মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে আদম আল-ইথিওপী (রাহি.)

আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান

0
425

জ্ঞানের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে আদম আল-ইথিওপী। বহু কষ্ট, শ্রম ও সাধনার মাধ্যমে তিনি দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করেছেন। সঠিক পথের উপর অটল থাকার নিমিত্তে তিনি দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। শত কষ্টের মাঝেও তিনি দ্বীনের উপর অবিচল থেকে আমরণ দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ও প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি মক্কার বহু স্থানে ও মসজিদে হারামে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের দারস প্রদানে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। দ্বীনের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের আরবী ভাষায় বহু খণ্ডে রচিত বিশাল বিশাল গ্রন্থগুলো সত্যিই বিস্ময়কর। এই মহান মনীষী গত ২০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজি‘ঊন! নিম্নে তাঁর জীবনী তুলে ধরা হলো :

জন্ম :

হাদীছ ও তাফসীর বিষয়ে সুগভীর পাণ্ডিত্ব্যের অধিকারী মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে আদম আল-ইথিওপী (রাহি.) হিজরী ১৩৬৫ মোতাবেক ১৯৪২ সালে ইথিওপিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সম্মানিত পিতা আলী একজন বিজ্ঞ আলেম হওয়ার সুবাদে জন্মের পর সর্বপ্রথম তিনি তাঁর পিতার নিকট কুরআনের বিশুদ্ধ তেলাওয়াত শেখার পাশাপাশি হিফয করা শুরু করেন। অতঃপর তাঁর পিতা তাকে কুরআনের পূর্ণ হাফেয বানানোর জন্য ‘মুহাম্মাদ ক্বাছু’-এর নিকট সোপর্দ করেন এবং তার নিকটেই তিনি হিফয সম্পূর্ণ করেন। অতঃপর এই মহান মনীষী তার দেশের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী সিলেবাসভিত্তিক কুরআন-হাদীছের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের প্রতি মনোনিবেশ করেন। তিনি তাঁর পিতার পাশাপাশি সে দেশের অনেক বিজ্ঞ আলেম-উলামার কাছ থেকে আরবী ব্যাকরণ, হাদীছ ও উছূলে হাদীছ, ফিক্বহ ও উছূলে ফিক্বহ, তাফসীর ও উছূলে তাফসীরসহ আরবী ভাষার প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করেন।

তাঁর শিক্ষকগণ :

১. কুরআন শিক্ষা লাভ করেন, মুহাম্মাদ ক্বাছু (রাহি.)-এর নিকট।

২. আরবী ব্যাকরণ ও তর্ক শাস্ত্রের শিক্ষা লাভ করেন, শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ ইবনে শায়খ আলী আদ-দার্রী (রাহি.)-এর নিকট।

৩. ইলমে ফিক্বহের জ্ঞান লাভ করেন, বিশিষ্ট ফক্বীহ ও বিশ্লেষক শায়খ সাঈদ (রাহি.)-এর নিকট।

৪. তাফসীরের জ্ঞান লাভ করেন, বিশিষ্ট মুফাসসির শায়খ আব্দুল জলীল ইবনে শায়খ আলী আল-বারিয়াদী (রাহি.)-এর নিকট।

৫. ইলমে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন, শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সিরাজ ইবনে ছালেহ, শায়খ নূর ইবনে শায়খ ইদরীস, শায়খ মুহাম্মাদ নূর আদ-দানী (রাহি.) প্রমূখসহ তৎকালীন মুহাদ্দীছগণের নিকট।

ইথিওপিয়া হতে পবিত্র ভূমি মক্কা :

