মুখস্থ-নির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে অভিজ্ঞতা-নির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রম। গত বছর থেকে শিক্ষাক্রম নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনার শেষ হচ্ছে না। এবার বইয়ের তথ্যগত মান নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইয়ের বিষয়বস্তুর মান দুর্বল করা হয়েছে। এই তিন শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে বাংলার ইতিহাস নিয়ে সূক্ষ্মভাবে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেয়া হয়েছে। নবম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভুল মানচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। এ শ্রেণির বিজ্ঞান বইটির কিছু অংশ হুবহু বিভিন্ন সাইট ও ব্লগ থেকে কপি করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ করেছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। এনসিটিবি বলেছে, সংশোধনের উপযোগী বিষয়গুলো আমরা সংশোধনী দেব।
জানা যায়, ২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হয়েছে তিনটি ক্লাসে। এ বছর বাস্তবায়ন হচ্ছে আরও চারটি ক্লাসে। শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত বছরের মতো এ বছরও চারটি ক্লাসের জন্য লেখা হয়েছে বই। এ বইগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বইয়ে তথ্য ও বিষয়বস্তুর বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।
বইয়ের বিষয়বস্তুর মান কমেছে : নতুন কারিকুলামের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত সব বই প্রাইমারি পর্যায়ের। কিশোর বয়সি শিক্ষার্থীদের বইগুলো লেখা হয়েছে শিশুদেও উপযোগী করে— এমনই মন্তব্য করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা। রাজধানীর একটি স্কুলের শিক্ষক তানভীর হাসান বলেন, নবম শ্রেণির বই দেখে আমার মনে হয়েছে আমার সময়ের পঞ্চম শ্রেণিতেও এতো নিম্নমানের বই দেখি নাই। বইয়ের কাগজ যেমন নিম্নমানের তেমনি বইয়ের ভিতর শিক্ষার জন্য যে ম্যাটারিয়াল আছে সেগুলোও নিম্নমানের। এই ম্যাটারিয়াল শিখে শিক্ষার্থীরা গাড়ির ড্রাইভার বা কাজের বুয়া ছাড়া আর কিছু হতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।
নাসরিন আক্তার নামে একজন অভিভাবক বলেন, প্রতিটি বইয়ের কন্টেন্ট প্রাইমারি লেভেলের। বইগুলোতে আজগুবি গল্প লেখা হয়েছে। কামরুল হাসান মামুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের বয়সের উপযুক্ত শিক্ষা শেখানো হচ্ছে না। তাদের চেয়ে ছোট ক্লাসের জিনিস শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া যেভাবে বোঝানো হয়েছে সেগুলো আরও খারাপ। এত শিশুতোষভাবে শেখানো হচ্ছে, যেন তারা ছোট বাচ্চা।
বইয়ে বাংলার ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য : ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান গ্রন্থে যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তা ‘অখণ্ড ভারত’ বয়ানকে ভিত্তি ধরে লেখা হয়েছে। এমন অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টোরাল স্কলার। তিনি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ের ৫১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘এই বাংলা অঞ্চল আর আমাদের বর্তমান বাংলাদেশ কিন্তু এক নয়। বাংলা অঞ্চলেরই পূর্ব অংশে আমরা বাস করি। আবার এই কল্পিত বাংলা অঞ্চলকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে কল্পিত সেই অখণ্ড ভারতের পূর্বাংশে। অর্থাৎ এই কল্পিত বাংলা অঞ্চল আদতে ভারতবর্ষের অংশ। ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ের ৫২ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘বাংলা অঞ্চল ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষের পূর্ব অংশ’।
সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস গ্রন্থের ৬৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, কীভাবে অখণ্ড ভারত থেকে কালক্রমে বাংলা নামে ভূখণ্ডের উৎপত্তি হয়েছিল-ভারতবর্ষের পূর্বাংশে অবস্থিত বাংলা অঞ্চল। এই বাংলা অঞ্চলের প্রাচীন ‘বঙ্গ’ জনপদ থেকে ধীরে ধীরে ‘বঙ্গাল’ তারপর ‘বাঙ্গালা’ এবং ১৮ শতক থেকে ‘বেঙ্গল’ নাম-পরিচিতি গড়ে উঠেছে। ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ের ৬৬ পৃষ্ঠায় খুব স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের প্রাচীন ভৌগোলিক পরিচয়টা দেয়া হচ্ছে এভাবে— ‘ইতিহাসের আলোকে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রাচীনকালে যে ভূখণ্ড ভারতবর্ষ নামে পরিচিত ছিল সেই ভূখণ্ড এখন দক্ষিণ এশিয়া বা ভারতীয় উপমহাদেশ নামে পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে মোট আটটি রাষ্ট্র রয়েছে। এগুলো হলো— আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং মালদ্বীপ। অর্থাৎ একটা বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে, কল্পিত অখণ্ড ভারতবর্ষ হিসেবে, যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই এবং আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আদতে ছিল এই কল্পিত অখণ্ড ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বই ব্লগ ও ওয়েবসাইট থেকে কপিপেস্ট : নতুন শিক্ষাক্রমে চালু হওয়া জাতীয় পাঠ্যপুস্তকের ??নবম শ্রেণির বিজ্ঞান?? বই বিভিন্ন ব্লগ, কোচিং সেন্টারের ওয়েবসাইট থেকে কপি করা হয়েছে। বইয়ের লেখকরা বেশ কিছু বিষয় কৌশলে অনলাইন থেকে কপি-পেস্ট করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত করেছে ভুল ব্যাখ্যাও। সম্প্রতি নাদিম মাহমুদ নামের একজন গবেষক নিজের ফেসবুক আইডিতে এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন। নাদিম মাহমুদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো সাইন্স বিভাগে পোস্ট ডক হিসেবে গবেষণা করছেন।
নবম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ভুল মানচিত্র : নবম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ১৪৯ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত মানচিত্রে গোঁজামিলভাবে ইসরাইলকে দেখানো হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়টি মুসলমানদের স্বর্ণকণিকা ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত জেরিকো এর প্রাচীন মানচিত্রের স্থানে আধুনিক মানচিত্র ও দেশের অবস্থান দেয়ায় একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। মানচিত্রে সব আধুনিক দেশের নাম উল্লেখ থাকলেও বৈধ রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের নাম নেই। মানচিত্রে জুদাহকে জুড়িয়া নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেখানে সঠিক উচ্চারণ জুদাহ ও জুডাহ। গাজাকে মানচিত্রে গাম্বিয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে গাম্বিয়া পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ। লেখকরা দাবি করে বলেন, বইয়ের মানচিত্রে যেই সীমানা দেখানো হয়েছে সেটা কোনোভাবেই প্রাচীন মানচিত্র না বরং আধুনিক মানচিত্রে উল্টোভাবে জুদাহ ও ইসরাইলের নাম যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, ভুলের জন্য দুই ধরনের সমস্যা। প্রথমত, নিম্নমানের ছাপা ও কাগজ এ ধরনের ভুলের জন্য এনসিটিবি দায়ী। আর দ্বিতীয়ত, বইয়ে যদি ভুল তথ্য এবং বানান ভুল থাকে এর জন্য লেখক দায়ী। এনসিটিবি যেহেতু লেখক নির্বাচন করে সেজন্য ভালোদের সঙ্গে খারাপ লেখক ঢুকে পড়ে। অনেক সময় তাড়াহুড়োর কারণে অযোগ্যরাও ঢুকে পড়ে। খারাপ লেখার দায় শুধু লেখকদের না, সম্পাদকদেরও। তারা লেখায় যে পরিমাণ সময় দেয়া দরকার, সেটা দেয় না। দায়সারা কাজ করে। ভুল থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। সেজন্য যারা একবার ভুল লিখবে বা সম্পাদনা করবে তাদের আর দ্বিতীয়বার বই লেখার দায়িত্ব দেয়া উচিত না।
লেখক ও গবেষক রাখাল রাহা আমার সংবাদকে বলেন, পুরো কারিকুলামই যেখানে সমস্যা, সেখানে পাঠ্যবইয়ের আলোচনা তো গৌণ। পুরো কারিকুলাম সর্বনাশের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এর দ্বারা জাতিকে কারিগরি ধারায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এখানে সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের কারিগরিতে ঢেলে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে বড় মানের বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, বিজ্ঞানী আমরা তৈরি করতে পারব না। এটা বাতিল করতে হবে।
এনসিটিবির সদস্য (কারিকুলাম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, বর্তমানে আমাদের বইয়ের মান কমেনি, বরং বেড়েছে। আমাদের সন্তানরা আগে যা শিখত এখন আরও ভালো শিখতে পারছে। বর্তমান প্রজম্ম থেকে তারা আরও যোগ্য হিসেবে গড়ে উঠছে।
সাইট ও ব্লগ থেকে নকলের বিষয়ে তিনি বলেন, সমালোচনাকারী লেখক মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। গতবারও তিনি একই কাজ করেছেন। যতগুলো চুরির কথা বলছেন সেটা চুরি ছিলো না। মূলত সেই ওয়েবসাইটগুলোর নিচে লেখা আছে, এডুকেশন পারপাস অর্থাৎ পাঠ্যপুস্তকের কাজে এ লেখাগুলো ব্যবহার করা যাবে। তবে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ব্যবহার করা যাবে না। ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইসহ অন্যান্য বইয়ের ভুলের ব্যাপারে তিনি বলেন, এগুলোসহ আরও কিছু ভুল আমরা পেয়েছি। এই মাসের শেষে আমরা সেগুলোর সংশোধনী দিব। এটা যেহেতু পাইলটিং সময় সেজন্য এরকম কিছু ভুল হচ্ছে। আমরা সবাইকে বলেছি, যে কোনো ভুল হলে আমাদের জানাবেন।
