ্যাসিবাদী মানসিকতার হাতিয়ার, যারা আজকাল ভারতে সর্বত্র নিজেদের আলো ছড়াচ্ছে। এই মানসিকতার অধিকারীরাই আজ পর্যন্ত নূপুর শর্মাকে আইনের লম্বা হাত থেকে দূরে রেখেছে এবং ওই সব লোকদের কারাগারে নিক্ষেপ করছে, যারা নূপুর শর্মার সমালোচনা করছে। সুপ্রিম কোর্টকেও এ কারণেই তার সীমার মধ্যে থাকতে ধমক দেয়া হচ্ছে। এ কারণেই বাধ্য হয়ে ওই বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে নূপুর শর্মা মামলার শুনানিতে বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালাকে এ কথা বলতে হয় যে, এ ধরনের বিশ্লেষণ দ্বারা আইনের শাসনের ক্ষতি হয়েছে এবং আইনি দফতরগুলোর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তিনি এ কথাও বলেছেন যে, ‘ডিজিটাল মিডিয়া ট্রায়াল আদালতের কর্মে হস্তক্ষেপের শামিল। এটা লক্ষণরেখা পার হয়ে যায়।’ এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের কঠিন পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের চিন্তাভাবনা ‘লক্ষণরেখা’ অতিক্রম করছে, নাকি সেসব লোক ‘লক্ষণরেখা’ অতিক্রম করছে, যারা দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিয়ে নোংরা খেলায় মেতেছে এবং মুসলমানদের অর্থনৈতিক বয়কটের ঘোষণা করে আইন ভঙ্গের অপরাধ করছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

11 − nine =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য