Wednesday, April 17, 2024
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

হোমদৈনন্দিন খবরসুজন নামের কুজন

সুজন নামের কুজন

কেরানীগঞ্জের মাটি লুটেরা এখন শতকোটি টাকার মালিক

স্কুলের বারান্দায়ও কখনো পা রাখেননি। আছে নিজস্ব দলবল। ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদকও তিনি। জমি, গাছপালা, ভিটেবাড়ি ধসিয়ে দিয়ে হাজার হাজার ট্রাক মাটি লুটে নেওয়াটাও তাঁর কাছে খুব সহজ কাজ। মা-বাবা আদর করে নাম রেখেছেন ‘সুজন’। বাংলা অভিধানে তাঁর নামের অর্থ লেখা ‘ভালো লোক’। নামের সঙ্গে তাঁর কর্মের একেবারেই অমিল। এলাকার লোকজন তাঁকে চেনে ‘সুজন মাঝি’ নামে। অনেকে আবার টিপ্পনী কেটে ডাকে ‘কুজন মাঝি’। এলাকাবাসী মনে করে, সুজন আপাদমস্তক ‘খারাপ লোক’। ‘কুজন’ নামটাই বরং তাঁর সঙ্গে যায়।

কেরানীগঞ্জের কোণ্ডা ইউনিয়নের মাটি লুটে সুজন মাঝি এখন শতকোটি টাকার মালিক। সুজনের লুট করা মাটি যায় আশপাশের ৪০টি ইটভাটায়। এ ছাড়া সরবরাহ করা হয় মাটি ভরাটের ঠিকাদারি কাজে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ পাহারায় সুজন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে অস্ত্রশস্ত্রের মহড়া দিয়ে ফাঁকা গুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে যেখানে-সেখানে হামলা করে। এক্সকাভেটর, ভেকুসহ খননের ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে শত শত শ্রমিক রাত-দিন মাটি কেটে ট্রাকে ভরে নিয়ে যান। ওই এলাকার কয়েক হাজার একর সমতল জায়গা, ফসলি জমি ও ভিটেবাড়ি দফায় দফায় খনন করে ২০ থেকে ২২ ফুট গভীর খাদে পরিণত করেছে এই সুজন বাহিনী।

কে এই সুজন : দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোণ্ডা ইউনিয়নের কান্দাপাড়া এলাকার মৃত মুজার ছেলে সুজন মিয়া (৪০)। সুজনের বাবা পেশায় ছিলেন নৌকার মাঝি। বাবা মারা যাওয়ার পর নৌকার বৈঠা হাতে তুলে নেন সুজন। কেরানীগঞ্জ কান্দাপাড়া থেকে কাউটাইল খেয়া পার করে ভাড়া পেতেন ২৫ পয়সা। পরে পর্যায়ক্রমে ৫০ পয়সা, শেষে এক টাকা।

যার নুন আনতে পান্তা ফুরাত, সেই সুজন মাঝি এখন আঙুল ফুলে কলাগাছ।

ওই এলাকায় বড় বড় কম্পানি জমি কেনা শুরু করলে প্রথমে সুজন জমির দালালি শুরু করেন। পরে জমি কম্পানির লোকজনের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠলে সুজন রূপ পাল্টে ফেলেন। একপর্যায়ে বড় বড় কম্পানির জমির দিকে চোখ পড়ে সুজনের। মাটি লুট করে বিক্রিও শুরু করেন। হাতে আসতে থাকে কাঁচা পয়সা। সুজনকে টাকার নেশা পেয়ে বসে। এখন প্রতিদিন ছয় লাখ টাকার মাটি বিক্রি করেন সুজন। সব ধরনের অপকর্ম সামাল দিতে সুজন গড়ে তোলেন ৪০ সদস্যের বাহিনী। সুজনের প্রধান সহযোগী তাঁর ভাগ্নে সাদ্দাম। সুজন বাহিনীর ভয়ে মুখ খোলে না এলাকার মানুষ।

