প্রতি বছর হজের মৌসুম শেষে, ঈদ-উল-আজহার ঠিক আগের দিন কাবা শরিফের গায়ে জড়ানো রেশমের কালো আবরণ খুলে নেওয়া হয় এবং তার জায়গায় নতুন একটি পরানো হয়। পুরনো কিসওয়া তখন টুকরো টুকরো করে কাটা হয়, এবং সেই টুকরোগুলো যায় রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, দাতব্য নিলামে।
এই কিসওয়া তৈরিতে সময় লাগে সারা বছর। প্রায় পাঁচশো কারিগর কাজ করেন মক্কার একটি বিশেষ কারখানায়। সাতশো কেজি খাঁটি রেশমে একশো পঞ্চাশ কেজির বেশি সোনা ও রুপার সুতো দিয়ে হাতে বোনা হয় কোরআনের আয়াত। একটি কিসওয়ার বস্তুগত মূল্য প্রায় আশি কোটি টাকার সমতুল্য। কিন্তু এর আসল মূল্য কখনো অর্থে মাপা যায় না। হজে আসা লাখো মানুষ তাওয়াফ করতে করতে এই কাপড়ে হাত রাখেন, কপাল ঠেকান, কাঁদেন, খোদা তায়ালার কাছে নেয়ামত, বরকত আর নাজাত প্রার্থনা করেন। যারা কখনো হজে যেতে পারেননি, তারাও জানেন এই আবরণের কথা, এই কাপড়কে ছুঁয়ে দেখার কল্পনায় কেটেছে অনেকের জীবন।
এ বছরের শুরুতে মার্কিন বিচার বিভাগ জেফ্রি এপস্টাইনের লক্ষাধিক নথি প্রকাশ করেছে। সেই নথির একটি অংশে জানা যাচ্ছে, কাবার কিসওয়ার একটি টুকরো এবং কাবার ভেতরে ব্যবহৃত কাপড়ের এক অংশসহ মোট তিনটি পবিত্র বস্তু পাঠানো হয়েছিল ক্যারিবীয় সাগরের একটি ছোট দ্বীপে। সেই দ্বীপের মালিক ছিলেন এপস্টাইন, আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত যৌন অপরাধী এবং শিশু পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন কথিত ফিনান্সার।
দ্বীপটির নাম লিটল সেইন্ট জেমস। ক্যারিবিয়ান এই দ্বীপে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর অনেকটাই ঘটেছে বলে তদন্তকারীরা মনে করেন। এই দ্বীপেই বছরের পর বছর ধরে নির্মিত হয়েছিল একটি অদ্ভুত স্থাপনা। নীল ও সাদা ডোরাকাটা দেয়াল, উপরে সোনালি গম্বুজ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কোনো মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি। এই ঘরটিকে ঘিরে বছরের পর বছর নানা জল্পনা চলছিল, কেউ এটিকে সঙ্গীতকক্ষ বলেছেন, কেউ বলেছেন গোপন উপাসনার জায়গা, কেউ বা আরও নানা কিছু।
প্রকাশিত নথি সেই রহস্যের অকাট্য উত্তর দিচ্ছে। এপস্টাইন নিজে এই ঘরকে বলতেন তার ‘মসজিদ’। একজন সেকুলার ইহুদির নিজস্ব ‘মসজিদ’ নির্মাণ, রহস্যটা শুরু এখানেই।
রোমানিয়ান শিল্পী ইওন নিকোলা এই ঘরের কাজ করেছিলেন। এ বছরের মার্চ মাসে সাক্ষাৎকারে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে এপস্টাইন ঘরটিকে নিয়মিত মসজিদ বলেই উল্লেখ করতেন। উজবেকিস্তান থেকে আনা হয়েছিল দেয়ালের টাইলস, সিরিয়ার পঞ্চদশ শতকের একটি হাম্মামের স্থাপত্য দেখে তৈরি হয়েছিল নকশা। ২০১১ সালে উজবেকিস্তানের একজন পরিচিতকে এপস্টাইন লিখেছিলেন, “It will be for the inside walls, like a mosque,”।
প্রকাশিত চিঠিপত্রে নিকোলাকে লেখা একটি ইমেইলে দেখা যাচ্ছে, দরজার খিলানে আরবি হরফে যেখানে আল্লাহ শব্দটি থাকার কথা, সেখানে এপস্টাইন চেয়েছিলেন তার নামের প্রথম অক্ষর দুটি বসানো হোক। তার নিজের কথায়, “instead of allah, i thought j’s and e’s।”
