প্রশ্ন: বিক্ষোভ মিছিলের বিধান কী? এর অনুমোদনের প্রমাণগুলো কী কী? এবং এর নিষেধাজ্ঞার প্রমাণগুলো কী কী?
শাইখ নাসির আল ফাহাদ হাফিজাহুল্লাহর উত্তর:
বিক্ষোভ মিছিলের বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। এই বিষয়ে আমার বক্তব্যকে আমি সংক্ষেপে এভাবে পেশ করব:
কিছু ভাই যারা বিক্ষোভকে জায়েজ বলেছেন, তারা এর পক্ষে সুন্নাহ থেকে দলিল খুঁজেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তারা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত প্রতিবেশীর বিখ্যাত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন [১], যা আজকাল “জনমত তৈরি করা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই হাদীসটি সুনানে আবি দাউদে বর্ণিত হয়েছে।
এছাড়াও তারা আব্দুল্লাহ বিন ইয়াস বিন আবি যুবাবার হাদীস ব্যবহার করেন যেখানে নারীরা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে (নবীর সামনে) অভিযোগ করেছিলেন (অর্থাৎ একটি মহিলা বিক্ষোভ) [২]। এটিও সুনানে আবি দাউদে বর্ণিত হয়েছে।
কিন্তু বিক্ষোভের বৈধতা প্রমাণের জন্য এই সব দলিল আনা জরুরি নয়, কারণ মৌলিক নীতি হলো: “এই দ্বীনের মধ্যে আল্লাহ যা শরীয়তভুক্ত করেছেন, তার বাইরে কিছুই শরীয়তভুক্ত নয়, এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তার বাইরে কিছুই হারাম নয়।” সুতরাং ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো ‘তাওকিফ’ (অর্থাৎ এর সীমা অতিক্রম করা জায়েজ নয়), তাই এর জন্য অবশ্যই দলিল পেশ করতে হবে।
আর জাগতিক বিষয়াদি (‘আদাত) এর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো যে এগুলো সাধারণভাবে বৈধ। যদি কেউ কোনো কিছুকে হারাম বলে, তাকে তার জন্য দলিল পেশ করতে বলা হবে। এটিই এই বিষয়ে মৌলিক নীতি (‘আসল)।
সুতরাং যারা বিক্ষোভকে বৈধ বলেন এবং এই মৌলিক নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের কোনো দলিল পেশ করার প্রয়োজন নেই। কারণ আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তার বাইরে কিছুই হারাম নয়। আর যদি কেউ এর বৈধতা প্রমাণ করার জন্য দলিল পেশ করে, তাহলে তো ভালোই। তবে তা হবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত। তাই এখন আমাদের দেখতে হবে যারা বিক্ষোভকে নিষেধ করেন তাদের কী দলিল রয়েছে, তারপর আমরা সেগুলোর উত্তর দিতে পারি এবং বিষয়টি শেষ করতে পারি।
তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত দলিল তিনটি:
১) এটি একটি বিদআত,
২) এটি কাফেরদের অনুকরণ,
৩) এটি ফাসাদ (বিশৃঙ্খলা) এর দিকে ধাবিত হওয়ার কারণে একটি অকল্যাণ প্রতিরোধের উপায় (সাদ আয-যারাই’) হিসেবে হারাম।
—
১) তাদের এই যুক্তি যে এটি একটি বিদআত, তা বাতিল। কারণ বিদআত হলো ইবাদতের ক্ষেত্রে, জাগতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে নয়। সুতরাং এই যুক্তি যে ভিত্তিহীন তা দেখানোর জন্য বেশি কথা বলার প্রয়োজন নেই।
২) তাদের এই যুক্তি যে এটি কাফেরদের অনুকরণ, এটিও বাতিল। কারণ ইতিহাস এমন ঘটনা দিয়ে ভরে আছে যেখানে লোকরা একত্রিত হয়েছে এবং মিছিল করেছে এবং কিছু দাবি করেছে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইতিহাসের দিকে তাকান এবং প্রথম শতাব্দীর (হিজরি) দ্বিতীয়ার্ধে বসরার এবং কুফার ইতিহাসের দিকে তাকান, এবং দেখুন এই ধরনের বিক্ষোভ কত বেশি ছিল। এটি আমরা শরীয়তসম্মত বা বৈধ কিছু প্রমাণ করতে বলছি না, বরং এটি প্রমাণ করতে বলছি যে এটি কাফেরদের অনুকরণের মত বিষয় নয়।
৩) এবং তাদের এই যুক্তি যে এটি ফাসাদের দিকে ধাবিত করে, এটিও সঠিক নয়। কারণ আমরা এটিকে সর্বত্র ঘটতে দেখছি এবং তারা যে ধরনের ফাসাদ ঘটার দাবি করে তেমন কোনো ফাসাদ সেখানে ঘটে না। বরং এর মাধ্যমে অনেক বড় উপকার (‘মাসালিহ আযিমাহ) অর্জিত হয়েছে, যেমন মিশরীয় তাগুতকে (অর্থাৎ মোবারককে) উৎখাত করা। যদিও এর মাধ্যমে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা হয় নি, তবুও তাকে উৎখাতের মাধ্যমে অন্যায় ও অত্যাচার কিছুটা কমে এসেছে এবং তার (অর্থাৎ মোবারকের) শাসনামলে যে ন্যায়বিচার ছিল না তা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে এনেছে। এটি এই বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ। এবং আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
ফতোয়াটির উৎস : ফাতাওয়া আল-হাইরিয়্যাহ, যা শাইখের ফতোয়া সমূহের একটি সংকলন। অনুবাদ – খিজির হায়াত
—
[১] সম্পূর্ণ হাদীস: আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, “এক ব্যক্তি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমার একজন প্রতিবেশী আছে যে আমাকে কষ্ট দেয়।’ তিনি বললেন, ‘যাও এবং তোমার জিনিসপত্র রাস্তায় বের করে রাখো।’ সে তার জিনিসপত্র রাস্তায় বের করে রাখল। লোকেরা তার চারপাশে জড়ো হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপার কী?’ সে জবাব দিল, ‘আমার এক প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দেয় এবং আমি তা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর কাছে উল্লেখ করেছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, “তোমার জিনিসপত্র রাস্তায় বের করে রাখো।” তারা বলতে শুরু করল, ‘হে আল্লাহ, তাকে অভিশাপ দাও! হে আল্লাহ, তাকে লাঞ্ছিত করো!’ যখন লোকটি তা শুনল, সে তার কাছে বেরিয়ে এসে বলল, ‘তোমার বাড়িতে ফিরে যাও। আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে আর কষ্ট দেব না।'” http://sunnah.com/adab/6/24
[২] সম্পূর্ণ হাদীস: ইয়াস বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর বান্দী (নারীদের) মারবে না।” যখন উমার (রাঃ) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর কাছে এসে অভিযোগ করলেন যে, “নারীরা তাদের স্বামীদের প্রতি খুব দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে,” তখন তিনি তাদের মারার অনুমতি দিলেন। এরপর অনেক মহিলা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর পরিবারের (স্ত্রীগণের) কাছে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেলেন, এবং তিনি (নবী) বললেন, “অনেক মহিলা মুহাম্মদের পরিবারের কাছে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে এসেছে। যারা এমন করে, অর্থাৎ যারা তাদের স্ত্রীদের মারধর করে, তারা তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নয়।” http://sunnah.com/riyadussaliheen/1/279