বাহিনীর প্রধান কাজই হলো বিভিন্ন কম্পানি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে মাটি লুট। আর তাতেই সুজন গড়ে তোলেন টাকার পাহাড়। একসময় সুজন ম্যানেজ করেন স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের। পরে নিজেরই নেতা হওয়ার ইচ্ছা জাগে। একপর্যায়ে সুজন বাগিয়ে নেন শ্রমিক লীগের কোণ্ডা ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক পদ। হাতের মুঠোয় টাকা, রয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী ও রাজনৈতিক পদ। এখন আর পেছনে তাকানোর ফুরসত নেই সুজন মাঝির। তাঁর রয়েছে নিজের ব্যবহারের তিনটি গাড়ি, দুটি মাটি কাটার ভেকু, ডুপ্লেক্স বাড়ি, খুলনায় নিজ নামে কেনা ফ্ল্যাট, বসুন্ধরায় দুটি প্লট, দুটি মাহিন্দ্রা গাড়ি, পানগাঁও এলাকায় ১০ কাঠার একটি প্লট ও তিনটি ইটখোলা।

ফোকলা কোণ্ডা ইউনিয়ন : মাটি লুটেরা চক্রের আগ্রাসী থাবায় বুড়িগঙ্গাসংলগ্ন কোণ্ডা ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামসহ প্রায় সাত বর্গকিলোমিটার এলাকার চেনা চেহারা বদলে গেছে। যত দূর চোখ যায় খাঁ খাঁ বিরানভূমি আর গভীর খানাখন্দে ক্ষতবিক্ষত। কোথাও একচিলতে ছায়া দেওয়ার মতো গাছপালার অস্তিত্ব নেই। ভারী খননযন্ত্রের শব্দ আর মাটিবাহী ট্রাকের অবিরাম ছুটে চলা গোটা এলাকার পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও মাটি লুটেরা চক্র সেখানে শত শত একর জমির শ্রেণি পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। ভুক্তভোগী বাসিন্দারা অভিযাগ করেন, ‘আমাদের জমিকে গভীর খাদ বানিয়ে মাটি লুটে নেওয়া হলেও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ বরাবরই লুটেরাচক্রের পক্ষ নেয়। কোনো এলাকায় সুজনচক্রের মাটি খননের কাজ শুরুর আগেই সেখানে থানা পুলিশের অন্তত দুটি টহল গাড়ি সব সময় অবস্থান করে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে ভেকু মেশিনের চালকও অস্ত্র তাক করে, ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তত্ক্ষণাৎ পুলিশ এসে জমির মালিকদেরই উল্টো ধাওয়া দেয়, মারধর করে। গতকাল সকালেও সরেজমিনে গিয়ে কান্দাপাড়ার অদূরে বড় চারটি যন্ত্র লাগিয়ে মাটি খনন চালাতে দেখা যায়।

যেন মগের মুল্লুক : কেরানীগঞ্জের ব্রাহ্মণগাঁও এলাকায় কুয়েতপ্রবাসী ইসলাম ২০ লাখ টাকা দিয়ে ছয় শতাংশ জমি কিনেছিলেন। সেই জমিতে এ বছরই বাড়ি তৈরির ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু তাঁর সেই জমির আর কোনো চিহ্নই নেই এখন। মাটিখেকো সুজন মাঝির চোখ পড়ায় এলাকাটিই এখন গভীর খাদ। একই কষ্টে দুঃখী হালিম, দেলোয়ার, আইয়ুব আলী, আফসারসহ পাঁচ-ছয়টি গ্রামের ৫০ হাজার মানুষ। এ ব্যাপারে হালিম বলেন, ‘গভীর রাতে, এমনকি দিনদুপুরে সুজন, ডন ও পলাশের লোকজন আমার বাড়ির জমিটি শেষ করে দিয়েছে। এখন আর বাড়ি করার উপায় নেই। পুলিশকে জানালে উল্টো পুলিশ মামলার হুমকি দেয়।’ খুকি নামের আরেকজন বলেন, ‘আমার জমির ওপর ছোট ঘর তৈরি করেছিলাম। ইচ্ছা ছিল ইটের বাড়ি বানানোর। কিন্তু জোর করে মাটি তুলে নেওয়ায় জমির কোনো চিহ্নই নেই। এখন অন্যের বাড়িতে থাকতে হচ্ছে।’

