হরিদ্বারে ১৭ থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ‘ধর্ম সংসদ’-এর সময় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেভাবে চরম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তা পেছনের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এখানে প্রকাশ্যে মেরে ফেলা, কেটে ফেলা, বংশ নির্মূল ও ‘পরিষ্কার’ করার কথা বলা হয়। হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের জন্য মুসলমানদের মিয়ানমারের মতো দেশ থেকে বের করে দেয়ার আবেদন করা হয়। অর্থাৎ এখানে এমন সব কিছুই হয়েছে, কোনোভাবেই আইন যার অনুমতি দেয় না। অথচ হরিদ্বারের পুলিশ হাতের ওপর হাত রেখে বসে থেকেছে। কেননা, যে স্বামী প্রবোধানন্দ মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা করেছেন, তার এমন একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যেখানে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুস্কর সিং ধামিকে তার পা ছুঁতে দেখা যাচ্ছে। এটা তো স্পষ্ট যে, প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যার পা ছোঁন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সাহস কার মধ্যেই বা থাকতে পারে। ওই পুলিশের মধ্যে তো কখনোই সাহস থাকবে না, যে প্রতিটি কাজের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করে। এতে এটাও প্রমাণ হয় যে, যারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের নিধন ও গণহত্যার হুমকি দিচ্ছে, তারা সরকারের ‘আশীর্বাদ’ অর্জন করেছে। যদি এমনটি না হতো, তাহলে এরা এ মুহূর্তে কারাগারে থাকত এবং পুলিশ পরোয়া করত না।
মিডিয়া রিপোর্টের পর হরিদ্বার পুলিশ নড়েচড়ে উঠেছে বটে, তবে তারা শুধু যতীন্দ্র ত্যাগী (সাবেক ওয়াসিম রিজভি) ও কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে ওই লোকদের নাম লেখাটা সঙ্গত মনে করেনি, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছে। পুলিশের দৃষ্টিতে সম্ভবত মুসলমানদের হুমকি দেয়া এবং তাদের বংশ নির্মূল করার কথা বলা কোনো অপরাধ নয়। অথচ যারা নিজেদের সাংবিধানিক অধিকারের জন্য মুখ খোলে, পুলিশকে সেসব মুসলমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএর আওতায় ব্যবস্থা নিতে অস্থির দেখা যায়। আপনারা দেখেছেন, গত বছর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কত কঠিন ধারায় মামলা দাঁড় করিয়েছে এবং তাদের সাথে দেশের শত্র“র মতো আচরণ করেছে।
এ কথা সবাই জানেন, যখন থেকে বিজেপি কেন্দ্রের ক্ষমতায় এসেছে, তখন থেকে ওই গোষ্ঠী ব্যাপক সুযোগ ও ছাড় পেয়ে যাচ্ছে, যারা ভারতে বিদ্বেষ ছড়ানোর কারবার করে। এরা তারাই, যারা ধর্মের আবরণে মানুষকে লুটতরাজের কথা বলে। প্রকাশ্যে সংখ্যালঘুদের হত্যা ও তাদের নির্মূলের হুমকি দেয় এবং নিজেদের ভারতের ভালো-মন্দের মালিক মনে করে। এরা তারাই, যারা ঢোলে বাড়ি দিয়ে গান্ধীর দেশে গডসের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। বিশ্বের সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু ধর্মের অনুসারী হওয়ার দাবিদার এই উগ্রবাদীদের কথাবার্তা শুনে অনুমিত হয় যে, বিদ্বেষের বিষ তাদের অস্তিত্বের মাঝে পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে। এ জন্য যখনই তারা মুখ খোলে, তখনই সেখান থেকে বিষই বের হয়ে আসে।
এর চেয়ে বেশি লজ্জাজনক বিষয় আর কী হতে পারে যে, যারা মারামারি কাটাকাটি হত্যা-নিধনের হুমকি দিয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন এমনও ব্যক্তি শামিল ছিলেন, যাকে সরকার একটি নিউজ চ্যানেল পরিচালনার লাইসেন্স দিয়েছে এবং বিদ্বেষী মনোভাবের জন্য সারা দেশে তার দুর্নাম রয়েছে। বাহ্যত সরকার যখন নিজেই বিদ্বেষের কারবারিকে লাইসেন্সের ব্যবস্থা করবে, তখন তার দুঃসাহস আকাশ ছোঁবে না কেন? ওই ব্যক্তির নাম হচ্ছে সুরেশ চাভাঙ্কে, যিনি তার চ্যানেলে প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। গত ১৯ ডিসেম্বরও তিনি দিল্লিতে হিন্দু যুবাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে অসংখ্য যুবকদের এই শপথ পাঠ করান যে, তারা এই দেশকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত থাকবে। এ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য লড়াই করা, মরা এবং প্রয়োজন হলে মারারও শপথ করান। আমরা আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, সুরেশ চাভাঙ্কের সুদর্শন চ্যানেল সম্পূর্ণরূপে সরকারের খরচে পরিচালিত হয় এবং তাকে সরকারি ফান্ড থেকে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। প্রকাশ থাকে যে, সরকার যখন এমন লোকদের লালন-পালন করছে, তখন তাদের বিরুদ্ধে কে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? এ কারণেই এ লোকগুলো একের পর এক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে এবং মুসলমানদের মাঝে ভীতি ও ত্রাস ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
