Sunday, March 3, 2024

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমযুগ জিজ্ঞাসারাম মন্দির, বাবরী মসজিদের উপরে নয়, এটা সারা বিশ্বের কমবেশি ২০০ কুটি...

রাম মন্দির, বাবরী মসজিদের উপরে নয়, এটা সারা বিশ্বের কমবেশি ২০০ কুটি মুসলমানদের, কলিজার উপরে তৈরি হয়েছে!

কেন মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির ইতিহাস কি বলে?…

১৫২৮ সালে মোঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা যহিরুদ্দিন বাবার এর সেনাপতি মীর বাকী ইসফাহানী অযোধ্যায় বাবরী মাসজিদ নির্মাণ শুরু করেন।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর মাত্র ৪ ঘন্টা ৪৫ মিনিটে ৪৬৫ বছরের পুরোন ইসলামী সভ্যতার সুমহান নিদর্শন কে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া হয়।

বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার সবচেয়ে বড় কারন ছিল এখানে হিন্দুদের শ্রী রাম জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। পরে বাদশাহ বাবর সেই স্থানের মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করেন। কিন্তু ইতিহাস কি বলে।

বাবরী মসজিদ কি ভগবান রামের জন্মভূমি ছিল? বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এর কোন প্রমাণ পেশ করতে পারেনি যে বাবরী মসজিদের স্থানে রাম মন্দীর ছিল। সেই মন্দীর কে ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

মসজিদের গায়ে ফার্সি ভাষায় স্পষ্ট লিখা আছে যে এই মসজিদ ১৫২৮-২৯ খৃষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল এবং নির্মাণকারীর নাম ও লিপিবদ্ধ করা আছে। এমনকি বাবরের মেয়ে গুলবান্দ বেগম “হুমায়ু নামা” তে এই মসজিদ নির্মাণের কথা স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনিও একথা উল্ল্যেখ করেন নি যে “বাবরী মসজিদ মন্দির ভেঙ্গে নির্মাণ করা হয়েছিল। যদি মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করা হতো অন্তত গর্বের উদ্দ্যেশ্য সে কথা লিখা গুল্বান্দ বেগম লিপিবদ্ধ করতেন।

বাবরী মসজিদ নির্মাণের প্রায় ৫০ বছর পর ১৫৭৫-৭৬ সালে তুলসিদাস রমায়ন লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও তিনি একজন হিন্দু হয়েও মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ তৈরি করা হয়েছে এ কথা লিখলেন না। অন্তত তিনি রামায়ণ লিখার সময় এ কথা বলতেন যে বাবরী মসজিদ রামের জন্মভূমি,এবং সেখানে মন্দির ছিল।
১৬ এবং ১৭ শতাব্দীর অযোধ্যা কেন্দ্রিক কোন ইতিহাস গ্রন্থে এ কথা পাওয়া যায় না যে বাবরী মসজিদের স্থানে রাম মন্দির ছিল।

আবুল ফযল রহ তাঁর লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ “আইনে আকবার” গ্রন্থ লিখা সমাপ্ত করেন ১৫৯৮খৃষ্টাব্দে। তিনি তাঁর গ্রন্থে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থান সমূহের মধ্যে আযোধ্যার কথা লিপিবদ্ধ করেন এবং বলে পূর্ব দিকে ৪০ ক্রোশ এবং উত্তর দিকে ২০ ক্রোশ পবিত্র স্থান। অর্থাৎ বুঝা যায় তখনো রামের জন্মস্থানের নির্দিষ্ট কোন ধারণা মওজুদ ছিলনা। কেননা তিনি সেই স্থানে দুই জন নবীর কবরের কথা উল্ল্যেখ করেছেন কিন্তু একবারের জন্য রামের জন্মভূমির দিকে ইশারা করলেন না?!

