গাজা উপত্যকায় গণহত্যার চালানোর জন্য ইসরাইলকে আসামি করে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) দায়ের করা মামলায় দক্ষিণ আফ্রিকা তার বক্তব্য প্রদান করেছে। আজ বৃহস্পতিবার দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী আদিলা হাসিম শুনানি করেন। আগামীকাল শুক্রবার ইসরাইলের আইনজীবী বক্তব্য রাখবেন। তবে আজ যেভাবে আদিলা হাশিম ইসরাইলের নৃশংসতা তুলে ধরেছেন তাতে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, আবেগ-বর্জিতভাবে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করার ফলে ইসরাইল ফেঁসে যাবে। আর তা ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় বয়ে আনবে।
উল্লেখ্য, আইসিজের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা জাতিসঙ্ঘের ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। আর ইহুদিবিরোধী হলুকাস্টের প্রেক্ষাপটে এই কনভেনশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
গাজায় ইসরাইলি হামলায় ২৩ হাজারের বেশি লোক নিহত হয়েছে। এদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। গাজার ২৩ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইসরাইলি অবরোধে গাজায় খাদ্য ও পানির ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা তার পক্ষে ৮৪ পৃষ্ঠার নথি দাখিল করেছে।
আইনজীবী আদিলা হাসিম আদালতে বলেন, গাজায় গণহত্যা চালিয়ে জেনোসাইড কনভেনশনের দুই নম্বর ধারা লঙ্ঘন করেছে ইসরালি।
তিনি বলেন, ইসরাইল প্রতি সপ্তাহে ছয় হাজার বোমা ফেলেছে। কাউকে রেহাই দেয়া হয়নি, এমনকি নবজাতককেও নয়। জাতিসঙ্ঘ প্রধানেরা একে শিশুদের কবরস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছুই ইসরাইলকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
ব্রিটিশ এমপি এবং প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন বলেন, হেগে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলাটি ‘খুবই শক্তিশালী।’
তিনি বলেন, এটি দারুণভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি বিশ্লেষণাত্মক যুক্তি, এতে কোনো আবেগ নেই।
করবিন আশাপ্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক আইন বলে কিছু থাকলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আদালত অন্তর্বর্তী আদেশ দেবেই।
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবীর বক্তব্যে খুবই খুশি হয়েছে গাজাবাসী। তারা তাদের সত্যিকার অবস্থান তুলে ধরার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আদিলা হাশিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ইসরাইল খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু আদালত যদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে একেবারে মোলায়েম সুরেও অন্তর্বর্তী কোনো রায় দেয়, তবে তা দেশটির আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং বৈশ্বিক সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর তার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণাম হবে ভয়াবহ। এমনকি ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি রুলিং হামাসের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের মোড় পর্যন্ত ঘুরিয়ে দিতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকা তার প্রমাণের পক্ষে কেবল বোমাবর্ষণই নয়, ইসরাইলি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্যও তুলে ধরেছে। এসব মন্তব্যে ইসরাইলি মন্ত্রীরা গাজার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, নির্মূল করা, নিশ্চিহ্ন করার কথা সদম্ভে বলেছিলেন। এগুলোও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।
আইসিজের স্থায়ী বিচারপতির সংখ্যা ১৫। তবে মামলার দুই পক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইসরাইল একজন করে অস্থায়ী বিচারপতি পাঠাতে পারবে।
এই আদালতের বর্তমান সভাপতি হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের জুয়ান ডোনোহুই। অন্য বিচারপতিরা হচ্ছেন ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, স্লোভাকিয়া, জ্যামাইকা, জাপান, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, মরক্কো, সোমালিয়া, লেবানন ও উগান্ডার।
সূত্র : আল জাজিরা, টাইমস অব ইসরাইল এবং অন্যান্য
