Thursday, April 23, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াকাসেম সোলেইমানি: সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী

কাসেম সোলেইমানি: সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী

জেনারেল কাসেম সোলেইমানি ছিল কুদস ফোর্সের কমান্ডার। কুদস ফোর্স ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারী গার্ড ক্রপসের শাখা, যা আনকনভেনশনাল ওয়ারফেয়ারে দক্ষ এবং ইরানের ভুখন্ডের বাইরের মিলিটারি অপারেশনগুলো তত্ত্বাবধান করে।২০২০ সালের ৩ জানুয়ারী, কাসেম সোলেইমানি মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয়।

তার সর্বশেষ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে।

তার প্রশংসাকারীদের একজন হলেন ইরানের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কারিম সাদজাপুর। কারিম সাদজাপুর কাসেম সোলেইমানিকে “শিয়া চে গুয়েভারা” হিসেবে অভিহিত করে। কাসেম সোলেইমানির ভূয়সী প্রশংসাকারীরা সাধারণত তাকে “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার” প্রতীক হিসেবে দেখে থাকে।

কিন্তু কাসেম সোলেইমানি কি তার জীবনের পুরোটা সময় শুধু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করে গেছে?

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই কি মুসলিমদের একমাত্র সাম্রাজ্যবাদী হুমকি?

আসুন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে দেখা যাক।

মার্কিনবিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং সুন্নি নির্যাতন

ইরান-ইরাক যুদ্ধে (১৯৮০-১৯৮৮) সক্রিয় অংশগ্রহণ কাসেম সোলেইমানিকে সবার কাছে পরিচিত করে তুলে। ইরাকে মার্কিনবিরোধী যুদ্ধে তার অংশগ্রহণ ছিল ২০০৩ সালের পর থেকে। এক্ষেত্রে শিয়া আধিপত্যবাদী প্রতিষ্ঠান এবং মিলিশিয়া ছিল তার প্রত্যক্ষ সাহায্যকারী। ইরাকে কাসেম সোলাইমানির কর্মকান্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন ইরাকের স্থানীয় সুন্নি মুসলিমরা।

২০১৫ সালে দ্য লং ওয়ার জার্নালের বিল রগিও একটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অবলম্বনে ইসলামিক স্টেট সমর্থন করার ফলস্বরূপ সুন্নিরা যে জাতিগত নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন সে সম্পর্কে লিখে,

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্যমতে, মিলিশিয়া গ্রুপ কর্তৃক নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গণহারে বেসামরিক জনগণের বাসস্থান জ্বালিয়ে দেওয়ার পিছনে কোন সামরিক উদ্দেশ্য ছিল না বরং তা করা হয়েছিলো স্থানীয় সুন্নি গ্রামের বাসিন্দাদের উপর জাতিগত নির্যাতনের উদ্দেশ্যে।❞

আমেরলির যুদ্ধে জড়িত মিলিশিয়াদের মধ্যে কাতাই’ব হিজবুল্লাহ (হিজবুল্লাহ ব্রিগেডস), আসিয়াব আল হাক্ব (লীগ অফ দ্য রাইটিয়াস), সারায়া খোরাসানি (খোরাসান ব্রিগেড) এবং বদর অর্গানাইজেশন অন্তর্ভুক্ত ছিল। পপুলার মোবিলাইজেশন কমিটি বা হাশিদ শাবির তত্ত্বাবধানে কাজ করা এই মিলিশিয়াদের প্রত্যেকটি ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের এক্সটার্নাল অপারেশন উইং, কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল।

আমেরলি বিজয়ের পর শিয়া মিলিশিয়া কমান্ডাররা ইসলামিক স্টেট সমর্থক সুন্নিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দেয়।

আবু আব্দুল্লাহ নামে পরিচিত হিজবুল্লাহ ব্রিগেডসের এক কমান্ডার ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করে, ❝তাদের (সুন্নিদের[the Sunnis]) জন্য ফিরে আসার আর কোন পথ খোলা নেই, আমরা তাদের বাড়ি-ঘর মাটির সাথে মিশিয়ে দিব।❞ রয়টার্সের ওই রিপোর্টেই কয়েকজন কুর্দি যোদ্ধাদের উদ্ধৃত করা হয় যারা হিজবুল্লাহ ব্রিগেডসকে ‘শিয়া ইসলামিক স্টেট’ হিসাবে অভিহিত করে। তারা নিজেদের সাথে শিয়াদের সংঘাতের আশঙ্কাও প্রকাশ করে।

