Thursday, April 30, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরআবারো বর্জ্যের স্তূপ : প্রাণ ফিরছে না বুড়িগঙ্গা

আবারো বর্জ্যের স্তূপ : প্রাণ ফিরছে না বুড়িগঙ্গা

সীমাহীন দূষণের কারণে ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা এখন প্রায় মৃত নদী। নদী উদ্ধারে ঢাকঢোল পেটানোর মধ্যেও বুড়িগঙ্গা আবার বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নদীর দু’পাড় জুড়ে এখন শুধু আবর্জনার স্তূপ। শিল্পকারখানার বর্জ্য থেকে শুরু করে গৃহস্থালির বর্জ্য সবকিছুর শেষ ঠিকানা এই বুড়িগঙ্গা। এভাবে নদীপাড়ে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় চারদিকের পরিবেশ দুর্গন্ধময় হয়ে পড়ছে এবং নদীও দূষিত হচ্ছে। ফলে কিছুতেই প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না বুড়িগঙ্গা।

পোস্তগোলা সেতু থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীর দু’পাড় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, যে বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে একসময় গড়ে উঠেছিল ঢাকা, সেই ঢাকার বর্জ্য এখন ঘিরে ফেলেছে নদীটাকে। নদীর পানি কালো কুচকুচে। পানি থেকে ছড়াচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ। পানির দুর্গন্ধে শ্বাস নেয়াই কষ্ট হয়ে পড়ে। নদীর পানিতে ভাসছে নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা। ঢাকা মহানগর ও কেরানীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার গৃহস্থালি, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের কঠিন বর্জ্যরে একটা বড় অংশ কোনো শোধন ছাড়াই প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। অপরিশোধিত বর্জ্যের প্রতিটি ফোঁটা এ নদীকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

মাত্রাতিরিক্ত এই দূষণ কমাতে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারের হেমায়েতপুরে সরিয়ে নেয়া হয় ২০১৭ সালের এপ্রিলে। তবে দূষণ থেকে রক্ষা পায়নি নদী। ট্যানারির জায়গা নিয়েছে বুড়িগঙ্গার দু’পাশে থাকা শতাধিক ওয়াশিং ও ডায়িং কারখানা।

মো: জাহাঙ্গীর শিকদার নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, ‘আমি ৫২ বছর ধরে এই নদীটাকে দেখে আসছি। আগে নদী বড় ছিল এবং নদীর পানি পরিষ্কার ছিল। আগে নদীতে জোয়ার ভাটা, স্রোত ছিল এখন আর সেই নদী নাই। এখন নদীটি ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। এখন এ পানিতে গোসলও করা যায় না, খাওয়াও যায় না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আগে পাকিস্তান আমলে দেখেছি আয়নার মতো পানি, ডাবের মতো পানি ঝকঝক করছে। ১০ হাত নিচে গেলেও মানুষকে দেখা গেছে। এখন সেই পানি নাই, নদী ছোট হয়ে গেছে। ওই আমলে লঞ্চ কম ছিল নৌকায় আসতাম। আর বর্ষাকালে আমরা গয়না নিয়ে আসতাম। তখন ছিল কাঠবডি লঞ্চ। ওই লঞ্চে মুন্সিগঞ্জ যাইতাম, আব্দুল্লাহপুর যাইতাম। এখন বড় বড় লঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে। নদীর ধারে ডকইয়ার্ড বানায়, নদীর দেখাশোনা করে না। বাড়িঘর বানায়া সব দখলে চলে গেছে। আর নদীর এ পচা গন্ধে সকল জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

মতিন মিয়া নামের এক মাঝি বলেন, ‘আগে নদীতে ময়লা ফালাতো না, এত আবর্জনা কিচ্ছু ছিল না। নদীর খুব স্রোত ছিল এ স্রোতই এখন নাই। আশপাশের মানুষরাই এ ময়লা ফেলে। শ্যামবাজারের পঁচা পেঁয়াজের স্তূপ ঘাটে ফেলে দেয়। বস্তা ভর্তি আবর্জনা প্রতিটা ঘাটেই দেখতে পারেবেন।’

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর দু’তীরে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্প-কারখানা, বহুতল মার্কেট, ইট-পাথর-সিমেন্টের মহাল, কাঁচামালের আড়ত, ছিন্নমূল মানুষের শত শত বস্তি, নদী ভরাট করে মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির কারণে ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে নদীর প্রস্থ। সেই সাথে একশ্রেণির বিবেকহীন মানুষের যথেচ্ছ অপব্যবহারে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দূষণ অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার গৃহস্থালী ও কল-কারখানার সাত হাজার টনেরও বেশি বর্জ্যের ৬৩ ভাগ বিভিন্নভাবে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ে। শুধু হাজারিবাগে অবস্থিত দু’ শ’র বেশি চামড়াকারখানা থেকে প্রতি দিন গড়ে ২২ হাজার ঘন লিটার দূষিত আবর্জনা বের হয়।

জানা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন যেসব কারখানা ও স্থাপনা বুড়িগঙ্গার পাড়ে রয়েছে সেগুলো বন্ধ করে দেয়ার জন্য পরিবেশ অধিদফতরকে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে পরিবেশ অধিদফতরকে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়। একই দিনে বুড়িগঙ্গার সাথে যুক্ত ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইনগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছিল ঢাকা ওয়াসাকে।

