Tuesday, April 21, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরমুসলিম বিশ্বে বাগদাদ পতনের প্রভাব

মুসলিম বিশ্বে বাগদাদ পতনের প্রভাব

হালাকু খানের হাতে বাগদাদ পতনের আগেই আব্বাসীয় খলিফাদের নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও সামরিক-আর্থিক সামর্থ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবু আব্বাসীয় খেলাফত মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক, আস্থা ও ভালোবাসার কেন্দ্র। খেলাফতের পতনের পর মুসলিম উম্মাহ বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়। বাগদাদের অধিবাসীদের ওপর নেমে আসে অভাবনীয় দুঃখ ও যন্ত্রণা। একদিকে তারা মুখোমুখি হয় গণহত্যার, অন্যদিকে চোখের সামনে ধ্বংস করা হয় ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্পদ ও শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতার বাতিঘরগুলো। হালাকু খানের মোঙ্গলীয় বাহিনী বাগদাদে টানা ৪০ দিন ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ সময় বাগদাদের রাস্তাগুলো পচা লাশের স্তূপে ভরে যায়, তা লাল বর্ণ ধারণ করে এবং ভয়ংকর নীরবতায় আচ্ছন্ন হয় ঐতিহাসিক এই শহর। মোঙ্গলীয় বাহিনীর ক্রুর হাসি অথবা অসহায় নারী-শিশুর কান্না ছাড়া সেখানে আর কোনো শব্দ ছিল না।

যে কারণে বাগদাদ ছাড়ে হালাকু খান

৪০ দিন পর হালাকু খানের আশঙ্কা হয় পচা লাশের কারণে তার বাহিনী মহামারিতে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে সে তার বাহিনীকে বাগদাদ ত্যাগের নির্দেশ দেয়। তারা উত্তর ইরাকের অন্য একটি শহরে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং বাগদাদের বাইরে ছোট ছোট কিছু টহল বাহিনী রেখে যায়। কেননা শত্রুর আক্রমণের ব্যাপারে সে নিশ্চিন্ত ছিল। হালাকু খানের বাহিনী বাগদাদ ত্যাগ করার পর বাগদাদে নিরাপত্তা ঘোষণা করা হয়। ৪০ দিন পর বাগদাদে কোনো মুসলিমকে আর হত্যা করা হয়নি। নিরাপত্তা ঘোষণা করা হয়েছিল মুসলিমরা লাশ দাফনে এগিয়ে আসে। এটা ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এ জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল। কেননা বাগদাদ পতনের পর কয়েক মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। হালাকু খানের আশঙ্কা ছিল দ্রুত লাশ দাফন করা না হলে আবহাওয়ায় পরিবর্তন চলে আসতে পারে এবং ইরাক, সিরিয়াসহ সমগ্র অঞ্চলে রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে মুসলিম ও তাতার সবাই আক্রান্ত হবে। মূলত দুঃসাধ্য কাজটি সে মুসলমানের ওপর চাপিয়ে দেয়।

বাগদাদে মহামারির হানা

ঐতিহাসিকদের মতে, হালাকু খানের আক্রমণে বাগদাদের বেশির ভাগ অধিবাসীর মৃত্যু হয়। সামান্য যে কয়েকজন বেঁচে ছিল তারা পরিখা, কবর, পরিত্যক্ত পানির কূপের মধ্যে আত্মগোপন করে জীবন রক্ষা করেছিল। যখন তারা নিরাপত্তা পেয়ে বের হয়েছিল তখন তাদের চেহারা ও শারীরিক অবয়ব পাল্টে গিয়েছিল, ফলে তারা পরস্পরকে চিনতে পারছিল না। তারা বের হয়েছিল পচা লাশের স্তূপ থেকে নিজের ছেলে, ভাই, বাবা ও মায়ের লাশ খুঁজে বের করতে। মুসলিমরা লাশ দাফন শুরু করল, কিন্তু তা শেষ হওয়ার আগেই মহামারি ছড়িয়ে পড়ল, হালাকু খান যেমনটি আশঙ্কা করেছিল। মহামারিতেও বহু মুসলিমের মৃত্যু হলো। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘যারা ছুড়ির আঘাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল তারা মহামারির আঘাত থেকে বাঁচতে পারল না।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১৩/২৩৬)

