জননেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তাঁর ইনফেকশনের খবরটি আমাদের একটি বড় সর্তকবার্তা দিয়ে গেল। ইনফেকশন থেকে সেপসিস হয়ে তাঁর এই চলে যাওয়া আমাকে আমার আব্বার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
আমার আব্বাকে শেষ কয়েক মাস মূত্রনালির ক্যাথেটার ব্যবহার করতে হতো, আর সেখান থেকেই বারবার ইনফেকশন হতো। আমি নিজে মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজির মানুষ হওয়ায় আব্বার জন্য কোন এন্টিবায়োটিক কাজ করবে, তা খুঁজে পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাগলের মতো লিটারেচার পড়েছি। কারণ, আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া এখন সাধারণ এন্টিবায়োটিকের ধার ধারে না।
নেদারল্যান্ডসে আসার পর আমার চোখ খুলে গেল। এখানে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে তারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর। বছর দেড়েক আগে আমার প্রচণ্ড সাইনাস ইনফেকশন হলো, সাথে তীব্র ব্যথা। আমি ধারণা করেছিলাম এটি ব্যাকটেরিয়ালই হবে। কিন্তু ডাক্তার ব্লাড টেস্ট করে দেখলেন ইনফেকশনের মার্কার অত বেশি নয়। তিনি জানিয়ে দিলেন, এন্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে না, অপেক্ষা করতে হবে।
আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু অবাক হলাম যখন দেখলাম মাত্র ২ দিন পর কোনো ওষুধ ছাড়াই আমি সুস্থ হয়ে গেলাম! অথচ দেশে থাকতে আমরা মুড়ি-মুড়কির মতো এন্টিবায়োটিক খেতাম। এখন আমি ড্রাগ ডিসকভারি নিয়ে কাজ করি, কিন্তু বিদেশে আসার পর থেকে খুব প্রয়োজন ছাড়া একটা প্যারাসিটামলও আর খাই না। সাধারণ সর্দি-জ্বরে মা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, প্যারাসিটামল খেয়েছি কিনা, কেননা মা জানে আমি আর প্যারাসিটামলও খাই না, জ্বর বেশি হলে তো অন্য কথা।
আমার কিছু বিশেষ অনুরোধ:
১. শরীরের ওপর আস্থা রাখুন: সাধারণ সর্দি-জ্বরে হুটহাট এন্টিবায়োটিক না খেয়ে শরীরের ইমিউন সিস্টেমের ওপর আস্থা রাখুন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, পানি খান এবং ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল খান।
২. নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ নয়: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজের ইচ্ছায় কোনো এন্টিবায়োটিক কেনা বা খাওয়া বন্ধ করুন।
৩. চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান: একান্ত প্রয়োজন নিশ্চিত না হয়ে এন্টিবায়োটিক দেবেন না। রোগী আসলেই এক হালি ওষুধ লিখে দিতে হবে, এই কালচার পাল্টানো এখন সময়ের দাবি। ওষুধ প্রয়োজন না হলে রোগীকে বুঝিয়ে বলুন কেন তাঁর এন্টিবায়োটিক লাগবে না।
৪. কঠোর আইন প্রণয়ন: এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধে কর্তৃপক্ষকে নেদারল্যান্ডসের মতো কঠোর আইন করতে হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আজই আমরা সচেতন না হলে, ভবিষ্যতে সাধারণ ইনফেকশনও এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। যেখানে কার্যকারিতা হারিয়ে কোনো এন্টিবায়োটিকই আর প্রাণ বাঁচাতে পারবে না। মুড়ি-মুড়কির মতো এন্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ না হলে আমাদের সামনের দিনগুলো হবে ঘোর অন্ধকারের।