“এয়ারলি ট্রাভেলস ইন ইন্ডিয়া” গ্রন্থে উইলিয়াম ফোস্টার আযোধ্যার কথা বর্ণনা করেছেন,যখন তিনি ১৬০৮ সেখানে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর বর্ণনায় নদীর কথা উল্ল্যেখ করেন যেখানে হিন্দুরা গোসল করে এবং সেই নদী থেকে দুই কিলোমিটার দূরে এক রহস্যপূর্ণ গুহার কথা উল্ল্যেখ করেন। যেই গুহা সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন এখানে রাম ভগবানের অস্থি দাফন করা আছে। অনেকটা আশ্চর্যের বিষয় হলেও সত্য তিনি রামের জন্ম স্থান নিয়ে কোন মন্তব্য করেন নি।

সুজান রাই ভান্ডারী ১৯৯৫-৯৬ সনে তাঁর কিতাব “খোলাসাতুত তারিখ” গ্রন্থ লিখা সমাপ্ত করেন। তিনি তাঁর বইয়ে ভারত উপমাহাদেশের জিওগ্রাফিক্যাল বর্ণনায় হিন্দুদের পবিত্র স্থান সমূহের কথা উল্ল্যেখ করেন। আওরঙ্গজেব কেশোরাজের এক মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন একথা লিখতে তিনি ভুলেন নি। কিন্তু তিনি যখন আযোধ্যার জিওগ্রাফিক্যাল বিবরণী পেশ করেন তখন -ভগবান রামের জন্মস্থানে কেউ মসজিদ নির্মাণ করেছে শুধু তাই নয় মন্দির ভেঙ্গে নির্মাণ করেছে- এতো বড় একটা ঘটনা লিখতে ভূলে গেলেন?

স্যার জাদুনাথ সরকার “ইন্ডিয়া অফ আওরাংজেব” গ্রন্থে বলেন অযৌধ্যা পূজার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। রামচান্দার জী এখানেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে রামের জন্মভূমি অযৌধ্যা কিন্তু তাঁর জন্মস্থান যে বাবরী মসজিদ নির্মিত হয়েছে তাঁর কোন ধারণা পাওয়া যায়না। বরং তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট কোন স্থান উল্ল্যেখ করতে পারেন নি।

বাবরী মসজিদ যে বাদশাহ যহিরুদ্দিন বাবরের আমলে নির্মিত হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। সম্রাট বাবরের উদারতায় তাকে অনেক বড় বড় হিন্দুরা সেকুলার বাদশাহ মনে করতেন। বর্তমান সময়ের হিন্দুপন্থি ফেমাস মোটিভেশনাল স্পিকার বিবেক বিন্দ্রা ও বাবর কে সেকুলার এবং হিন্দু মুসলিম বিবেধ বিরোধি বলে মনে করেন। এমনকি এখানে বাবারের জীবনী নিয়ে “সেকুলার এম্পায়্যার বাবার” নামী কিতাব ও মজুদ আছে। এ ছাড়া “বাবার নামা” “ইন্ডিয়া ডিভাইডেদ” গ্রন্থে হিন্দু মন্দির সমূহের প্রতি বাবরের সহনুভূতিশীল দৃষ্টি এবং হিন্দুদের প্রতি সম্রাট হিসেবে তাঁর ভালবাসা দেখার পরে একথা বলা আসম্ভব যে তিনি মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ বানানোর অনুমতি দিবেন। বা তাঁর যুগে কেউ মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করে এটা অসম্ভব।
রামগীতির সবচেয়ে পুরানা এবং নির্ভরশীল গ্রন্থ হচ্ছে বাল্মিকী রামায়ন। এই রামায়ন গ্রন্থে রামের জন্ম স্থান আযোধ্যা বলা হয়েছে কিন্তু কোন অযোধ্যা তা বলা হয়নি। এবং সেখানে অযোধ্যা শহরের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার সাথে বর্তমান আযোধ্যার কোন মিল পাওয়া যায়না।

ড. দিন বন্ধু তেওয়ারীর মতে বাল্মিকি রামায়নে আযোধ্যা শহরের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং জন্মস্থানের যে কথা বলা হয়েছে তা বর্তমান বানারস শহরের গঙ্গা নদীর তীরে ৪০থেকে৫০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। এটা ফায়যাবাদ শহরের আযোধ্যা নয়।

