বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাকে সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়—সেটা মুসলিম বিশ্বে হোক বা অমুসলিম বিশ্বে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষের জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য কী হবে? কেন সে জ্ঞানচর্চা করবে? মানুষকে জ্ঞানদানের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জ্ঞানের সামান্যতম অংশই দান করা হয়েছে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৮৫)। অথচ এই সামান্য জ্ঞান নিয়েই কিছু মানুষ খোদার আসনে সমাসীন হতে চায়! পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে মানুষকে জ্ঞানবৃদ্ধির দোয়া শেখানো হয়েছে—‘হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত : ১১৪)। শুধু জ্ঞান লাভের প্রার্থনা করতে বলা হয়নি; বরং তাকে উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজের সালাম ফেরানোর পর দোয়া করতেন—‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, উত্তম জীবিকা এবং আপনার দরবারে গ্রহণযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৯২৫)
উপকারী জ্ঞান লাভের জন্য আল্লাহর প্রার্থনা করতে বলার কারণ হলো নিছক জ্ঞান মানবসমাজের কল্যাণ সাধনে যথেষ্ট নয়। জ্ঞান ইবলিস শয়তানেরও ছিল, বর্তমানে যারা মানুষ ও মানবসভ্যতার শত্রু হিসেবে কাজ করছে, তারাও জ্ঞানশূন্য নয়। বরং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাদের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সমাজ ও সভ্যতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই জ্ঞানের কল্যাণ ও উপকার নিশ্চিত করতে প্রথম প্রয়োজন তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করা। মানুষ কেন জ্ঞানার্জন করবে? কার নামে করবে? পবিত্র কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াতে আল্লাহ এই প্রশ্নের সমাধান করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, “পাঠ কোরো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন—সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ থেকে। পাঠ কোরো, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” (সুরা আলাক, আয়াত : ১-৫)
হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘জ্ঞান দুই প্রকার : ক. মুখনিসৃত জ্ঞান, খ. অন্তরে উপলব্ধ জ্ঞান। দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞানই উপকারী। আর প্রথম প্রকার জ্ঞান আল্লাহর দরবারে মানুষের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৩৫৫০২)
আল্লামা জালাল উদ্দিন (রহ.) বলেন, ‘শরীরকে যদি জ্ঞানের বাহক বানাও তবে তা সাপ হয়ে তোমাকে দংশন করবে আর আত্মাকে যদি জ্ঞানের বাহন বানাও তবে বন্ধু হয়ে তোমার উপকার করবে।’ অর্থাৎ জ্ঞান যদি ভোগ-বিলাস, অর্থোপার্জন ও পার্থিব স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হয়, তবে তা নিজের জন্য এবং সমাজের জন্য বিষাক্ত সাপের মতো হবে। আর যদি জ্ঞানের সম্পর্ক ঈমানের সঙ্গে হয়, ঈমান ও আমানতদারিতার সঙ্গে তা ব্যবহার করা হয়, তবে তা বন্ধুর মতো উপকারী হবে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা কোরো এবং উপকারী নয়—এমন জ্ঞান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কোরো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৮৪৩)। আল্লাহ সবাইকে উপকারী জ্ঞান দান করুন। আমিন।
