যানজটের রাজধানীর ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নির্বিঘেœ যাতায়াতের মেট্রোরেল করা হয়। কিন্তু স্বপ্নের এই মেট্রোরেল চালুর পর থেকে একের পর এক কারিগরি ত্রুটিতে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটছে এবং ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। ফলে যে কারণে মেট্রোরেল নিয়ে মানুষের মধ্যে উল্লাস ছিল, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই মেট্রোরেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ভুক্তোভোগী যাত্রীরা বলছেন, মেট্রোরেল জাপান করলেও পরিচালনাও টেকনিক্যাল কাজে নিয়োজিত হয়েছে ভারতীয় কিছু টেকনেশিয়ান। ফলে মেট্রোরেলের ঘন ঘন ত্রুটি দেখা দেয়া নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। ৫ নভেম্বর থেকে পুনরায় চালু হওয়া মেট্রোরেল গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার চলাচলে ত্রুটি দেখা দেয়।
গতকাল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় এক ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর মেট্রোরেল চলাচল শুরু হয়েছে। তবে শুধুমাত্র মতিঝিল থেকে পল্লবী এবং পল্লবী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল শুরু হয়। গতকাল শনিবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে বন্ধ হয়ে যায় মেট্রোরেল সেবা। এরপর সোয়া ২টায় আংশিক ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তবে উত্তরা থেকে মতিঝিলগামী ট্রেন এখনও স্বাভাবিক শিডিউলে ফেরেনি। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হয়েছে মেট্রোরেল চলাচল। তবে পুরো পথে এখনও ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি। আপাতত পল্লবী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করছে।
জানা যায়, দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে শেষ ট্রেনটি উত্তরা সেন্টার স্টেশন থেকে মতিঝিল যাওয়ার উদ্দেশে রওনা করার পর থেকেই শুরু হয় সমস্যা। পরের ট্রেনটি ছিল ১টা ২৫ মিনিটে। কিন্তু সেটি ১টা ৩২ মিনিটেও আসেনি। ট্রেনটি ছাড়ার পর উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনের আগে মাঝ পথেই বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১৫ মিনিট সেখানে বন্ধ থাকবার পর ট্রেনটিকে পুনরায় উত্তরা সেন্টারে নেয়া হয়। যাত্রীদের নামিয়ে ট্রেন খালি রেখে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। পরে দুপুর সোয়া ২টায় মতিঝিল থেকে পল্লবী এবং পল্লবী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হয়। মেট্রোরেল সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় প্রচ- ভিড় দেখা দেয় স্টেশনগুলোতে। অপেক্ষা করতে থাকেন হাজারো যাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চলমান থাকায় স্টেশনে যাত্রীদের প্রচুর চাপ ছিল। বিশেষ করে সকালের সময় যাত্রীদের ভিড়ের কারণে কয়েকটি ট্রেনের দরজা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল রীতিমতো যুদ্ধ করেও ট্রেনে উঠতে পারছেন না যাত্রীরা। যাত্রীদের চাপের ফলে ট্রেনের দরজা বন্ধ হওয়ার সময় কেটে যায়। এছাড়াও ইদানিং বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকছে ট্রেন। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। কয়েকটি স্ট্রেশনে মেট্রোরেলের দ্বিতীয়তলা টিকেট কাউন্টারের সামনে থেকে শুরু করে নিচে ফুটপাথেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মেট্রোরেলের চলাচলের আসার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যাত্রীদের।
নিয়মিত যাত্রীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এখন যাতায়াত করেন মেট্রোরেলে। অথচ যাত্রীদের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা নেই কর্তৃপক্ষের। যেমন, সঙ্গত কারণে মেট্রো বন্ধ থাকতেই পারে যান্ত্রিকত্রুটি, ঝড়, ক্যাবলের উপর রশি কিংবা ঘুড়ি, ফানুস ইত্যাদি পরার কারণে। অথচ তা জনগণকে জানানো দায়িত্ব মনে করে না ডিএমটিসিএল। নিয়মিত ত্রুটির কারণে যাতায়াতে বিঘœ ঘটায় দায়িত্বশীল ভূমিকা দেখা যায় না কর্তৃপক্ষের।
একজন যাত্রী বলেন, বেলা ১টা ৪৫ মিনিট। মেট্রো সাময়িক বন্ধ আছে। টিকিট বিক্রিও বন্ধ। কারণ অজানা, কেউ জানলে জানাবেন। এক ঘণ্টা আগে আমি মতিঝিল থেকে মিরপুরে এসেছি। তখন তিনটি স্টেশনে কিছু সমস্যা হয়েছিল বলে ট্রেন স্টেশনে বিরতি নিচ্ছিল।
বেসরকারি কর্মজীবী ও মেট্রোরেলের নিয়মিত যাত্রী আবু জাফর বলেন, মেট্রো স্টেশনে আসার পরে উত্তরা থেকে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মেট্রোরেল বন্ধ থাকছে। যা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। অফিস সময়েও ট্রেন চলাচলে বিঘœ ঘটছে। অফিসের ফেরার সময়ও মেট্রোরেল বন্ধ থাকায় উত্তরা থেকে মতিঝিল যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। শিডিউল মতো চলছে না মেট্রোরেল।
মেট্রোরেল পরিচালনাকারী ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উত্তরা উত্তর থেকে পল্লবী অংশে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ছিল। আমাদের একটা সাবস্টেশন ফল করেছিল, এটা আমাদের সিগন্যালিং সিস্টেমের সঙ্গে রিলেটেড। সেটির সমাধান করা হয়েছে।
পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান বলেন, মানুষ তার চলাচলের সময়ে মেট্রোরেলের মতো একটি সময়সাশ্রয়ী, ভোগান্তিহীন বাহন পেলে তাতেই উঠবে। দরকার ব্যস্ত সময়ে চলাচল বাড়ানো এবং সবাই যাতে উঠতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। মেট্রোরেল সারা বিশ্বেই অতি ঘন ঘন চলাচলকারী গণপরিবহন। এর জন্য সর্বদা তৎপর, স্মার্ট ও দক্ষ জনবল দরকার। ঘনঘন যান্ত্রিক ত্রুটি হলে যাত্রী ভোগান্তি বাড়বে এবং মানুষ মেট্রোরেলের চলাচলে আগ্রহ হারাবে।
