সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি যন্ত্রপাতি সস্তা ও সহজলভ্য করার কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনো তা নিশ্চিত হয়নি। কম দামের যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনো বেশির ভাগ কৃষকের নাগালের বাইরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে তা ১০ শতাংশের কম। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ অনেক কম। ফলে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ মাঝপথে থেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টির বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল—কৃষিতে শ্রমিকসংকট লাঘবে সহজে ব্যবহার্য ও টেকসই কৃষি যন্ত্রপাতি সুলভে সহজপ্রাপ্য করা হবে। এ জন্য সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা-২০২০ অনুমোদন দেয়। এর আওতায় তিন হাজার ২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে এই মেশিন বিতরণ শুরু হয়। ১২ ধরনের যন্ত্রে সরকার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থ দিচ্ছে।
kalerkanthokalerkanthoকৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ধান আবাদে সবচেয়ে বেশি আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। জমি চাষ ও সেচে ৯৫ শতাংশই হয় যন্ত্রের মাধ্যমে। এ ছাড়া ধান মাড়াই, খেতের আগাছা পরিষ্কার ও কীটনাশক ছিটানোর কাজও প্রায় শতভাগ যন্ত্রে হচ্ছে। তবে ধান রোপণ, কাটা, মাড়াই-ঝাড়াইয়ে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার এখনো অনেক কম। এসব কাজে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এই উচ্চমূল্যের যন্ত্রের ব্যবহার মোট আবাদি জমির মাত্র ১০ শতাংশ। তবে এই যন্ত্রের ব্যবহারও বাড়ছে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ধান রোপণ, কর্তন ও মাড়াই-ঝাড়াইয়ে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার ছিল সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ।
তবে এই ধারা কত দিন অব্যাহত থাকবে, তা নিয়ে যন্ত্রের উৎপাদক, আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সন্দিহান। তারা বলছে, মোটা দাগে দুটি সমস্যা—একটি হলো যন্ত্রের উচ্চমূল্য, দ্বিতীয়ত ব্যাংকঋণ। ব্যাংকের যুক্তি, এই যন্ত্রের কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। তারা কিসের ওপর ভিত্তি করে ঋণ দেবে। এ অবস্থায় আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আশঙ্কা, সরকারি সহযোগিতা শেষ হলে এসব যন্ত্র বিক্রি হবে খুবই কম। কারণ কৃষকরা চাইলেও ব্যাংক এ ক্ষেত্রে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। ফলে যন্ত্রের উৎপাদক বা আমদানিকারকরাই বাকিতে বিক্রি করছেন। কিন্তু এই ধারা বেশিদিন চালানো সম্ভব নয়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি আলীমুল এহছান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার এ খাতে তিন হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। এর মধ্যে কম্বাইন্ড হারভেস্টারের জন্য দিচ্ছে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এই অর্থ মেশিনের দামের অর্ধেক বা কিছু বেশি। সেই হিসাবে বেসরকারি খাতকে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু এসব যন্ত্রের কোনো রেজিস্ট্রেশন না থাকায় ব্যাংক বিনিয়োগ করতে চায় না। আমরা রেজিস্ট্রেশনের নীতিমালা করার কথা বারবার বলে আসছি, কিন্তু হচ্ছে না। ফলে আমাদের ঋণসীমা শেষ হলে এসব মেশিন বিক্রি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
কৃষি যন্ত্রপাতি দেশে যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি আমদানিও হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্যোগে ফসল দ্রুত ঘরে তুলতে কৃষকদের আর শ্রমিকসংকটে পড়তে হবে না। এ ছাড়া উৎপাদন-পরবর্তী ফসল অপচয়ও কমবে।
প্রতিটি কম্বাইন্ড হারভেস্টারের দাম ২৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা। সরকার ১৪ থেকে ১৮ লাখ টাকা দিচ্ছে কৃষককে। বাকি টাকা কৃষকের। এসিআই মটরস, আলিম ইন্ডাস্ট্রিজ, মেটালসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এসব যন্ত্র বাজারজাত করছে। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কৃষককে ছয় থেকে ৯ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়ে মেশিন বিক্রি করছে। এই টাকা কৃষক দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ করছে। এসিআই মটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এফ এইচ আনসারি বলছেন, ‘আমরা যে ঋণ দিচ্ছি, তার ৫০ শতাংশ ফিরে আসছে। বাকিটা এক ধরনের খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এর পরও যে হারে বিক্রি হচ্ছে, তাতে আমরা আশাবাদী। বর্তমানে কৃষিযন্ত্রের বাজার তিন হাজার কোটি টাকার হলেও এ বাজার ৩০ হাজার কোটি টাকার হতে পারে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, যন্ত্রের ব্যবহারে কৃষকের জন্য কিছু সুবিধা রয়েছে। তাঁরা কম খরচে ফসল মাঠ থেকে তুলে এনে প্রক্রিয়াজাত করতে পারছেন। এতে দ্রুত ফসল ঘরে তোলা যায়। এতে দুই ফসলের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান কমে আসে। অন্য বড় সুবিধা হলো ফসলের অপচয় কমে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক এ টি এম জিয়াউদ্দিন বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসলের নিবিড়তা ৫ থেকে ২২ শতাংশ বেড়ে যায়। যন্ত্র দিয়ে মাঠে ফসল বুনলে বীজ ২০ শতাংশ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও ১২ থেকে ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যাতে কৃষকের মোট আয় বেড়ে যায় ২৯ থেকে ৪৯ শতাংশ।
প্রকল্পসংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় ৫১ হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।
ডিএসইর তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের অধীনে ২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সারা দেশে এক হাজার ৭৬২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার, ৩৭৯টি রিপার, ৩৪টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় দুই হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বোরো মৌসুমে এসব যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। আগামী বোরো মৌসুমের আগে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে। এরই মধ্যে হাওর অঞ্চলে ৬৫ শতাংশ জমিই চাষাবাদ হচ্ছে কৃষির আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক বেনজীর আলম বলেন, ‘ভবিষ্যতে কৃষিকাজের শ্রমিক একেবারেই পাওয়া যাবে না। তাই দ্রুত আধুনিকায়নের দিকে যাচ্ছি আমরা। এ জন্য প্রতিবছর বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯৬০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা পূরণ হয়নি : নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, সবার জন্য পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের জোগানের লক্ষ্যে দ্রুত কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সফল ধারা অব্যাহত রাখা হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সময়মতো মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হবে।
বাস্তবে এখনো দেশের পাঁচ কোটি ২০ লাখ মানুষ মাঝারি ও তীব্র খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩১.৯ শতাংশ। সংখ্যাটি ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আরো বেড়েছে। এ সময়ে নতুন করে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ বেড়েছে ১২ লাখ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি প্রতিবেদন-২০২১’-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে প্রতিবেশে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশের তুলনায় দেশে খাদ্যঝুঁকি বেশি।
অন্যান্য : সহজ শর্তে কৃষিঋণ বিতরণ অব্যাহত রাখা, কৃষির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিপণন সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা, হাওর, পাহাড় ও উপকূলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার বিষয়ও ছিল ইশতেহারে। এর মধ্যে কৃষিঋণ বিতরণের সরকারের বেশ সাফল্য এসেছে।