জানা গেছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোণ্ডা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও, কাজীরগাঁও, দক্ষিণ পানগাঁও, পানগাঁও ও কাউটাইলে সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলেছেন সুজন, ডন ও পলাশ। তাঁদের বাহিনী এলাকায় চাঁদাবাজির পাশাপাশি দখলদারির রাজত্ব কায়েম করেছে। জমি, রাস্তাঘাটের মাটি লুটে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তা বিক্রি করছে। এতে জমিতে তৈরি হচ্ছে গভীর খাদ, উৎপাদন করা যাচ্ছে না ফসল। বৃষ্টি এলে তলিয়ে যায় গোটা এলাকা। এতে একদিকে যেমন ফসলি জমি বিরান হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশও পড়ছে মারাত্মক হুমকিতে।

সুজনের অপকর্মের যেন শেষ নেই। তাঁর সব কুকর্ম চলছে খোদ পুলিশের সামনেই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সুজনের নামে থানায় অভিযোগ করলে উল্টো পুলিশই গ্রামবাসীর নামে মামলার হুমকি দেয়। যদিও প্রশাসন বলছে, অন্যায়কারী যে-ই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আনা হবে।

হামলা চলছেই : গত ৯ ফেব্রুয়ারি কান্দাপাড়া এলাকায় জমির মাটি কাটতে যায় সুজন বাহিনী। সেখানে বাধা দিতে গেলে সুজনের লোকজন রাসেল মেম্বারকে মারধর করে। পরে এলাকাবাসী রাসেল মেম্বারের পক্ষ নিলে সুজনের লোকজন গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালায়। এতে সেদিন ২০ জন আহত হয়। সর্বশেষ গত শনিবার সকালে কান্দাপাড়া এলাকায় কাউটাইল মৌজার একটি কম্পানির কেনা জায়গা থেকে মাটি লুট করে নিয়ে যায় সুজন বাহিনী। এ সময় ওই কম্পানির নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দিলে সুজন বাহিনীর সদস্যরা জয়নাল আবেদীন, মিলন ও লিটন নামের তিনজনকে পিটিয়ে আহত করে।

সুজন যা বললেন : মাটি কাটার কথা স্বীকার করে সুজন মিয়া বলেন, ‘আমি অন্য জায়গা থেকে মাটি কিনে বিক্রি করি। মাটি চুরির সঙ্গে আমি জড়িত না। বিএনপির স্থানীয় এক নেতা ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছে। আমার কোনো বাহিনী নাই। কেরানীগঞ্জে কোণ্ডা ইউনিয়নের সব শ্রমিকই আমার বাহিনী।’ তিনি বলেন, ‘আমি গরিবের সন্তান ছিলাম। কষ্ট করে পয়সা করেছি, এটা অনেকের সহ্য হয় না তাই অপপ্রচার করে। আমি যদি খারাপ হতাম, তাহলে কোণ্ডা ইউনিয়নের শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদটি আমাকে দিত না।’

প্রশাসনের বক্তব্য : স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে থানার কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দেবনাথ বলেন, ‘মাটি লুট হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছি। ব্যক্তিগত কাজে ভেকু (মাটি উত্তোলনের যন্ত্র) ব্যবহার নিষিদ্ধ, তবে সরকারি কোনো স্থাপনা বা রাস্তাঘাট নির্মাণে ব্যবহার করা যায়। জানতে পেরেছি, একটি গোষ্ঠী ভেকু ব্যবহার করে মাটি তুলছে। এ ব্যাপারে অচিরেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

2 + ten =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য