পৃথিবীতে মানুষ পরস্পরের প্রতি মুখাপেক্ষী। একজন ব্যক্তির পক্ষে সব কাজ করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সব কাজের দক্ষতাও সবার থাকে না। তাই সমাজ ও রাষ্ট্র সচল রাখতে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন হয়। নিয়োগ প্রদান বা পদায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা ও আমানতদারি রক্ষা করা আবশ্যক।
আর তা হলো সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক পদে নিয়োগ দেওয়া। এর ব্যতিক্রম হলে তা খেয়ানত হিসেবে গণ্য হবে।
আমানত রক্ষা করা আবশ্যক কেন
মুমিনের জন্য জীবনের সর্বত্র আমানতদারি রক্ষা করা আবশ্যক। বিশেষত যখন তার সঙ্গে মানুষের অধিকার ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে এবং প্রার্থীদের যাচাই করার দায়িত্ব ব্যক্তির ওপর বর্তায়।
কেননা মহান আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যর্পণ করতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরাণতার সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার ঈমান নেই। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৩৮৩)অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব নয়
ইসলাম অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করতে নিষেধ করেছে।
এমনকি পদপ্রার্থী যদি নিজেকে যোগ্যও মনে করে, তবু অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। আবু জর (রা.) বলেন, আমি নবীজি (সা.)-কে বললাম, আমাকে কি আমেল (প্রশাসক) হিসেবে নিয়োগ দেবেন না? উত্তরে নবীজি (সা.) বলেন, আবু জর! তুমি দুর্বল আর এটি (পদ) আমানতস্বরূপ। কিয়ামতের দিন এটি মানুষের লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ হবে। হ্যাঁ, দায়িত্বটাকে যে ভালোভাবে গ্রহণ করবে এবং অর্পিত দায়িত্বের হক যথাযথ আদায় করবে সে বেঁচে যাবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮২৫)
আলোচ্য হাদিসে দায়িত্ব বণ্টনে মুসলমানের মূলনীতি কি হবে তা তুলে ধরা হয়েছে।
একইভাবে হাদিসে দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে যে দায়িত্ব ও পদ আমানতস্বরূপ। এটা সে ব্যক্তিই গ্রহণ করবে যে তা পালনের সামর্থ্য রাখে, নতুবা ইহকালে ও পরকালে লজ্জিত হতে হবে।
অযোগ্য ব্যক্তির ব্যাপারে সুপারিশ নয়
জেনে-বুঝে কোনো অযোগ্য ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করা খিয়ানত। কেননা হাদিসে পরামর্শ চাওয়া হয় এমন ব্যক্তিকে আমানতদার বলা হয়েছে। সুপারিশকারী ব্যক্তির কাছে পরামর্শ চাওয়া না হলেও ব্যক্তি যদি এমন হন যার কথা উপেক্ষা করা যায় না, তবে তাঁকেও আমানত রক্ষা করতে হবে। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইকে কোনো বিষয়ে পরামর্শ দিল, অথচ সে জানে কল্যাণ ভিন্ন কিছুতে, তবে সে তার সঙ্গে খিয়ানত করল। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৫৭)
নিয়োগ কমিটির দায় সবচেয়ে বেশি
কোনো পদে কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ লক্ষ্যে গঠিত কমিটির দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কেননা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র তাদের ওপর আস্থা রেখেছে এবং তাদের কাছে মতামত ও পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। মাওলানা মনজুর নোমানি (রহ.) বলেন, ‘যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, পরামর্শ গ্রহণকারী তাকে নির্ভরযোগ্য মনে করেই তো তার কাছে যায়। নিজের একটি আমানত তার কাছে সোপর্দ করে। অতএব, তার উচিত, আমানতের হক আদায়ে ত্রুটি না করা। ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করেই তাকে কল্যাণমূলক পরামর্শ দেওয়া এবং বিষয়টির গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করা, নতুবা সে দোষে দোষী সাব্যস্ত হবে।’ (মাআরিফুল হাদিস : ২/১৫১)
পরামর্শভিত্তিক নিয়োগ উত্তম
উত্তরসূরি নির্বাচন বা শূন্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাসে দুই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করতে দেখা যায় :
১. পূর্বসূরি ব্যক্তি নিজের বিবেচনায় যাকে উত্তম মনে করবেন তার ব্যাপারে অসিয়ত করে যাবেন। যেমন আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)-এর ব্যাপারে অসিয়ত করেছিলেন।
২. নির্ধারিত কাউকে নির্বাচন ধনা করে একদল যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব অর্পণ করা। যারা পারস্পরিক মতবিনিময়ের ভিত্তিতে পরবর্তী দায়িত্বশীল নির্বাচন করবেন। যেমনটি ওমর (রা.) করেছিলেন।
বর্তমানের যুগের প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই অধিক নিরাপদ। এ ক্ষেত্রে ওমর (রা.)-এর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ওমর (রা.)-কে বলা হলো, আপনি কি (আপনার পরবর্তী) খলিফা মনোনীত করে যাবেন না? তিনি বললেন, যদি আমি খলিফা মনোনীত করি, তাহলে আমার চেয়ে যিনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন তিনি (আবু বকর রা.) খলিফা মনোনীত করে গিয়েছিলেন। আর যদি মনোনীত না করি, তবে আমার চেয়ে যিনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন তিনি (রাসুল সা.) খলিফা মনোনীত করে যাননি। এতে লোকেরা তাঁর প্রশংসা করল। তারপর তিনি বললেন, কেউ এ ব্যাপারে আকাঙ্ক্ষী আর কেউ ভীত। আর আমি পছন্দ করি আমি যেন এ থেকে মুক্তি পাই সমানে সমান, না পুরস্কার না শাস্তি। আমি জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে এর দায়িত্ব বহন করতে পারব না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২১৮)
পক্ষপাতমূলক নিয়োগ বিপর্যয়ের কারণ
কোনো পদে পক্ষপাতমূলক সমাজ ও রাষ্ট্রে নানা বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এ ধারা যত বেশি দিন অব্যাহত থাকবে মানুষের দুর্ভোগ তত প্রলম্বিত হবে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন অযোগ্য ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে তখনই কিয়ামতের অপেক্ষা কোরো। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯)
মুহাদ্দিসিনরা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দ্বারা সমাজে বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী মন্দ প্রভাবের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের আগে ভাবুন
কেউ কোনো দায়িত্ব গ্রহণের আগে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না—তা ভেবে দেখা আবশ্যক। কেননা পরকালে অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করা হবে। আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। …কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৫৪)
আল্লাহ সবাইকে সুপথ দান করুন। আমিন।
