আমার এক শ্রদ্ধেয় বেশ কিছুদিন যাবৎ অনলাইন অফলাইনে কোরানে কারীমের ‘وسط’ (মধ্যপন্থি) শব্দটিকে মডারেট (moderate) অর্থে যত্রতত্র ব্যাবহার করছেন। শুধু তিনিই নন, ওয়েস্টার্ন লিবারেল চিন্তার ছত্রছায়ায় যারা নিজেদেরকে সেবাদাস হিসেবে হাজির রাখতে পছন্দ করেন, তাদের সবার চিন্তা এমন যে – ইসলামিক আইডিওলজির একটা নির্দিষ্ট ‘দালাহাহ’ (connotations) ধারণ করে- এমন সব শব্দকেও নিজের চাহিদা মাফিক ব্যাবহার করলে সেটা ইসলামাইজড হয়ে যায়।
শাব্দিক অর্থে ‘ওয়াসাত’ এবং ‘মডারেট’ দুটি শব্দ কাছাকাছি। তবে, একথা মনে রাখতে হবে, যে সকল শব্দকে শরিয়াহ তার মাখসুস ( বিশেষায়িত) অর্থে ব্যাবহার করেছে, এখন সেসব শব্দকে স্রেফ শাব্দিক অর্থের সাথে মিল আছে বলেই নিজ খেয়ালখুশি মত ব্যবহার করা শরিয়ার স্পষ্ট তাহরীফে (বিকৃতি)র শামিল।
ইসলামে ‘মধ্যপন্থা’ এবং ‘চরমপন্থা’ পশ্চিমা বুদ্ধিজীবিদের বেধে দেওয়া সজ্ঞায় নিরূপণ হয় না, এটা নিরূপিত হয় ইসলামিক নিজস্ব মাফাহিম কিংবা কন্সেপশ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক এর মাধ্যমে। অর্থাৎ, ধরা যাক, কেউ ভাস্কর্যের পক্ষে ইনিয়ে বিনিয়ে ছাফাই গেয়ে মূর্তি- ভাস্কর্যের পার্থক্য গুলো চিহ্নিত করার কোমল কসরত করল। এতে যদিও সেক্যুলার গোষ্ঠির ‘গোড়া ক্যাথলিক, এক্সট্রিমিস্ট, র্যাডিক্যাল মুসলিম’ এর তকমা থেকে সে বেচে যায়। বরং একজন সাচ্চা ‘মধ্যপন্থী’ মুসলিম বুদ্ধিজীবী আলিম হিসেবে মিডিয়া তাকে হাজির করে; কিন্তু তার এই মধ্যপন্থাকে ইসলাম ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলতে নির্দেশ করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমাদেরকে বলছেন, আমরা যেন তার দ্বীনকে বলিষ্ঠ ভাবে আকড়ে ধরি। এবং এটা বিশ্বাস করি যে, তার রাসুল সাঃ যা নিয়ে এসেছেন তা ধ্রুব সত্য, যার মাঝে সন্দেহের লেশ মাত্রও নেই। এবং দ্বীনের বিপরীতে যা কিছু আছে, তা বাতিল ও স্পষ্ট ভ্রষ্ঠতা বৈ কি। কিন্তু পশ্চিমের কাছে মডারেট মানহাজের একজন গুড মুসলিমের পরিচয় হলো, যে তার ধর্মের ব্যাপারে শিথিল ও মুদাহিন তথা মোসাহেবি চাটুকার।
সে ততটুকুই প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে, যতটুকু বললে তার উপর র্যাডিক্যাল তকমা লাগবে না। প্রয়োজনে কালচারাল,পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক্যাল ইন্টারেস্টের সামনে নিজের অকাট্য ধর্মেকেও পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে দ্বিধা হবে না।
তাহলে,ইসলামে ‘ওয়াসাত’ এর কনসেপ্ট কী?
ওয়াস বলতে শরিয়াহ বুঝায়, এমন সব ব্যাক্তিকে, যারা দ্বীন নিয়ে সর্বাবস্থায় গর্বিত। সালাফ তথা সাহাবাদের আদর্শে আদর্শবান। সত্য সাক্ষ দিতে আপোষ করে না।
অর্থাৎ, কুফুরকে কুফুর বলতে দ্বিধা সংশয়ে ভোগে না।
তবে এসব ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন ও অনধিকার চর্চাকেও প্রশ্রয় দেয় না। ই’লায়ে কালিমাতুল্লার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, করে। যালেম ছাড়া সবার সাথে উত্তম ভাষা ও আদর্শ পন্থায় দাওয়াত দেয়। একই সাথে এটা বিশ্বাস করে যে, যেমন প্রয়োজন কিতাবুল্লাহ, তদ্রূপ সাথে সাথে প্রয়োজন ‘আস সাইফুন নাসির’। মোটকথা মুদাহানা, তামায়্যউ, খুযু’, ইসতিকানা ও তাশাদ্দুদ ; তথা অ-জায়গায় তরলতা, চাটুকারিতা, বশ্যতা ও অতি রঞ্জন থেকে মুক্ত জামাতকেই শরিয়াহর পরিভাষায় ‘ওয়াসাত’ বলা হয়।
আর এইসব গুলো বৈশিষ্ট্য পূর্ণরূপে দেখতে চাইলে সাহাবা কেরামের জীবন ও কর্মকে সামনে রাখতে হবে। এজন্য ইবনুল কায়্যিম রাহঃ বলেন: কোন ব্যাক্তি সাহাবাদের চিন্তা ও কর্ম বিরোধী কোনো কাজ করলে আমরা বলবো, এটা সত্য হলে অবশ্যই সাহাবা কেরাম এটার দৃষ্টান্ত রেখে যেতেন। ( মর্ম)(1)
অতএব, কোনো শব্দ কিংবা চিন্তাকে শুধুমাত্র অর্থগত মিল থাকার কারণে পশ্চিমা মূল্যবোধের সাথে সাজুয্য পূর্ণ করে সেটাকে শরিয়াহ হিশেবে ব্যাখ্যা করা স্পষ্ট তাহরীফ। বিশেষত যে সকল ব্যাপার উসুলুদ দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত। এক্ষেত্রে অবশ্যই অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিৎ। নিজের ঈমানের মূল্য নিজের কাছে না থাকলে, এমন সব চিন্তার ভিখিরি হয়েই ফিরতে হবে আজীবন।
وما علينا إلا البلاغ
1-
فإن الحق لا يعدوهم و(لا) يخرج عنهم إلى من بعدهم قطعا، ونحن نقول لمن خالف أقوالهم: لو كان حقا ما سبقونا إليه
(ই’লামুল মুয়াক্কিয়িন- 4/166)