এপস্টাইনের ইসলামি শিল্পকলার প্রতি এই উদ্ভট আগ্রহ কেবল স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০০৩ সালে ভ্যানিটি ফেয়ারকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, তার কাছে এমন একটি পার্সিয়ান গালিচা আছে যা কোনো ব্যক্তিগত বাড়িতে দেখা সম্ভবত সবচেয়ে বড়, সেটি এতটাই বিশাল যে মনে হয় কোনো মসজিদ থেকে এসেছে। এই সংগ্রহের পেছনে ছিল অর্থবিত্ত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাশালী মানুষদের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত প্রয়াস, যার সুতো ধরে একসময় পৌঁছানো গিয়েছিল সৌদি রাজদরবার পর্যন্ত।
নরওয়েজিয়ান কূটনীতিক টার্জে রড-লার্সেনের সাথে এপস্টাইনের পরিচয় হয়েছিল ২০১০ সালের দিকে। তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, ব্যবসায়িক বিষয়ে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে, ব্যক্তিগত বিষয়েও। সৌদি আরব ছিল তাদের আলোচনার একটি নিয়মিত প্রসঙ্গ। ২০১৬ সালের দিকে যখন তৎকালীন উপযুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা করছিলেন, এপস্টাইন তখন সেখানে আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। রড-লার্সেনের মাধ্যমে পরিচয় হয় রাফাত আল-সাব্বাহ ও তার সহকারী আজিজা আল-আহমাদির সাথে, যারা সৌদি রাজদরবারের কাছাকাছি মানুষ হিসেবে পরিচিত। এপস্টাইন তাদের সামনে একটি প্রস্তাব রেখেছিলেন, মুসলিম দেশগুলোর জন্য একটি নতুন মুদ্রা, নাম দিয়েছিলেন শরিয়াহ।
সৌদি রাজপরিবারে সাথে সাক্ষাৎ শেষ পর্যন্ত হয়েছিল। আজিজার কার্যালয় থেকে এপস্টাইনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সৌদি কনস্যুলেটে গিয়ে বলতে হবে যে যুবরাজের আমন্ত্রণে তিনি এসেছেন। সৌদি আরব সফর শেষে মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে তোলা ছবি নিয়ে ফিরেছিলেন এপস্টাইন, যা পরে সাজিয়ে রেখেছিলেন নিউ ইয়র্কের বাড়িতে।
২০১৭ সালের শুরুতে আজিজা আল-আহমাদি নিউ ইয়র্কে এপস্টাইনের সাথে দেখা করেন। ঠিক সেই সময়ে তাদের দুজনের সহকারীরা আলাদাভাবে ইমেইল চালাচালি করছিলেন সৌদি আরব থেকে এপস্টাইনের দ্বীপে কিছু পাঠানোর বিষয়ে। এপস্টাইনের সহকারী কাস্টমস ব্রোকারকে জানিয়েছিলেন যে কাবা থেকে তিনটি বস্তু আসছে। নথিতে থাকা ছবি ও বিবরণ থেকে জানা যাচ্ছে, একটি কাপড় ব্যবহৃত হয়েছিল কাবার ভেতরে, একটি ছিল কাবার বাইরের আবরণ অর্থাৎ কিসওয়া এবং তৃতীয়টি এসেছিল মক্কার সেই কারখানা থেকে যেখানে প্রতি বছর কিসওয়া তৈরি হয়। আজিজার প্রতিনিধি সহকারীকে জানিয়েছিলেন যে আরও জিনিস পাঠানো হবে, মসজিদের জন্য।
আজিজা নিজে একটি ইমেইলে এপস্টাইনকে লিখেছিলেন, “কালো এই কাপড়টি অন্তত এক কোটি মুসলমান স্পর্শ করেছেন, সুন্নি শিয়া সব মতের মানুষ। তারা কাবার চারপাশে সাতটি চক্কর দিয়েছেন এবং তারপর যতটুকু সম্ভব এই কাপড় ছুঁয়েছেন। তাদের দোয়া, আকাঙ্ক্ষা, চোখের জল এই কাপড়ে আছে। তারা আশা করেছিলেন এরপর তাদের সব মোনাজাত কবুল হবে।”
