নারীরা যৌন দাসীর কাজ করার পেছনে দু’টো কারণ থাকে—
- এক. স্বভাবগত,
- দুই. বাধ্যগত ৷
নিম্ফোম্যানিয়া নামে এক ধরনের মানসিক রোগ আছে ৷ এই রোগে আক্রান্ত নারীদের শারিরীক চাহিদা সাধারণ নারীদের থেকে কিছুটা বেশি থাকে ৷ আক্রান্ত নারী বেশির ভাগ সময় উদ্বিগ্নতায়, অবসাদগ্রস্ততায় ভোগেন ৷ সদা যৌনতার প্রবল আকাঙ্খা নিয়ে ভাবতে থাকেন l অস্বাভাবিক মাত্রায় শারীরিক চাহিদা পূরণের জন্য একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন । এমনকি এই রোগের কারণে স্বামী থাকা কালেও তার অনুপস্থিতে একাধিক পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন অনেক নারী ।
আরব্য রজনীর গল্পে এক দৈত্যের চরিত্র পাওয়া যায় যে তার স্ত্রীকে বাক্স বন্দি করে মাথায় নিয়ে ঘুরতো ৷ কিন্তু স্বামী ঘুমিয়ে পড়লে স্ত্রী বাক্স থেকে বের হয়ে ঠিকই পর পুরুষের সাথে মিলিত হতো ৷ সম্রাট নেপোলিয়নের স্ত্রী জোসেফাইন এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন ৷ মার্কিন মনোবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার প্রায় তিন কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত ।
বাংলার বেশ্যালয়ের রাজধানী খ্যাত কলকাতায় ১৮৫৩ সালে বেশ্যালয় ছিলো ১২,৪১৯ ৷ মাত্র চৌদ্দ বছরের ব্যবধানে ১৮৬৭ সালে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০,০০০ এ ৷ এই বেশ্যাদের অধিকাংশই এসেছিলো উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের কাছ থেকে ৷ এদের সবাই কিন্তু অভাব বা দারিদ্রতার কারণে যৌন পেশায় আসেনি ৷ এদের মাঝে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে আত্মপ্রতিষ্ঠা বা আত্মপরিচিতি খুঁজে পাবার আকাঙ্খা, আধুনিক ভাষায় আমরা যাকে বলি “ক্যারিয়ার” ৷ সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, একঘেয়ে জীবনযাপন প্রসূত মানসিক অবসাদ এবং তা থেকে বেরিয়ে রোমাঞ্চকর যৌন অভিজ্ঞতা আহরণের জন্য সম্ভ্রান্ত ঘরের হিন্দু মেয়েরা পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত হতো (তথ্যসূত্রঃ ঊনিশ শতক বাঙালি মেয়ের যৌনতা— অর্ণব সাহা) ৷
বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্তের হার সম্পর্কে জানা যায় না ৷ যদি কারো মাঝে এই রোগ বাসাও বাঁধে পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে তা ডানা মেলতে পারে না ৷ যেসব পরিবারে অনুশাসন, ধর্মীয় মূল্যবোধ কম তারাই সাধারণত এসব রোগে আক্রান্ত হয় ৷ এখানকার বেশির ভাগ নারী বাধ্য হয়েই যৌনদাসীর কাজ করে ৷ দাস-দাসী প্রথাটা কবে, কখন, কিভাবে শুরু হয়েছে এ ব্যাপারে সঠিক ইতিহাস পাওয়া দুস্কর ৷
রোমান, গ্রীস, ব্যবলিন, মিশরীয়, ইসলামী প্রায় সভ্যতাতেই দাসী প্রথার অস্তিত্ব পাওয়া যায় ৷ তৎকালীণ সময়ে এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের, এক ধর্মের লোকের সাথে আরেক ধর্মের যুদ্ধ লেগেই থাকতো ৷ সেক্ষেত্রে পরাজিত দলের যুদ্ধবন্দিদের হত্যা, বন্দি বিনিময়, মুক্তিপণ আদায়, শুভেচ্ছা নিদর্শণ, কারাদন্ড অথবা দাস-দাসী পরিণত করাটাই ছিলো নিয়ম ৷
গ্রীক সভ্যতায় যুদ্ধবন্দী নারীদের আশ্রমের ইতিহাস পাওয়া যায় ৷ যুদ্ধবন্দী নারীদেরকে তারা আশ্রমে রাখতো এবং নগরের সকল পুরুষের জন্য এসব নারীরা ছিলো উম্মুক্ত ৷ একই রকম ইতিহাস পাওয়া যায় রোমানদের ক্ষেত্রেও রোমানদের হাম্মামগুলো হয়ে উঠেছিলো ব্যভিচারের কেন্দ্রবিন্দু ৷ কারণ তাদের আশ্রমে যুদ্ধবন্দী নারীরা উলঙ্গ হয়ে পুরুষদের সাথে একত্রে স্নান করতে বাধ্য ছিলো ৷