বিশ্বাসঘাতকের ক্ষমতা গ্রহণ

হালাকু খান বাগদাদ ত্যাগ করার আগে শিয়া মতাবলম্বী মুয়াইয়িদুদ্দিন আলকামিকে বাগদাদের প্রধান প্রশাসক নিয়োগ দেয়। যেন সে তাতারদের অধীনে বাগদাদের শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারে। মুয়াইয়িদুদ্দিন একজন পুতুল শাসক ছিলেন। প্রকৃত কর্তৃত্ব ছিল তাতারিদের হাতে। ধীরে ধীরে তাদের কর্তৃত্ব আরো বৃদ্ধি পায়, যা এক পর্যায়ে নতুন শাসক মুয়াইয়িদুদ্দিনের জন্য অবমাননাকর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মোঙ্গলীয় বাহিনীর সাধারণ সৈনিকরাও তাঁকে অপমান করত। তারা এটা করত যেন তার আত্মমর্যাদাবোধ ধ্বংস হয়ে যায় এবং পুরোপুরি তাদের আনুগত্য করে। একদিন তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করেছিলেন। তাতার বাহিনী তাঁকে পেছন থেকে তাড়াচ্ছিল এবং লাঠি দিয়ে তার ঘোড়াকে আঘাত করছিল যেন তা দ্রুত চলে। বাগদাদের শাসকের জন্য এটা ছিল চরম অবমাননাকর। তখন একজন মুসলিম নারী তাকে বলেছিল—আব্বাসীয়রা কি তোমার সঙ্গে এমন আচরণ করত? (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১৩/২৪৬)

বিশ্বাসঘাতকের করুণ পরিণতি

এই মুসলিম নারী তাকে এমনটি বলার কারণ হলো মুয়াইয়িদুদ্দিন ছিলেন আব্বাসীয়দের একজন মর্যাদাসম্পন্ন মন্ত্রী। অন্য অনেকের চেয়ে তিনি এগিয়ে ছিলেন। বাগদাদের সবাই তাকে মান্য করত, এমনকি খলিফাও তার কথাকে গুরুত্ব দিত। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস মোঙ্গলীয়দের একজন সাধারণ সৈনিক, যাকে কেউ চেনে না তাঁকে নিয়ে উপহাস করছে। যারা নিজের ধর্ম, দেশ ও নিজেকে বিক্রি করে দেয় তারা এভাবেই মূল্যহীন হয়ে যায়। যারা শত্রুদের হয়ে কাজ করে শত্রুরা তাকে কখনো সমমর্যাদা প্রদান করে না। তারা শুধু প্রয়োজনে ব্যবহার করে এবং প্রয়োজন শেষ হলে তাদের মূল্যও ফুরিয়ে যায়।

মুসলিম নারীর কথা আলকামির মনে রেখাপাত করে। তিনি নিশ্চিত ও ব্যথিত হয়ে ঘরে যান এবং ঘরে অবস্থান করতে থাকেন। হতাশা, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা তাকে পেয়ে বসে। কেননা মোঙ্গলীয়দের দ্বারা তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন। যদিও তিনি এখন বাগদাদের শাসক। কিন্তু তিনি মৃত্যু ও রোগাক্রান্ত শহরের কর্তৃত্বহীন শাসক। বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী অপমান ও উদ্ভূত পরিস্থিতির চাপ সহ্য করতে পারল না। নিজ ঘরেই সে মারা গেল ৬৫৬ হিজরিতে। তার মৃত্যুর পর মোঙ্গলীয়রা তার ছেলেকে বাগদাদের শাসক নিযুক্ত করে; কিন্তু একই বছর তাঁরও মৃত্যু ঘটে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১৩/২৪৬)

মুসলিম বিশ্বে বাগদাদ পতনের প্রভাব

বাগদাদের পতন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বাণী স্মরণ করিয় দেয়। তা হলো—‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের ভয় করছি না; বরং ভয় করছি যে তোমাদের ওপর দুনিয়া প্রশস্ত করে দেওয়া হবে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ওপর যেমন দুনিয়া প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছিল। আর তোমরা তা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করবে যেমন তারা তা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করেছিল। আর তা তোমাদের পরকাল থেকে বিমুখ করে ফেলবে, যেমন তাদের পরকালবিমুখ করেছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪২৫)

বাগদাদ পতনের মাধ্যমে মুসলিম জাতির সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছিল তা হলো তাদের মনোবল চিরদিনের জন্য ভেঙে যায়। কেননা মুসলিম জাতির কাছে বাগদাদ ছিল শক্তি, ক্ষমতা, ঐশ্বর্য, আভিজাত্য ও গৌরবের প্রতীক। ফলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক অন্ধকার যুগের সূচনা হয় বাগদাদ পতনের পর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 × 3 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য