বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের যে ক্ষতি ভোগ করছে, তা উচ্চ আয়ের দেশগুলোর চেয়ে তিন গুণ বেশি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আংকটাড প্রকাশিত বাণিজ্য ও উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২১-এর দ্বিতীয় অংশে এ কথা বলা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই ২০২১ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ মাস আর সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে ২০২০ সালকে। অর্থাৎ বিশ্বের উষ্ণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনে সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে দাবদাহ, মৌসুমি ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দীর্ঘ খরা, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং বিস্তার ঘটছে রোগের। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের ভোগান্তিও চরম পর্যায়ে যাচ্ছে।
ইমার্জেন্সি ইভেন্টস ডাটাবেইস ২০২০-এর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু ২০২০ সালেই ৫০ মিলিয়নের বেশি মানুষ বন্যা, খরা ও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৌসুমি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে চীনেই ২.২ মিলিয়নের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯.৬ মিলিয়ন মানুষ। এর মধ্যে নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এ ছাড়া ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে এশিয়ায় বৈশ্বিক ক্ষতি ৪৩ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে বাংলাদেশ ও ভারত। এর পরিণতি ভোগ করছে ৩০.৬ মিলিয়ন মানুষ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভূমি ডুবে যাবে আগামী ৩০ বছরে। এভাবে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়তে থাকলে দক্ষিণ এশিয়ায় ১০০ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।
প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের বিপদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বড় আকারে সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে সবুজ শিল্পনীতি গ্রহণ এবং শস্য উৎপাদনে সবুজ কৃষিনীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
আংকটাডের মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যান বলেন, ‘এ প্রতিবেদন প্রমাণ করছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। এর পাশাপাশি উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হবে।’
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডাব্লিউএমও) একটি সমন্বিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরার মতো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত বছর বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এক হাজার ১৩০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯৬ হাজার ৯৪৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকারও বেশি।
‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া ২০২০’ নামে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে এশিয়াজুড়ে চরম আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং শত শত কোটি ডলার খরচ হয়েছে। এতে অবকাঠামো এবং বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত বছর এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় নবম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই তালিকায় সবার শীর্ষে চীন।