“বাবরী মাসজিদ এয়া রাম জানামভূমি” এই বিষয়ের ভারতের চার বিখ্যাত ঐতিহাসিক-প্রফেসর আর এম শারমা,প্রফেসর এম আতহার আলী,প্রফেসর ডী এন ঝা, প্রফেসর প্রফেসর সুরাজভান- একত্রে একটি প্রবন্ধ লিপিবদ্ধ করেন যার খোলসা আমি নিম্নে লিপিবদ্ধ করছি:
১,ষোলশো শতাব্দী এবং নিশ্চিত ভাবে আঠারাশো শতাব্দীর পূর্বে আযোধ্যার নির্দিষ্ট কোন স্থান কে রামের জন্মভূমি হওয়ার কারনে পবিত্রতা এবং সম্মান অর্জন ছিলনা।
২, যেখানে ১৫২৮-২৯ এ বাবরী মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল সেখানে রাম মন্দির ছিল,এই কথার কোন প্রমাণ নেই।
৩, আঠারোশো শতাব্দীর পূর্বে রামের জন্মভূমিতে বাবরী মসজিদ আছে এরূপ কোন লোক কথাও ছিলনা এমনকি উনিশশো শতাব্দীর পূর্ব শুরুতেও কেই এই মসজিদ ভাঙ্গার দাবী করেন নি।
৪,রামের জন্মভূমিতে বাবরী মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে এ ধারণা নিশ্চিতভাবে ১৮৫০ এর পরে সৃষ্টি হয়।
প্রায় অনেকটা ক্লিয়ার যে রামের জন্মস্থান কে যা চলছে তার পুরোটাই একটা নাটক এবং রাজনৈতিক ফায়দার কারণে করা হচ্ছে।

মূলত রাম মন্দির বা রামের জন্মস্থান ঝগড়ার সূত্রপাত ইংরেজরা করেছিল ভারতে হিন্দু মুসলিম ঐক্য নষ্টের উদ্দ্যেশ্য। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু মুসলিমের ঐক্য নষ্ট করতে পারলে তাঁরা এই দেশ আরও অনেক দিন শাসন করতে পারবে। সাথে সাথে মুসলমানদের ভাবমূর্তি ও ক্ষুন্য হবে। মুসলমানদের পুনরায় এই দেশ শাসন করা মুখে এই ঘটনা কে বাধা হিসেবে সৃষ্টি করাও তাদের উদ্দ্যেশ্য ছিল।

বাবরী মসজিদের স্থানে রাম মান্দির আছে এ ধারণা সর্বপ্রথম প্রকাশ পায় ইংরেজদের কূটনীতির একটা অংশ হিসেবে উনিশশো শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ইংরেজ লেখক লেডোন এর “মেমোরাইজ অফ রাইস উদ্দীন বাবার,এমপায়ার অফ হিন্দুস্তান” গ্রন্থের মাধ্যমে যা ১৮১৩ সালে প্রথম প্রকাশ পায়।

১৯৪৯ সালের আগে রাম মন্দির এবং বাবরী মসজিদ নিয়ে কোন ঝগড়া হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে ছিলনা।
মুসলমানেরা যদি ভারত উপমহাদেশে এই লম্বা শাসন আমলে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ নীতি গ্রহণ করত তাহলে ভারতের মাটিতে কোন মন্দির পাওয়া যেতনা। সাথে সাথে এই বিশাল সংখ্যক হিন্দুর এক অংশ ভারতে থাকত কিনা সন্দেহ। সাথে সাথে এটাও যে এতো কঠোর পজিশনে মুসলিম শাসক কেন কোন শাসকের পক্ষেই এত লম্বা সময় শাসন করা সম্ভব নয়।

তথ্যসুত্র: বাবরী মসজিদ এক তারিখী দাস্তাবেজ (প্রথম খন্ড ও দ্বিতীয় খন্ড),মুহাম্মাদ আরেফ ইকবাল।
সংকলন ও অনুবাদ: আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাজ্জাক। ফারেগ জমেয়া সালাফিয়্যাহ,বানারাস,ভারত।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

5 × 3 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য