শায়খ (রাহি.) ব্যতীত আরও অনেকের নিকট তিনি শিক্ষা লাভ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের পর ইথিওপিয়ার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চার বছর যাবৎ শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তৎকালীন ইথিওপিয়ায় কমিউনিস্টদের আগ্রাসন, নিযার্তন ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ঈমান নিয়ে এই মহান মনীষী ১৯৭৯ সালে স্বদেশ হতে হিজরত করে সঊদী আরবের মক্কা নগরীতে পাড়ি জমান। মক্কা নগরীতে আগমনের পর তার শুভাকাক্সক্ষীদের অনেকে তাঁর জীবিকা নির্বাহ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর শিক্ষকতার জন্য প্রচেষ্টা করেন। কিন্তু এই মনীষীর সঙ্গে কোনো সার্টিফিকেট না থাকায় শিক্ষকতার পেশায় যোগদান করার সুযোগ হলো না। নিরুপায় হয়ে তিনি আবার শিক্ষা অর্জনের জন্য মাসজিদুল হারাম কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মা‘হাদুল হারামিল মাক্বী’-তে ভর্তি হয়ে যান এবং সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ পর্যন্ত শেষ করেন।

কর্ম জীবন :

ইথিওপিয়াতে পড়ালেখা শেষ করে সেখানে তিনি চার বছর শিক্ষকতা করেন। অতঃপর সঊদী আরবে হিজরত করার পর মক্কার বিখ্যাত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ‘দারুল হাদীছ আল-খায়রিয়্যা’-তে চাকরির জন্য আবেদন করেন। সে প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন অধ্যক্ষ শায়খ আলী ইবনে আমের (রাহি.) যখন জানতে পারলেন যে, তিনি ইথিওপিয়ায় একজন শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু এখন তার কাছে সার্টিফিকেট না থাকায় কোথাও শিক্ষকতা করতে পারছেন না। তখন তিনি তাকে বললেন, আমাদের কাছে যোগ্যতা প্রাধান্যযোগ্য, সার্টিফিকেট নয়। অতঃপর তাকে অস্থায়ীভাবে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিছুদিন পর তাঁর যোগ্যতা ও জ্ঞানের গভীরতা দেখে প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পরিচালনা পর্ষদে তাঁর বিষয়ে আলোচনা হয়। উচ্চ পর্ষদের প্রধান শায়খ আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহি.) তাঁকে দারুল ‘হাদীছ আল-খায়রিয়্যা’-এর স্থায়ী শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ প্রদান করেন। পাশাপাশি তিনি ‘শুঊনুল ইসলামিয়্যাহ ওয়াদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ’ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাসজীদুল হারামে তাফসীর, হাদীছ, আক্বীদাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এশার ছালাতের পর নিয়মিত দারস প্রদান করতেন। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত দ্বীনের খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।

সাঊদী আরব গিয়ে তুমি কট্টর ওয়াহাবী হয়ে গেছো? ‘না, আমি ছহীহ সুন্নাহর অনুসারী হয়েছি’।

এই মহান মনীষীর পিতৃপুরুষগণ হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তিনি ছাত্র জীবন থেকে সত্যান্বেষী মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। তিনি ও তাঁর পিতৃপুরুষগণ হানাফী মাযহাবের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ছহীহ হাদীছের উপর আমল করতেন। তাঁর পিতা যখন ছাত্রদেরকে বুখারীর পাঠদান করতেন, তখন তিনি আড়াল থেকে ছহীহ হাদীছ শুনে শুনে ছালাতে রাফঊল ইয়াদাইনসহ ছহীহ হাদীছভিত্তিক আমল করতে আরম্ভ করেন। তিনি যখন কমিউনিস্টদের অত্যাচারে মক্কায় আগমন করেন। তখন শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া, শায়খ ইবনুল ক্বাইয়িম ও শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব (রাহি.) প্রমুখগণের সংকলিত বই-পুস্তক অধ্যয়ন করে উপলব্ধি করেন যে, তার পিতৃপুরুষগণ যে মানহাজ বা মাযহাবের অনুসরণ করে, তা কুরআন ও ছহীহ হাদীছের সাথে সাংঘর্ষিক। তাদের আক্বীদা-বিশ্বাস ভ্রান্ত এবং তা ভ্রান্ত ফেরক্বা আশ‘আরীদের আক্বীদা দ্বারা প্রভাবিত। তাই তিনি সে সকল ভ্রান্ত আমল ও আক্বীদা থেকে ফিরে এসে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহভিত্তিক আমল করা শুরু করেন। কয়েক বছর পর তিনি স্বদেশ সফরে যান। সেখানে তিনি তাঁর সম্মানিত উস্তাদগণের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তার এই আমল ও আক্বীদার পরিবর্তন লক্ষ্য করে, তারা তাকে বলেন যে, তুমি ওয়াহাবী হয়ে গেছো। তার প্রতি উত্তর তিনি বলেন, ‘না, বরং আমি কুরআন ও হাদীছের অনুসারী হয়েছি। তার উস্তাদগণ বলেন, আমরা জানি যে, তুমি দেশে থাকতেও ছহীহ হাদীছের উপর আমল করতে, কিন্তু সঊদী আরব গিয়ে তুমি কট্টরপন্থি ওয়াহাবী হয়ে গিয়েছো।

