অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: ভারতে সরকারের ‘প্রতিশোধে’ দেশটি থেকে পাট গোটাতে বাধ্য হল আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংগঠন

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ভারত সরকারের 'প্রতিহিংসামূলক আচরণে'র জেরে তারা সে দেশে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

0
310

অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে মঙ্গলবার জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারত সরকার তাদের সব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেন বন্ধ করে দেওয়ার পর সেখানে তাদের পক্ষে আর কোনও ক্যাম্পেইন বা গবেষণা চালানো সম্ভব নয়।

ভারতে মানবাধিকার তথা সিভিল লিবার্টিজ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বলছেন, সে দেশে যখন সমাজের নিপীড়িত শ্রেণী ও সংখ্যালঘুরা বারবার আক্রান্ত হচ্ছেন এবং কাশ্মীরের মতো দেশের নানা প্রান্তেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে – তখন এভাবে ভারতে অ্যামনেস্টির কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়াটা বিরাট এক আঘাত।

বস্তুত ভারত-শাসিত কাশ্মীরের মানবাধিকার পরিস্থিতিই হোক বা কিংবা মুসলিমদের পিটিয়ে মারার ঘটনা – সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে সব সংগঠন সরকারের সমালোচনায় সবচেয়ে সরব, অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া ছিল তার প্রথম সারিতেই।

তবে ভারতে অ্যামনেস্টির কার্যক্রমকে বারবার সরকারের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। ভারতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বহুদিন ধরেই তাদের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।

ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া বহুদিন ধরেই বিদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ করছে এবং তার মাধ্যমে ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট’ বা এফসিআরএ লঙ্ঘন করে আসছে।

দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়েছে, অ্যামেনেস্টির ভারতীয় কার্যালয় ‘প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে’র (এফডিআই) রুট ব্যবহার করে ব্রিটেন থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান পেয়েছে – যেটা তারা করতে পারে না।

বস্তুত ২০১৮ সালেই ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট (ইডি) ভারতে অ্যামনেস্টির সব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে দিয়েছিল।

সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে অ্যামনেস্টি সাময়িক অব্যাহতি পেলেও পরে তাদের বিরুদ্ধে ইডি আবার একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে তারা জানতে পারে যে তাদের কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই তারা লেনদেন করতে পারবে না, কারণ সরকারের পক্ষ থেকে ইডি তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এরপর কর্মীদের মাইনে দেওয়া, চলমান ক্যাম্পেইন, গবেষণা বা ফিল্ড রিপোর্টগুলোর খরচ চালানো অ্যামনেস্টির পক্ষে একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে – যার ফলশ্রুতিতে এদেশে কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক অবিনাশ কুমার বলেছেন, “গত দুবছর ধরে আমাদের বিরুদ্ধে সরকার একনাগাড়ে যে ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে আর এই যে আমাদের অ্যাকাউন্টগুলো সব জব্দ করা হল, এটা কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়।”

“সরকার আমাদের লাগাতার যেভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এটা সেই পরিকল্পনারই অংশ”, দাবি করেছেন তিনি।

সাম্প্রতিককালে দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং কাশ্মীরের সরকারের মানবাধিকার রেকর্ডের সমালোচনা করার সঙ্গেও এই পদক্ষেপের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে অ্যামনেস্টি মনে করছে।

ভারতের বেশ কয়েকজন অগ্রণী মানবাধিকার কর্মী এই ঘটনায় অ্যামনেস্টির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।

পিপলস ইউনাইটেড ফর সিভিল লিবার্টিজের (পিইউসিএল) নেত্রী কবিতা শ্রীবাস্তব বিবিসিকে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলছিলেন, “অবৈধভাবে বিদেশি অর্থ নেওয়ার অজুহাতকে ব্যবহার করে সরকার গত বেশ কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থাকে হেনস্থা করছে।”

“অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া তারই সবশেষ শিকার বলে আমি মনে করি।” “অ্যামনেস্টি ভারতে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলে এ দেশে প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলো নিশ্চিতভাবেই আরও স্তব্ধ হয়ে পড়বে”, মন্তব্য করছেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

two × three =