শায়খা সামিয়া বকর বানাসি (রহ.) ছিলেন কোরআনের একজন প্রবীণ শিক্ষিকা। তিনি ছিলেন সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরের অধিকারী। একজন দক্ষ হাফেজা ও কিরাতশাস্ত্রে পারদর্শী ব্যক্তিত্ব হিসেবে শায়খা সামিয়া (রহ.) সুপরিচিত ছিলেন। মিসর ও মিসরের বাইরের অসংখ্য নারী ও পুরুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল।
তারা তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন কেরাতের পাঠ নিয়েছে। তিনি তাদের কিরাতশাস্ত্রের অনুমতি দিয়েছেন। শায়খা সামিয়া (রহ.)-এর পুরো জীবন কোরআনের সেবায় নিবেদিত ছিল। আল্লাহও যেন তাঁকে দীর্ঘ জীবন দিয়ে কোরআনের সেবা করার অবকাশ দিয়েছিলেন।
ঠিক যেমনটি ইরশাদ হয়েছে, ‘যাদের আমি কিতাব দিয়েছি তারা যথাযথভাবে তা তিলাওয়াত করে এবং তারাই তাতে বিশ্বাস করে। আর যারা তা প্রত্যাখ্যান করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২১)
শায়খা সামিয়া বকর বানাসি (রহ.) ১৮ মে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মিসরের মানুফিয়্যা জেলার আবনাহাস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সামিয়া (রহ.) ছিলেন জন্মান্ধ, তবে মাত্র ছয় বছর বয়সে কোরআন হিফজ শুরু করেন।
কোরআনের প্রতি অদম্য ভালোবাসা ও মমত্বের কারণে তিনি মাত্র ১১ বছর বয়সে কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন। শায়খ আলী হাম্মাদ (রহ.)-এর কাছে তিনি কোরআন হিফজ করেন এবং শায়খ মোস্তফা মাহমুদ আনুসি (রহ.)-এর কাছে তিনি কিরাতশাস্ত্রের উচ্চতর জ্ঞানার্জন করেন।
তবে ধারণা করা হয়, তিনি কিরাতশাস্ত্রের কমপক্ষে ১০ জন নারী ও পুরুষ কারির কাছ থেকে কিরাতশাস্ত্রের সনদ বা অনুমতি লাভ করেন। শায়খা সামিয়া (রহ.) গাধার পিঠে চড়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শায়খ মোস্তফা মাহমুদ আনুসি (রহ.)-এর বাড়িতে যেতেন এবং শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত তার স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সঙ্গে থেকে পাঠ গ্রহণ করতেন। শায়খ আনুসি (রহ.)-ও তার উচ্চাশা, ত্যাগ, শ্রম, মেধা ও প্রতিভা দেখে তাঁকে নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন।
শায়খা সামিয়া (রহ.)-এর পিতা শায়খ মুহাম্মদ বকর ছিলেন একজন হাফেজে কোরআন। তিনি চাইতেন তার সব সন্তান কোরআনের হাফেজ হোক। কিন্তু কেবল জন্মান্ধ শায়খা সামিয়াই তা করতে সমর্থ হন। তাঁর চাচা শায়খ ইবরাহিম মুরসি বকর বানাসি (রহ.) ছিলেন মিসরের একজন বিখ্যাত কারি। তিনি প্রতিবছর তিন মাস নিজ গ্রামে অবস্থান করতেন। সে সময় শায়খা সামিয়া চাচার কাছে কিরাতশাস্ত্রের পাঠ নিতেন ও কিরাত চর্চা করতেন।
২০ বছর বয়সে (১৯৫০ খ্রি.) তিনি হিফজুল কোরআনের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি কিরাতশাস্ত্রের উচ্চতর পাঠদান শুরু করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের তিন কিরাতের (হাফস, ওয়ারশ ও হামজা) পাঠদান করতেন। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশের অসংখ্য নারী-পুরুষ তাঁর কাছ থেকে কিরাতশাস্ত্রের উচ্চতর পাঠ গ্রহণ করেছে। বিশেষত আরব বিশ্বে তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান কোরআনের শিক্ষিকা।
শায়খা সামিয়া (রহ.) কোরআনকেই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে জীবনে বিয়ে করার প্রয়োজন বোধ করেননি। ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত (আগস্ট ২০২০ খ্রি.) কোরআনের সেবা করে যান। সারা রাত কোরআন তিলাওয়াত করা ছিল তার প্রিয় আমলগুলো একটি। তিনি এশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত সাত থেকে ১০ পারা কোরআন তিলাওয়াত করতেন। কোরআনের সেবিকা হিসেবে জীবন কাটাতে পারায় তিনি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে শায়খুল আজহার ড. আহমদ তাইয়িব শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আল্লাহ শায়খা সামিয়া বকর বানাসির প্রতি অনুগ্রহ করুন। তিনি ছিলেন অগ্রগামী হাফেজদের একজন। তিনি দ্বিনের সেবায় একনিষ্ঠ নারীদের জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ ছিলেন। সারা জীবন কোরআনের সেবা করে তিনি মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। হে আল্লাহ, আপনি কোরআনকে তাঁর জন্য সুপারিশকারী করুন, হে পরম দয়ালু, তাঁর সঙ্গে দয়ার আচরণ করুন।’
মিসরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় কারি শায়খ মুহাম্মদ হাশাদ বলেন, ‘একজন পথিককে আল্লাহ দৃষ্টিশক্তির বিনিময়ে কোরআনের দৌলত দান করেছেন। তিনি ছিলেন একজন দুনিয়াবিমুখ ইবাদতকারী, পূতঃপবিত্র ও আল্লাহভীরু নারী। যিনি তাঁর জীবনের সব কিছু আল্লাহ ও কোরআনের সেবায় উৎসর্গ করেছেন। ফলে তিনি বিয়ে করেননি। এমনকি তাঁর পবিত্র আত্মা কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করতে করতে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছে।’
তথ্যসূত্র : আল-মিসরিয়্যু আল-ইয়াউম ও আল-জাজিরা
