Thursday, February 22, 2024

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমনিবন্ধসময়ঘড়ি

সময়ঘড়ি

সুরা আছর আল কুরআনের ১০৩ নম্বর ৩ আয়াত বিশিষ্ট সুরা। বোধসম্পন্ন মানবজাতিকে উজ্জিবিত করার জন্য এই সুরা বলতে গেলে সারাজীবনের জন্য এক বিরাট মাইলফলক। ভাববার সময় থাকলে অন্তরচক্ষু দিয়ে একবার ভাবুন। আমাদের যে ভাববার সময় নাই তাও এই সুরার প্রারম্ভে আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা বলে দিয়েছেন, তিনি বলেন, (১) সময়ের শপথ/কসম, (২) নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। আমি কোন ইসলামি বিশেষজ্ঞ নই যে সুরা আসর এর তাফসীর করতে বসেছি, শুধু তাদের জন্যই এই লেখা যাদের মূল্যবান সময় নেই আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা ও রাসুল (সঃ)এর বানীর মর্মার্থ অনুধাবন করার। নিন্মোক্ত মূল্যবান সব কথাই আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলার আল-কুরআন ও বিভিন্ন তাফসীর থেকে উদ্ধৃত। ব্যাখ্যার সময় শুধু নিজের আবেগকে ব্যবহার করেছি। প্রথমে জেনে নেওয়া প্রয়োজন আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা কেন এবং কখন কসম উচ্চারন করেন? আরব সংস্কৃতিতে শপথ গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম আল রাযীর মতে কুরআন আরবিতে প্রকাশ করা হয়েছে এবং এটি আরবদের দাবি প্রমাণ করার জন্য শপথ গ্রহণের প্রথা ছিল এবং তাই আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক শৈলী ব্যবহার করেছিলেন, আরবি কারো কাছে অবাক হওয়া ভাষা নয়। আল্লাহর শপথ শুধুমাত্র জোর, মনোযোগ এবং অনুমোদনের জন্য। শপথ বিষয়টির গুরুত্ব দেয় কিন্তু শপথ নিজেই জোর বিন্দু নয়। আল্লাহর নিদর্শনাবলী এবং সেখানে তিনি নিজের মহত্ত্বের প্রতি শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণের উদ্দেশ্যগুলি প্রয়োজনভেদে বিভিন্ন সময়ে, প্রেক্ষিতে বিভিন্ন অর্থ/ ভাব প্রকাশ করে; তাদের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে:   আল্লাহর মহিমা প্রদর্শন করা,  যুক্তিপ্রয়োগ,  নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর গভীর চিন্তা করে প্রয়োগ করা,  প্রমান করা,  শপথ করা জিনিসটির প্রতি শ্রদ্ধা করা, যখন এটি আল্লাহ বা তার নির্দেশাবলী হয়, দাবী করা,  উপস্থাপিত বিষয়ে  মনোযোগ আনা, যুক্তির গুরুত্বের প্রতি সচেতন করা।   এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে, বিষয়বস্তুর সাথে সময় বা যুগের কি সম্পর্ক, যার কসম করা হয়েছে? কসম ও কসমের জওয়াবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। অধিকাংশ তাফসীরবিদ বলেন, মানুষের সব কর্ম, গতিবিধি, উঠাবসা ইত্যাদি সব যুগের মধ্যে সংঘটিত হয়। সুরায় যেসব কর্মের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেগুলোও এই যুগ-কালেরই দিবা-রাত্রিতে সংঘটিত হয় এবং হবে। এরই প্রেক্ষিতে যুগের শপথ করা হয়েছে (সাদী, ইবন কাসীর) কোন কোন আলেম বলেন,আল্লাহ্‌ তা’আলার মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রজ্ঞা ও কুদরতের প্রমাণ-নিদর্শন সময় বা যুগেই রয়েছে; তাই এখানে সময়ের শপথ করা হয়েছে। (মুয়াসসার, বাদায়িউত তাফসীর)   আসর অর্থে আমরা যা বুঝি, তা হোল বিকালবেলা, যে সময় আমরা সাধারণত বৈকালীন সালাত আদায় করি; বাস্তবে আসর আরবি অভিধান অনুযায়ী অনেক অর্থ বহন করে প্রাসঙ্গিক অবস্থার প্রেক্ষিতে। যেমন, কাল, মহাকাল, সময়, ঘণ্টা, যুগ ইত্যাদি। এখানে আসর সময় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এবং আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা পুরা মানবজাতীকে সময়ের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য শপথ বা কসমের উল্ল্যেখ করেছেন।   সময়ের গুরুত্ব অনুধাবনের ব্যাপারে অনেক বিশিষ্ট গুণীজন অনেক উপসংহার টেনেছেন, কিন্তু কখনেই বলেন নাই যে মানুষ বাস্তবিকই ক্ষতিগ্রস্ত। দৈনন্দিন চব্বিশ ঘণ্টা একটা মানুষ কিভাবে ব্যয় করে তাঁর ফিরিস্তিতো সে নিজেই রাখতে পারে, এবং তার মধ্যে ইবাদতটুকুর সময় বের করে দেখলেই বুজতে পারবে কতখানি সময় সে নিজের জন্য ব্যয় করেছে। অথচ আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ, আমার এবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি। (আল কুরআন ৫১/৫৬) মানুষ শব্দটি একবচন। এখানে মানুষ বলে সমস্ত মানবজাতিই উদ্দেশ্য। এবং অধিক অর্থে বুঝানো হয়েছে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ছোট, বড় সবাই এই কাতারে। তাৎপর্য হোল মানুষ অর্থে কাফের মুশরিক তো আছেই, মুসলমানদেরও একটা অংশ এর আওতাভুক্ত। সময় অতিক্রান্তশীল, বহমান, বিদায়কালিক। এসব কিছুই আবার বয়সের সাথে ক্রিয়াশীল। অতএব, বুঝতেই পারছেন সময় হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে আর মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্তের পাল্লা ভারী হচ্ছে। তা এই দুনিয়ায়ে যেমন পরকালতো আরও ভয়াবহ। গণনা করার মত সামানের যোগান  কত টুকু? ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, কিয়ামত দিবসে পাঁচটি  বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না।(ক) তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? (খ) তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে? (গ) তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে? (ঘ) এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে? (ঙ) এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে? (সূনান আত তিরমিজী ২৪১৬) আমরাতো আবার নিজেদেরকে আদম সন্তান বলে দাবী করি। তা হলে ভাবুন একবার। ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে (আল কুরআন ১০২/৮) “পাঁচটি বিষয় শেষ হওয়ার আগে পাঁচটি বিষয় গ্রহণ করুন: আপনার যুবক, বৃদ্ধ হওয়ার আগে আপনার যৌবন; এবং আপনার স্বাস্থ্য, আপনি অসুস্থ হুওয়ার আগে; এবং আপনার সম্পদ, আপনি গরীব হওয়ার আগে; এবং আপনি ব্যস্ত হওয়ার আগে আপনার অবসর সময়; এবং আপনার জীবন, আপনার মৃত্যুর আগে। (আহমাদ) “ইমাম আলী (রাঃ)  বলেছেন:” মানুষ যদি দেখতো  যে তার মৃত্যু কত দ্রুত  তাকে পাকড়াও করছে তবে সে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঘৃণা করবে এবং বিশ্বের উপাসনা করা ছেড়ে দিবে। ” ইমাম আলী (রাঃ) আরও বলেছেন: “আপনি মৃত্যু শিকারের এক খেলায় আচ্ছন্ন আছেন। যদি আপনি দাঁড়িয়েও থাকেন তবে এটি আপনাকে ধরে ফেলবে আর আপনি যদি দূরে পালিয়েও যান এটি আপনাকে অতিক্রম করবে। ” وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلاَ تَعْقِلُونَ  পার্থিব জীবন ক্রীড়া ও কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়। পরকালের আবাস পরহেযগারদের জন্যে শ্রেষ্টতর। তোমরা কি বুঝ না (আল কুরআন ৬/৩২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ধ্বংস হওয়ার জন্য সৃষ্টি হও নাই বরং চিরস্থায়ি জীবন পেয়েছ। আপনি যখন মারা যান তখন আপনি শুধুমাত্র এক ঘরে হতে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হন।   ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ-এরূপ দুটি নিয়ামত আছে যে ব্যাপারে বেশিরভাগ লোক ধোঁকায় নিপতিতঃ সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়। (সূনান আত তিরমিজী ২৩০৪) (৩) কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের। এ আয়াতের বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা অনেক অর্থবোধক যা পুরো মানবজাতিকে পরকালের নাজাতের সবটুকু সুত্রের উল্লেখ করা হয়েছে। আমি এখানে আর তা টানলাম না। সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণীত হোল।  সোভাগ্যের ব্যাপার এই যে উপরে বর্ণিত মানবজাতি যে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তার মধ্যে আছে তার থেকে উত্তরণের পথ বলে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এই ক্ষতির কবল থেকে কেবল তারাই মুক্ত, যারা চারটি বিষয় নিষ্ঠার সাথে পালন করে— ঈমান, সৎকর্ম বা আ’মাল সালেহা, অপরকে সত্যের উপদেশ বা হক এবং সবরের উপদেশ দান। দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং মহা উপকার লাভ করার চার বিষয় সম্বলিত এ ব্যবস্থাপত্রের প্রথম দুটি বিষয় আত্বসংশোধন সম্পর্কিত এবং দ্বিতীয় দুটি বিষয় অপর মুসলিমদের হেদায়েত ও সংশোধন সম্পর্কিত। (সাদী) উপরোক্ত পঠনের সারাংশ একটি হাদিস দিয়ে শেষ করছি, যা আশা করি আমাদের সবাইকে আলোড়িত করবে। আব্দুল্লাহ ইবনে হিসান আবু মদীনাহ বলেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সাহাবীগণের মধ্যে দু ব্যক্তি ছিল, তারা পরস্পর মিলে একজন অন্যজনকে সুরা আসর পাঠ করে না শুনানো পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হতেন না। (তাবরানী, মু’জামুল আওসাত ৫১২০, মু’জামুল কাবীর ২০/৭০,বাইহাকী, সু’আবুল ঈমান ৯০৫৭, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১০/২৩৩, ৩০৭)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

3 + sixteen =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য