তাঁর দুনিয়া বিমুখতা :

শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে আদমের মাঝে ছিল জ্ঞান-গরিমা ও দুনিয়া বিমুখতার অপূর্ব সমন্বয়। আধুনিক যুগের সকল প্রচার মাধ্যম হাতের নাগালে থাকলেও আত্মপ্রচারের ক্ষেত্রে ছিলেন সতর্ক। আজ যেখানে ইলমের মিসকীনরা মিডিয়া কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে, সেখানে জ্ঞানের সাগর হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর পূর্বে খুব কম মানুষই তাকে চিনতো। সত্যিকারার্থে তিনি ছিলেন একজন মুখলিছ ও প্রচারবিমুখ মানুষ।

তাঁকে ছাত্ররা জিজ্ঞেস করেন, শায়খ! আপনি বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন না কেন? তিনি তার উত্তরে বলেন, আমি বিদ্যা অর্জন করেছি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সার্টিফিকেটের জন্য নয়। তাই আমার কোনো সার্টিফিকেট নেই।

শায়খ (রাহি.)-এর লিখিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ :

শায়খ (রাহি.) তাঁর জীবনে ৫০টিরও অধিক কিতাব সংকলন করে গেছেন।

১. ‘যাখীরাতুল উক্ববা ফী শারহিল মুজতাবা’ কিতাবটি ৪২ খণ্ডে সংকলিত।

২. ‘আল-বাহরুল মুহীত্ব আছ-ছাজ্জাজ ফী শারহি ছহীহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ’ ৪৫ খণ্ডে সমাপ্ত।

৩. ‘কুররাতু আইনিল মুহতাজ ফী শারহি মুক্বাদ্দামাতি ছহীহ মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ’।

৪. আল-জালীসুস ছালেহুন নাফে‘ শারহুল কাওকাবুস সাত্বে’ ফী উছূলিল ফিক্বহী’।

৫. ‘নাযমুন মুখতাসারুন ফী উছূলিল ফিক্বহী’।

৭. মাশারিকুল আনওয়ারিল ওয়াহহাজ ওয়া মাত্বালিঊল আসরারিল বাহহাজ ফী শারহি সুনানে ইবনে মাজাহ’।

তাঁর ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মন্তব্য :

১. ইমাম আলবানী (রাহি.) বলেন, ‘যাখীরাতুল উক্ববা’-এর মতো সুনানে নাসাঈর কোনো সালাফী ব্যাখ্যা নেই।

২. বিশিষ্ট দাঈ মুক্ববিল ইবনে হাদী আল-ওয়াদী আল-ইয়ামানী (রাহি.) তাঁর ‘যাখীরাতুল উক্ববা’ সম্পর্কে বলেন, এটি বুখারীর শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীর মতো গ্রহণযোগ্য। আমি সকল ছাত্রদের বলব, ‘তারা যেন অবশ্যই উক্ত ব্যাখ্যাটি অধ্যয়ন করে।

মৃত্যু :

গত ২১ সফর ১৪৪২ মোতাবেক ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ রোজ বৃহস্পতিবার মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ তার ভুল-ত্রুটিগুলো মাফ করে জান্নাতের মেহমান হিসাবে কবুল করুন- আমীন!

* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

fourteen + eight =