ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং, সহিংসতা আর নানা প্রাপ্ত-হতাশার মধ্য দিয়ে। ১২ তারিখ সারা দেশে ঘটা বিভিন্ন সহিংসতার ব্যাপারে আমরা প্রাথমিকভাবে বেশ কিছু অভিযোগ ও খবর পাই। এরপর যাচাই-বাছাই করে ঐদিনের ২৬টি ঘটনার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে।
যাচাইকৃত ঘটনাবলি
- টাঙ্গাইল-৮ আসনের স্বতন্ত্রপ্রার্থী সালাহউদ্দিন আলমগীরের সমর্থককে সখীপুরে বিএনপির তিনজন কর্মী মিলে মারধর করে।
- গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার রেশমা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটগ্রহণ চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ভোটকেন্দ্র দায়িত্বরত আনসার সদস্য সুকন্ঠ মজুমদার ও সেকশন কমান্ডার জামাল হোসেন এবং ১৩ বছর বয়সী আমেনা খানম আহত হন।
- ঢাকা-৬ আসনের ৪৩নং ওয়ার্ডের জুবলী স্কুল এন্ড কলেজ ভোটকেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার শফিকুল হকের ওপর হামলা করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। একই সাথে পোলিং এজেন্টদেরকেও মারধর করা হয়। এতে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী আব্দুল মান্নানের পোলিং এজেন্টসহ পাঁচজন নেতাকর্মী আহত হন।
- যশোর-৩ আসনের দুই জামায়াত কর্মী ও ভোটার আবু হোসেন (২৫) ও আব্দুল গণি (৫০) বিএনপির কর্মীদের হামলার শিকার হন। তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে আবু হোসেনকে আহত করা হয় এবং সকালের দিকেই আব্দুল গণি ভোট দিতে বাড়ি থেকে বের হলে তাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়।
- ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের লোকজন সকাল থেকেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ছিল। এক পর্যায়ে রেলওয়ে কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে পাটোয়ারীর মাথা লক্ষ্য করে কিছু একটা ছুঁড়ে মারেন বিএনপির এক কর্মী। এ ব্যাপারে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকেও জানান পাটোয়ারী।
- ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদ নগর ইউনিয়নের মাহবুবুল হক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী রেজাউল করিমের ওপর বিএনপির দুই কর্মী বকু ও স্বপন অতর্কিত হামলা করে। সকাল ৯টার দিকে এই ঘটনা ঘটে।
- যশোর-১ আসনের শার্শা উপজেলায় ভোট কেন্দ্রে যেতে বিএনপির কর্মীরা বাধা দিয়েছিল। এরপর হামলাও করা হয় ভোটারদের উপর।
- মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সদর উপজেলার মাকাহাটি উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের কাছে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সকাল ১০টার দিকে বিএনপির কর্মীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে জানা যায়। এছাড়াও ধানের শীষের প্রার্থী মো. কামরুজ্জামান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও হয়েছিল। ঐ আসনে আসনে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এসময় সন্ত্রাসীদের হাতে ছিল বন্দুক এবং একাধিক ব্যক্তি ছিল হেলমেট পরা।
- নোয়াখালীর হাতিয়ায় এনসিপি প্রার্থী হান্নান মাসউদের স্ত্রী ও ভাইকে মারধর এবং মোবাইল ফোন ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। একই এলাকায় সাংবাদিক মিরাজ উদ্দিনের মাথায় ও পিঠে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ সময় সাকিব নামের এক মোটরসাইকেল চালককেও পিটিয়ে আহত করা হয়। এছাড়াও ওচখালী বাজারে হান্নান মাসুদ এর সমর্থক আব্দুল কাদের ও তার ছেলে মো: ফয়সালের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঐ জেলার বুড়িরচর, সোনাদিয়া ও জাহাজমারা ইউনিয়নেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
- ফেনীর কোরশমুন্সি বাজারের ভোটকেন্দ্রের বাইরে বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা চালায়। একাধিক ব্যক্তি রক্তাক্তও হয়।
- চট্টগ্রামের সন্দীপে মুছাপুর পূর্বপাড়া স্কুলে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। ধানের শীষের প্রার্থীর ১০-১৫ জন কর্মী জামায়াতের কর্মীদের উপর হামলা করে। এই হামলায় বাবলু এবং শাহাদাত মারাত্মকভাবে আহত হন। এছাড়াও ৭ নং ওয়ার্ডের ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে খুঁজে না পেয়ে তার মামাতো ভাইয়ের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে।
- ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদ নগর ইউনিয়নের চরকালীদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের কর্মীদের হামলায় ঈগল প্রতীকের কর্মী রক্তাক্ত হয়। এই হামলায় বিএনপির ২ কর্মীকে স্পষ্টভাবে দায়ী করে উপস্থিত জনতা।
- ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ৫ নম্বর সিমলা–রোকনপুর ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সহিংসতার ধরণ ছিল তুলনামূলক ভিন্ন। এখানে রাসেল নামের কাপ-পিরিচ প্রতীকের পোলিং এজেন্টের বাড়িতে হামলার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। হামলার সময় তার ছোট বোন ফামিদা ইসলাম শোভা বাধা দিতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়।
- ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী বৃদ্ধ নাদিম আহমেদের মাথা ফাটিয়ে দেয় ধানের শীষের প্রার্থীর কর্মীরা।
- নাটোরে দৈনিক সংগ্রামের সাংবাদিক জোবায়েরকে নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে শারীরিকভাবে আক্রমণ ও হেনস্তা করে বিএনপির নেতা-কর্মীরা। ১১টার দিকে এই ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। যুবদল নেতা হীরা এই হামলায় জড়িত ছিল। জামায়াতের কর্মীদের সাথে বিএনপীর কর্মীদের হাতাহাতির ভিডিও ধারণ করায় হীরার লোকজন আনসারের কাছে থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে হামলা করে ঐ সাংবাদিকের উপর।
- ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ড. ফয়জুল হকের দুই কর্মীর উপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে বিএনপির কর্মীরা। এতে তারা গুরুতর আহত হন। পরে জানা যায়, ৮ জন আহত হয়েছেন। বড়ইয়া ইউনিয়নের আদাখোলা স্কুলের ৩৬ নম্বর ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।
- যশোর সদর উপজেলার ১নং হৈবতপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের কাউদিয়া গ্রামে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে চাওয়ায় জামায়াতের দুই কর্মীকে আটকে রেখে মারধর করেছে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল হাসান হিরন ও স্থানীয় বিএনপি নেতা মালেক।
- নরসিংদী মির্জানগর বাহেরচর কেন্দ্রে অনিয়মে বাধা দেয়ায় হাতপাখার এজেন্টকে রক্তাক্ত করে বিএনপির কর্মীরা।
- কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের আতাকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে ৭টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার নেতা-কর্মীরা জামায়াত-শিবিরকে এই ঘটনায় দোষারোপ করলেও জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পক্ষের লোকজন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
- রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগমকে দুপুর ৩টার দিকে পবার নলখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে মারধর করা হয়। হাবিবার সঙ্গীরা জানান, হামলাকারীর নাম রজব আলী। তিনি ১০-১৫ জন লোক নিয়ে সেখানে অবস্থান করছিলেন।
- কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফারুকের গাড়ি বহরে হামলা করে বিএনপি সমর্থকরা এবং এ সময় ৩ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। সাড়ে তিনটার দিকে চকরিয়া পৌর এলাকার ১ নং ওয়ার্ডের আর রায়েদ মাদ্রাসার সামনে এই ঘটনা ঘটে। সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণে নেতৃত্ব দেয় বিএনপি সমর্থক নাজিম উদ্দিন। এই আসনটি মূলত সালাহউদ্দিন আহমেদের।
- ঢাকা-১৩ আসনে মামুনুল হকের সমর্থকদের উপর অকারণে হামলা করে সেনাবাহিনী। এমনকি মিডিয়া কর্মীর উপরেও হামলা করে সেনাবাহিনী।
- চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে বিএনপির ও মোমবাতি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৬ জন আহত হন। দুপুর ১টার দিকে আনোয়ারার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। মূলত বিএনপি সমর্থকদের প্রায় ৫০ জনের একটি দল মোমবাতি প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি নেতা এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

নির্বাচনের দিন যেমন সহিংসতা হয়েছে, তেমনি আগের দিন এবং পরের দিনও বিভিন্ন জায়গায় হামলা হয়েছে। ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, পটুয়াখালী ইত্যাদি জেলায় এ ধরণের সহিংসতা ঘটছে বলেও জানা গিয়েছে। এমনকি কুয়েটের ভিসির বাসভবনেও হামলা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। অনেকেরই শঙ্কা, আবার হয়ত নতুন করে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে চলেছে।