চাণক্যের মতে, যৌন দাসীদের সমাজ থেকে বাদ দিলে রাজতন্ত্রেরই ক্ষতি ৷ রাজ্যের অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি বর্গ এদের কাছে যাওয়া আসা করে ৷ যারা মন্দিরে পুরোহিতদের মনোরঞ্জন করেন অর্থাৎ দেবদাসী তাদের ব্যাপারে চাণক্য কোন উচ্চবাচ্য করলেন না ৷ কারণ এতে ধর্মতন্ত্রের সাথে রাজতন্ত্রের সংঘাত হতে পারে ৷ এদের নিয়ন্ত্রণের ভার মন্দিরের পুরোহিতদের হাতে ছেড়ে দিলেন ৷ যারা পরিবারভূক্ত যৌনদাসী অর্থাৎ রক্ষিতা বা উপপত্নী তাদের নিয়ন্ত্রণের ভার তাদের মনিবদের উপর ছেড়ে দিলেন ৷ তারা চাইলে মনিবের প্রাসাদে বা বাগান বাড়িতে থাকতে পারবে ৷ এদেরকে মনিবের আইন মেনে চলতে হবে৷
সর্বজনভোগ্যা যৌনদাসী বা বারঙ্গনাদের তিনি সরকারী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন ৷ এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারী ভাবে গণিকাধ্যক্ষ বা সর্দার নিয়োগ করা হয় ৷ প্রতিটা যৌনদাসীর আয়, ব্যয়ের হিসাব গণিকাধ্যক্ষ সরকারের নিকট দাখিল করতেন ৷ কোন যৌনদাসী তার অতিথির কাছ থেকে কী পরিমাণ নগদ অর্থ দাবী করতে পারবে তা অধ্যক্ষই ঠিক করে দিতেন, এবং দিন শেষে উপার্জিত অর্থ অধ্যক্ষের প্রতিনিধির নিকট বুঝিয়ে দিতেন ৷ ঠিক যেভাবে বাসের কন্ট্রাকটর যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দেয় ৷
ইসলামের বিধানে ব্যক্তিগত দাসী আছে কিন্তু সর্বজনভোগ্যা দাসী নেই ৷ দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান বেগমের সন্তানের সম মর্যাদা পাবে ৷ সৌদি প্রিন্স বান্দার বিন সুলতান আফ্রিকান দাসীর সন্তান হয়েও সৌদি রাজ পরিবারে প্রিন্সের মর্যাদা পেয়েছেন ৷ ইসলাম দাস-দাসী প্রথাকে প্রত্যক্ষভাবে নিষিদ্ধ করেনি ঠিক, কিন্তু পরোক্ষভাবে বিভিন্ন গোনাহের কাফফারা হিসেবে দাস-দাসীদের মুক্ত করতে উৎসাহিত করেছে ৷ রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “কেউ যদি তার দাসকে চড় মারে তবে তার জন্য কাফফারা হলো তাকে মুক্ত করে দেওয়া ৷” তিনি আরোও বলেন, “তোমরা যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দাও, ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাবার দান কর এবং রুগ্ন ব্যক্তিকে সেবা কর ।”
মানব ইতিহাসে এমন কিছু বিষয় আছে যেগুলো নির্মূল করা সম্ভব নয় ৷ যেমন, বলা হয়ে থাকে বাল্য বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে আপনি প্রচুর অবিবাহিত কিশোরীর হিডেন ভিডিও পাবেন ৷ বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বাস্তবে কিন্তু অনেক লোকই পরকীয়ায় জড়িত ৷ যে বিষয়গুলো নির্মূল করা সম্ভব নয়, ইসলাম সেগুলো নিষিদ্ধ না করে নিয়ন্ত্রণ করেছে ৷ দাস-দাসী প্রথাটাও তখন এমন ছিলো ৷ যুদ্ধবন্দিদেরকে যদি দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ না করা হতো, তাহলে তাদের থাকা, খাওয়া, পরা অর্থাৎ মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হতো না ।
জ্ঞানপাপী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এবং মূর্খ সাধারণত এই তিন শ্রেণীর লোকেরা ইসলামী শরীয়াহ সম্পর্কে আপত্তি তোলে থাকে ৷ মেয়েদের প্রতি পুরুষের আকর্ষণকে কখনো নির্মূল করা সম্ভব নয়, নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ৷ আর এই আকর্ষণবোধকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মেয়েদের নিরাপত্তার ভার পরিবারের পুরুষদের হাতে অর্পণ করা হয়েছে ৷
দেশে এখন যুদ্ধ নেই, নেই দস্যু কর্তৃক নারী ও শিশু অপহরণের ভয়, নেই ভীনদেশী হানাদার, গরু-ছাগলের মত হাটে তুলে মেয়েদের বিক্রি করার দিনও শেষ ৷ তবুও কেনো আপনার কন্যা, আমার বোন, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যৌনদাসীর কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে? কারণ আমাদের উপর নিরাপত্তার যে ভার অর্পণ করা হয়েছে আমরা তা পালনে ব্যর্থ ৷
সেই যুগে প্রতিপক্ষের শত্রু বা দস্যুদল পিতা, ভাই, সন্তানকে হত্যা করেই নারীদের যৌনদাসীর কাজ করতে বাধ্য করতো ৷ আপনি, আমি, আমরা জীবিত থেকেই আমাদের মেয়েদের ওরা ভোগ করছে ৷ সত্যিই কি আমরা জীবিত আছি? না কি বেঁচে থাকার অভিনয় করছি?
Sayedur Rahman