বদর অর্গানাইজেশনের প্রথম প্রধান আবু মাহদি আল-মুহান্দিস মার্কিন ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানির সাথে মৃত্যুবরণ করে।

এটিও উল্লেখ্য যে, সোলেইমানি যখন একদিকে তার অনিয়মিত শিয়া বাহিনীর মধ্যে সুন্নি-বিরোধী মনোভাবকে প্রশ্রয় দিচ্ছিল, তখন অন্যদিকে একটি শিয়া সশস্ত্র সংগঠন এবং মার্কিন সমর্থিত ইরাকি সরকারের মধ্যে শান্তি চুক্তির মধ্যস্থতায় সহায়তাও করেছিল।

রুশ সাম্রাজ্যবাদীদের সহায়তায় সিরিয়ায় সুন্নি নির্যাতন

‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় কাসেম সোলেইমানি ইরাক ও সিরিয়া উভয় দেশের সুন্নি জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন চালিয়েছে। সিরিয়ায় সুন্নি নির্যাতনে আরেক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রাশিয়া তাকে সহায়তা করেছিল।

২০১৫ এর গ্রীষ্মের সময় বাথিস্ট ডিক্টেটর বাশার আল-আসাদ সংকটের সম্মুখীন হয়। তার সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় রিসোর্সের ঘাটতি দেখা দেয়।

এসময় কাসেম সোলেইমানি বাশার আল-আসাদের সাহায্যার্থে রাশিয়ার কাছে ছুটে যায়।

নিম্নে উদ্ধৃত অংশটি সেন্টার ফর স্ট্র‍্য্যটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিস (সিএসআইএস) এর জন্য সংকলিত নিকোল গ্রাজেওস্কির নভেম্বর ২০২১ এর একটি রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে:

❝২০১৫ সালের মে মাসে পালমিরায় আইএসের অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে, দামেস্কের সরকারের পতন এবং সিরিয়ার টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ক্রমশই বাড়তে থাকে। ক্ষমতার লাগাম দূর্বল হওয়ায় আসাদ প্রকাশ্যে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিদ্রোহীদের অগ্রগতি দমন করার মতো প্রয়োজনীয় রিসোর্সের ঘাটতির কথা স্বীকার করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার প্রতিরক্ষায় মনোনিবেশ করে। ওই বছরের ২৪ থেকে ২৬ জুলাই, সোলেইমানি সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের সমন্বয় করতে মস্কোতে পুতিন এবং শোইগুর সাথে গোপনে দেখা করে। সোলেইমানির মস্কো সফরের কিছুক্ষণ পরেই, রাশিয়া এবং সিরিয়ার মধ্যে উত্তর সিরিয়ার খোমেইমিম বিমানঘাঁটি নিয়ে একটি গোপন ঘাঁটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওইসময় সিরিয়ার মাটিতে রাশিয়ান সামরিক সদস্য ও সরঞ্জামের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি সংবাদমাধ্যম আসতে থাকে যেটিকে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সিরিয়ান কর্তৃপক্ষকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ” হিসেবে অভিহিত করে।❞

২০১৫ সালে কাসেম সোলেইমানিকে নিয়ে বিবিসি কর্তৃক প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়,

❝কাসেম সোলেইমানি প্রতিবেশী সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর ও নগর পুনরুদ্ধার করতে কৌশলি ভূমিকা পালন করে।

ইরান, যেটি নিজেকে “ইসলামিক” বলে পরিচয় দেয়, আসলে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করছে।

প্রথমত, বাশার আল-আসাদ একজন বাথিস্ট, এবং বাথিস্ট মতাদর্শ আরব জাতীয়তাবাদ এবং সেকুলারিজমকে সমর্থন করে।

দ্বিতীয়ত, বাশার আল আসাদ একজন নুসাইরি-‘আলাউই, যাদের ইসনা আশারিয়া শিয়ারা অমুসলিম বলে গণ্য করে।

তৃতীয়ত, রুশ সাম্রাজ্যবাদের সাথে হাত মেলানো। পুতিনের মুসলিম নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস এতে কোন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