২০১৪ সালে তোলা একটি ছবি আছে নথিতে। এপস্টাইনের নিউ ইয়র্কের বাড়িতে, সিঁড়ির গোড়ায়, মেঝেতে বিছানো একটি বড় কাপড়। দুবাইয়ের বন্দর কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রধান সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম আর এপস্টাইন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেই কাপড়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। বিচার বিভাগের নথি বলছে এটিই পবিত্র কাবার সেই কিসওয়া। বিন সুলাইম এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এপস্টাইনের সাথে যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রধান পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
কিসওয়া খোলার পরে বিতরণের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। আজিজা এই টুকরোগুলো কোথা থেকে পেয়েছিলেন, তা নথি থেকে স্পষ্ট হয়নি। তার কাছে মন্তব্য চাওয়া হলে তিনি সাড়া দেননি, সৌদি সরকারও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এপস্টাইনের মৃত্যুর পর থেকে তার দ্বীপের সেই ঘরটিকে ঘিরে জল্পনা থামেনি। লক্ষাধিক পাতার নথি প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় আসে তার একটি আর্থিক দলিল, যেখানে স্ক্যানিং ত্রুটির কারণে ব্যাংকের নামের জায়গায় ছাপা হয়েছিল বাল, যা কিনা আব্রাহামিক ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত একটি পৌত্তলিক দেবতার নাম, শিশু বলিদানের সাথে যার নাম যুক্ত বলে প্রাচীন বিবরণে পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেছেন এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত ভুল। কিন্তু এই একটি ছাপাই যথেষ্ট ছিল মানুষের মনে জমে থাকা অবিশ্বাসকে নতুন রূপ দিতে, কারণ মানুষ আসলে একটি ব্যাংকিং ত্রুটি নিয়ে কথা বলছিল না। তারা কথা বলছিল বছরের পর বছর চোখের সামনে দেখে আসা একটি নিদর্শনকে নিয়ে, যেখানে একজন প্রমাণিত শিশু নিপীড়নকারী বারবার ক্ষমতা ও অর্থের জোরে নাগালের বাইরে থেকে গেছেন।
এপস্টাইনের বিরুদ্ধে যা প্রমাণিত এবং যা নথিতে অভিযোগ হিসেবে আছে, তা কোনো কল্পিত আখ্যানের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। শত শত নাবালিকাকে পাচার, ক্ষমতাশালীদের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং অর্থের মাধ্যমে দশকের পর দশক বিচার এড়িয়ে চলা, বিশ্ব ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা। এই মানুষটির হাতেই পৌঁছেছিল কাবার কিসওয়া।
এপস্টাইনের ইসলামের সাথে কোনো আত্মিক সম্পর্ক ছিল না। তিনি ধর্মান্তরিত হননি, কোনো মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে তার কোনো পরিচয় ছিল না। ইসলামি স্থাপত্য, বিরল শিল্পকর্ম, আরব রাজদরবারের সাথে সম্পর্ক, সব কিছু তার কাছে ছিল একটাই উদ্দেশ্যের হাতিয়ার, মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার নেটওয়ার্ক বিস্তার, এবং এক অজানা কীর্তি সাধন।
তবে একটি প্রশ্নটি থেকে যায়, সেটা এপস্টাইনকে নিয়ে নয়। সেটা তাদের নিয়ে, যারা এই পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন। আজিজা জানতেন এই কাপড়ে কোটি মানুষের চোখের জল মিশে আছে, নিজেই লিখেছিলেন সেই কথা। সৌদি রাজদরবারের যে সংযোগ এই পথ খুলে দিয়েছিল, তারা কি জানত না এই মানুষটি কে, তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ। নাকি জেনেও ক্ষমতা ও অর্থের হিসাবে সেই জানাটুকু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল? এই প্রশ্নটা করার দায়িত্ব কার, সেই প্রশ্নের জবাব এখনো কেউ দেয়নি।