হরিদ্বারের ধর্ম সংসদে যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়ার কথা বলেছেন, তিনি কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নন। তার নাম হচ্ছে স্বামী নরেশানন্দ সরস্বতী, যিনি গাজিয়াবাদের ডাসনা মন্দিরের পুরোহিত। এ ব্যক্তি বেশ অনেক দিন ধরেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে যাচ্ছেন। তিনি এর আগে নবী অবমাননার অপরাধও করেছেন। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা রয়েছে। এ ব্যক্তি যে ভাষায় কথা বলেন, এর জন্য তার কারাগারে থাকার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং সরকারের পক্ষ থেকে তার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, বর্তমানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষ ছড়ানো ও তাদের জুলুম নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু বানানোর যে আন্দোলন চলছে, সরকার জেনে বুঝে সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রেখেছে।
১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে অনুষ্ঠিত ধর্ম সংসদের বিষয় রাখা হয়েছিল ‘ইসলামী হিন্দুস্তানে সনাতন ধর্ম : সমস্যা ও সমাধান’। ওই অনুষ্ঠানের কার্যক্রমের যে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, তাতে নরসিংহানন্দ এ ঘোষণা করছেন যে, মুসলমানদের নিধনের জন্য তরবারি যথেষ্ট নয়। বরং এর জন্য উন্নত অস্ত্রের প্রয়োজন। কেননা, তরবারি শুধু স্টেজেই ভালো লাগে। নরসিংহানন্দ আরো বলেন, আমি শৈশব থেকেই মুসলমানদের অর্থনৈতিক বয়কটের কথা শুনছি। কিন্তু বৃদ্ধ হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত এ কথাই শুনতে হচ্ছে। ওই ধর্ম সংসদেই পাটনার স্বামী ধর্মদাস চরম আপত্তিজনক বাক্য ব্যবহার করে বলেন, ‘যদি আমার কাছে বন্দুক থাকত, তাহলে আমি ওই সময়ই নাথুরাম গডসে হয়ে যেতাম, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এ বক্তব্য দিয়েছিলেন, ‘এ দেশের সম্পদের ওপর প্রথম অধিকার সংখ্যালঘুদের’। অপর একটি ভিডিওতে হরিদ্বারের স্বামী প্রবোধানন্দ বলেন, ‘মরতে বা মারতে প্রস্তুত হয়ে যাও। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। মিয়ানমারের মতো প্রতিটি হিন্দু পুলিশ, সেনা ও রাজনীতিবিদের উচিত মুসলমানদের নির্মূল করা।’
এটা এবং এ ধরনের চরম বিদ্বেষমূলক কথাবার্তার ভিডিও বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ কথাগুলোর একটাই উদ্দেশ্য, মুসলমানদের বিরুদ্ধে স্বদেশীদের মনমস্তিষ্কে বিদ্বেষ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করা, যাতে মুসলমানদের সহজ আহারে পরিণত করা যায়। এ ধরনের চরম বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে সাধারণত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। আর যদি হয়ও, তাহলে অপরাধী সহজেই রক্ষা পেয়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, এ ধরনের অপরাধের সাথে সম্পর্কিত ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা এতটাই হালকা, যে কেউই এই আইনের অধীনে বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে চলে আসে। আপনাদের স্মরণে থাকার কথা, কয়েক মাস আগে দিল্লির যন্তর মন্তরে বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে মুসলমানদের মারা ও নিধন করার কথাবার্তা হয়েছিল। এ নিয়ে যথেষ্ট হইচইও হয়েছিল। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু তারা সবাই সহজে জামিন পেয়ে গেছে। অশ্বিনী উপাধ্যায়কে ২৪ ঘণ্টার ভেতরেই মুক্তি দিয়ে দেয়া হয়। এ কারণেই সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিদ্বেষ গোষ্ঠী একের পর এক মুসলমানদের হত্যা ও নির্মূল করার কথা বলছে এবং তারা খুব সহজেই আইনের হাত থেকে বেরিয়ে আসছে। অশ্বিনী উপাধ্যায় ও বিজেপি মহিলা মোর্চার এক নেত্রীও হরিদ্বারের ‘ধর্ম সংসদে’ উপস্থিত ছিলেন। বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে মুখ খোলেনি। অবশ্য দুইজন সাবেক সেনা অধিনায়ক এতে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। হরিদ্বার ধর্ম সংসদের ভিডিওকে টুইট করে অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ লিখেছেন, ‘এটাকে কেন থামানো হচ্ছে না? আমাদের বাহিনী দু’টি মোর্চায় শত্র“দের মোকাবেলা করছে আর আমরা সাম্প্রদায়িকতামূলক খুনখারাবি, দেশের ভেতর ধ্বংসযজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে লজ্জা অর্জন করতে চাচ্ছি। এটা অনুধাবন করা কি এতটাই কঠিন যে, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি ঝুঁকিতে পড়লে জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও তার প্রভাব পড়বে?’ অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশের এই টুইটের প্রতি সহমত প্রকাশ করে জেনারেল বেদ প্রকাশ মালিক লিখেছেন, ‘এ ধরনের বক্তব্যে সামাজিক ঐক্য নষ্ট হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হবে। প্রশাসনের উচিত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া।’