ভূরাজনীতিতে এর থেকে বেশি ভন্ডামি সম্ভব না।❞

আফগানিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সহযোগিতা

২০১৩ সালে প্রসিদ্ধ সাংবাদিক এবং ওয়ার রিপোর্টার ডেক্সটার ফিলকিন্স সোলেইমানি সম্পর্কে দ্য নিউ ইয়র্কারে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেই রিপোর্টে বলা হয়:

❝৯/১১ এর হামলার পর মার্কিন সিনিয়র স্টেট ডিপার্টমেন্টের তৎকালীন অফিসার রায়ান কুকার জেনেভায় ইরানি কূটনৈতিকদের সাথে সাক্ষাৎ করে। এতে সে তার বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। কুকার আমাকে জানায়, সহকর্মীদের সন্দেহ থেকে বাচার জন্য সে শুক্রবারে জেনেভায় গিয়ে রবিবারে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসে। কুকার আমাকে আরও জানায়, ইরানে কূটনীতিকদের সাথে হওয়া তার মিটিংগুলো সারা রাত পর্যন্ত চলত। কুকারের কাছে দুটি বিষয় পরিষ্কার ছিল: এক, ওই ইরানি কূটনীতিকেরা “হাজি কাসেম” কাসেম সোলেইমানির অধীনস্থ এবং দুই, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের উভয়ের শত্রু তালেবানকে ধ্বংস করার কাজে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। ❞

কাসেম সোলেইমানি যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করেছিল। আফগানিস্তান বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় আমেরিকান বিশ্লেষক বার্নেট রুবিন ওয়ার অন দ্য রকসে লিখে:

❝১৯৯৭ ও ২০০১-এ রাস্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত খাতামির সংস্কারমূলক শাসনকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কোন্নয়নের সূচনা ৯/১১-এর অব্যবহিত পরে ইরানের কর্মপন্থার পুনর্বিন্যাসকে প্রভাবিত করেছিল, যদিও ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে ওই পরিবর্তনটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে (…) ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড ক্রপস কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানি ব্যক্তিগতভাবে সিআইএকে পাঞ্জশির এবং বাগরামে ঘাঁটি স্থাপনে সহায়তা করেছিলো।❞

ইরান কি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী?

আমরা সোলাইমানিকে দেখেছি “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ” এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ইরাকের সুন্নিদের নির্যাতন করতে।

আমরা সোলেইমানিকে দেখেছি আসাদকে টিকিয়ে রাখতে রুশ সাম্রাজ্যবাদকে সহযোগিতা করতে।

এবং আমরা সোলেইমানিকে দেখেছি আফগানিস্তানে “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ”-কে সহযোগিতা করতে।

এটি কি ধরণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ব্যাক্তিত্ব?

যেহেতু সোলেইমানি ইরানের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র ছিল, তাই এক্ষেত্রে প্রশ্নটা হওয়া উচিত:

ইরান আসলে কতটুকু “সাম্রাজ্যবাদবিরোধী”?

সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত ইরানিয়ান-জরোস্ট্রিয়ান আ্যাকাডেমিক ত্রিতা পারসির লেখা “ট্রেচারাস অ্যালায়েন্স” বইয়ে সেকুলারপন্থী শাহ এবং খোমেনির সময়কালে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সুসম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আছে।

আমরা এখানে বইটির কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরতে চাই:

ইরানের ইসরায়েল-বিরোধিতা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইরান নিজেদের আদর্শকে বর্জন করে ইসরায়েল-বিরোধিতাকে শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল কারণ ইরাকের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই।❞ [1]

উপরোক্ত উক্তিটি তখন করা হয়েছিল যখন ইরান সাদ্দাম হুসেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের কাছ থেকে গোপন সামরিক সহায়তা পেয়েছিল।

তাছাড়া, সোলেইমানি সাদ্দাম হোসেনের বিপক্ষে এবং বাশার আল আসাদের পক্ষে লড়াই করেছে, যেখানে তারা উভয়েই ছিল বাথিস্ট।

আমি মনে করি, ইরান এবং সোলেইমানি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কিনা সে সম্পর্কে একটা উপসংহারে পৌঁছার সময় হয়েছে। এটি ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই না। তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত সুন্নিদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

[1] Trita Parsi, Treacherous Alliance: The Secret Dealings of Israel, Iran, and the United States, Yale University Press, 2007, p. 102.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

five × 5 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য