ওই সময় পরিবেশ অধিদফতর হাইকোর্টকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিয়েছিল। প্রতিবেদনে ছিল নদীর দক্ষিণপাড়ে অবৈধভাবে পরিচালিত ৫২টি কারখানা নদীর পানিতে বর্জ্য ফেলে দূষণ ঘটাচ্ছে। ওই কারখানাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র ও তরল বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি প্ল্যান্ট নেই। নদীর উত্তরপাড়েও কিছু কারখানা অবৈধভাবে চলছে। ২০১৭ সালে এ রকম ২৭টি কারখানা এবং এ বছর ১৮টি কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

২০২০ সালের ১৮ মার্চ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ড্রেনের মুখে দূষিত পানি পরিশোধনে ‘ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ বসানো হয়।বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তত্ত্বাবধানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এটি স্থাপন করে। কিন্তু তা এক সপ্তাহও টেকেনি। বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, এটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ ছিল। সফল হলে অন্যগুলোর কথা চিন্তা করা যেত। কিন্তু স্থাপনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওটা ভেঙে যায়।

বুড়িগঙ্গা দূষণের সত্যতা মিলেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ কেন্দ্র (ক্যাপস) ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামের গবেষণায়ও। শ্যামপুরে বুড়িগঙ্গার পানি গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ষার আগে ও বর্ষার পর পরীক্ষা করেছেন গবেষকরা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, শ্যামপুরের পানিতে অক্সিজেনের চাহিদা বেশি, কিন্তু পরিমাণ খুবই কম। এ ছাড়া শ্যামপুরের পানিতে উচ্চ মাত্রার ফেনল, তেল ও গ্রিজের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার অ্যামোনিয়া পানিতে আছে, যা নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

গবেষণা দলের নেতা স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, বিশ্বব্যাংক ৭২টি রাসায়নিক উপাদানকে বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে যা শুধু টেক্সটাইল ডায়িং থেকে তৈরি হয়। বুড়িগঙ্গার পানিতে ক্ষতিকর সব উপাদান পাওয়া গেছে। এগুলো জলজ প্রাণী ও মানব স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বসবাসের জন্য প্রতি লিটার পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ পাঁচ মিলিগ্রাম বা তার বেশি থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে দ্রবীভূত হাইড্রোজেনের মাত্রা কমপক্ষে সাত মিলিগ্রাম থাকা উচিত। অথচ বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ দুই মিলিগ্রামের মতো। এ অবস্থায় বুড়িগঙ্গায় প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার সুযোগ একেবারেই কম। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের (ডাব্লিউবিবি) যৌথ উদ্যোগে বুড়িগঙ্গা নদীর পানির দূষণমাত্রা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীবাসীর পয়ঃবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য, ট্যানারিশিল্পের বর্জ্য, শিল্প-কারখানার বর্জ্য এবং নৌযানের বর্জ্য বুড়িগঙ্গা দূষণের অন্যতম কারণ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় পয়ঃবর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ঘনমিটার। এসব বর্জ্য পরিশোধনের জন্য এক লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন পাগলায় ওয়াসার পরিশোধনাগার রয়েছে, যেখানে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি ১২ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানির গুণগতমানের অবনতি, মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি, শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার অনুপযোগী এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমীক্ষায় বুড়িগঙ্গা নদীর ঢাকা অংশে ৯৫টি দূষণের উৎস চিহ্নিত হয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দূষণের উৎসই ৫৯টি। পরিবেশবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বুড়িগঙ্গায় শিল্পদূষণ কমলেও সরকারি সংস্থার মাধ্যমে দূষণের মাত্রা অনেক বেড়েছে।

বুড়িগঙ্গার আজকের এই করুণ পরিস্থিতির জন্য দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ন। এই অপরিকল্পিত নগরায়ন থেকে সৃষ্টি অপরিকল্পিত শিল্পায়ন। যার কারণে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরণের শিল্প-কারখানা। অপরিকল্পিত নগরায়নের পাশাপাশি দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি বুড়িগঙ্গার পরিবেশকে দিন দিন দূষিত করেছে। ঢাকা শহরের মানুষের সব বর্জ্য ফেলা হয় এই নদীতে। শহরের ড্রেনগুলোর সাথে যেন এই নদীর আছে এক আন্তঃসম্পর্ক। যার ফলে ড্রেনের মাধ্যমে বর্জ্য সরাসরি নদীতে এসে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। আবার বিভিন্ন শিল্প-কারখানার কাঁচামাল সরবরাহ ও যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রচুর পরিমাণ নৌযান নদীতে চলাচলের কারণে নৌযানের পোড়া মবিলও বুড়িগঙ্গা দূষণের অন্যতম কারণ। আর এসব কারণেই বুড়িগঙ্গা আজ হুমকির মুখে।

যে নদীর হাত ধরে গড়ে উঠেছে ঢাকা শহর, সেই নদী আজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্প-কারখানা, তার ওপর যুক্ত হয়েছে অবৈধ দখলদারিত্ব। সব মিলিয়ে বুড়িগঙ্গার অবস্থা এখন নাজুক। নদী হয়ে গেছে সঙ্কুচিত। আর যেটুকুই-বা আছে তা ভরে আছে সব বিষাক্ত পদার্থে। এই বুড়িগঙ্গাকে বাঁচিয়ে তুলতে দরকার সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জমা হওয়া বর্জ্য অপসারণ করতে হলে হাতে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উদ্যোগ নিতে হবে ঢাকার অন্য নদীগুলোর সাথে বুড়িগঙ্গার সংযোগ সারা বছর নাব্য রাখার। নদীতীর দখলমুক্ত করে জনসাধারণের জন্য হাঁটা-চলার রাস্তা তৈরির সাথে লাগানো যায় দেশীয় গাছ। সরকারের সদিচ্ছা ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দীর্ঘমেয়াদে বুড়িগঙ্গাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × three =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য