২০১৩ সালের ৫ মে রাত। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ইসলামপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে যাওয়া সেই রাত। যেদিন কুরআনের হাফেজ, আলেম-ওলামা, মাদরাসার ছাত্র ও নিরীহ মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের শাপলা চত্বর।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে কটূক্তির প্রতিবাদ জানাতে সেদিন রাজধানীতে জড়ো হয়েছিল লাখো তাওহিদী জনতা। তারা এসেছিল ঈমানের দাবি নিয়ে, নবীপ্রেমের আবেগ নিয়ে, ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদ জানাতে। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সেই নিরস্ত্র জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে বর্বর, কাপুরুষোচিত ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালায়।
নামাজরত, জিকিররত, ক্লান্ত ও ঘুমন্ত আলেম-ওলামা, মাদরাসার ছাত্র এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে আক্রমণ চালায় হাসিনার বাহিনী। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামপ্রিয় মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে চালানো এই পরিকল্পিত গণহত্যা আজও এক রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে।
প্রেক্ষাপট : ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের রাষ্ট্রীয় মদদ ও হেফাজতের আত্মপ্রকাশ
২০০৯ সালে ভারত ও আমেরিকার সমর্থনে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনা। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ‘মুক্তমনা’র ছদ্মাবরণে তারা মহান আল্লাহ, পবিত্র কুরআন এবং সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে অবমাননাকর, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ লেখা ছড়াতে থাকে।
রাজীব হায়দার ওরফে ‘থাবা বাবা’, অভিজিৎ রায় ওরফে ‘আকাশ মালিক’সহ কয়েকজন ছিল সেই ইসলামবিদ্বেষী চক্রের অগ্রগামী।
সরকার একদিকে মুখে ধর্মীয় সম্প্রীতির বুলি আওড়ালেও বাস্তবে এই ইসলামবিদ্বেষী চক্রকে প্রশ্রয় দেয়। ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদে আলেম-ওলামারা কণ্ঠ তুললে তাদের দেওয়া হতে থাকে ‘জঙ্গি’, ‘সন্ত্রাসী’ এমনকি ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ তকমা।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ২০১০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক, দেশের আলেম সমাজের প্রবীণ মুরব্বি আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ধর্মীয় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
গণজাগরণ মঞ্চ : ইসলামবিদ্বেষের বিস্তার
২০১৩ সালের শুরুতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগে যাত্রা শুরু করে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। এর প্রকাশ্য দাবি ছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই আন্দোলনের ভেতরে একটি সুসংগঠিত ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তারা ইসলাম, কুরআন-সুন্নাহ, ইসলামি সংস্কৃতি ও আলেমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়াতে থাকে। মঞ্চের আশপাশে এমন কিছু ব্লগার ও লেখক জড়ো হয়, যারা প্রকাশ্যেই ইসলাম ও মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করে আসছিল।
তাদের লেখায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে কটূক্তি, আলেমদের প্রতি অবমাননা এবং ইসলামি আকীদার বিরুদ্ধে চরমপন্থী আক্রমণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিষয়টি দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এর মধ্যেই শাহবাগ মঞ্চ থেকে কিছু ব্যঙ্গাত্মক ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগানও প্রচারিত হতে থাকে, যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করে। অথচ সে সময় রাষ্ট্র, প্রশাসন ও মূলধারার গণমাধ্যম এসব কর্মকাণ্ডকে অন্ধভাবে প্রশ্রয় দেয়, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সমর্থনও করে।
এই পরিস্থিতিই সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ক্ষোভকে সংগঠিত আন্দোলনে রূপ দেয়।
১৩ দফা দাবি ও আন্দোলনের বিস্তার
১৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় “ভয়ঙ্কর ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারচক্র” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সারাদেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
১৯ ফেব্রুয়ারি আমার দেশসহ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে সরকার ও জাতির উদ্দেশে খোলা চিঠি দেন হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী। সেখানে তিনি ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করেন।
১১ মার্চ হাটহাজারীতে জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলনের আয়োজন করে হেফাজতে ইসলাম। সম্মেলন থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল ১২ মার্চ জেলায় জেলায় মানববন্ধন, ১৫ মার্চ এলাকাভিত্তিক বিক্ষোভ মিছিল, ২২ মার্চ নফল রোযা ও সীরাত মাহফিল, ২৫ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান, ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশ।
ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ ও ঢাকা অবরোধের ঘোষণা
সরকারের সর্বোচ্চ বাধা সত্ত্বেও ৬ এপ্রিল শাপলা চত্বর লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় সেদিন। সেখান থেকেই হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দফা দাবির পুনঃউচ্চারণ করে।
সমাবেশ থেকে সারা দেশে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপরও দাবি না মানলে ৫ মে ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দেয় হেফাজতে ইসলাম।
এই ঘোষণার পর থেকেই সরকার, প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি হেফাজতের আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেয়। কিন্তু ইসলামপ্রিয় মানুষের ক্ষোভ তখন আর আটকে রাখা সম্ভব হয়নি।
৫ মে : বাধা পেরিয়ে ঢাকায় লাখো তাওহিদী জনতা
২০১৩ সালের ৫ মে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার তাওহিদী জনতা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। রাজধানীর প্রবেশপথে পথে পথে বাধা দেয় প্রশাসন। গুলশান ও ধানমণ্ডির প্রধান সড়কগুলো অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বাসস্ট্যান্ড ও ট্রেন চলাচল।
তবুও সব বাধা পেরিয়ে কেউ হেঁটে, কেউ রিকশায়, কেউ কাভার্ডভ্যানে, আবার কেউ বিকল্প পথে রাজধানীতে প্রবেশ করেন। সারা দিন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী।
আহত, ক্লান্ত ও অবসন্ন হেফাজত নেতাকর্মীরা শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন।
শাপলা মঞ্চে আল্লামা বাবুনগরীর অবিচল অবস্থান
হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে লালবাগ থেকে শাপলা চত্বরে আসতে বাধা দেওয়া হয়। ফলে তিনি শাপলা চত্বরে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু সেই কঠিন মুহূর্তে শাপলা চত্বরের অস্থায়ী মঞ্চে তাওহিদী জনতার পাশে অবিচলভাবে অবস্থান নেন হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী।
দিনভর হামলা, গুলি, আতঙ্ক ও রক্তাক্ত পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি মঞ্চ ছেড়ে সরে যাননি। আওয়ামী সন্ত্রাসী ও সরকারি বাহিনীর হামলার মুখেও তিনি তাওহিদী জনতার পাশে অবস্থান করেন। মঞ্চ থেকে তিনি নেতাকর্মীদের সাহস জোগান, ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান এবং নবীপ্রেমিক জনতার দাবির পক্ষে নেতৃত্ব দিতে থাকেন।
শাপলা চত্বরের চারপাশে যখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তখনও আল্লামা বাবুনগরী মঞ্চে অবস্থান করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাওহিদী জনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে। তারপরও তিনি নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে মঞ্চ ছাড়েননি।
রাত গভীর হওয়ার পর যখন পুরো এলাকার আলো নিভিয়ে দেওয়া হয় এবং শাপলা চত্বর ঘিরে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে হাসিনার বাহিনী, তখনও আল্লামা বাবুনগরী মঞ্চের কাছেই অবস্থান করছিলেন। সেই দানবীয় আক্রমণের সময় তিনিও হামলার মুখে পড়েন এবং আহত হন।
শাপলা চত্বরের সেই রাত আল্লামা বাবুনগরীর জীবনেরও এক রক্তাক্ত অধ্যায়। মঞ্চে অবিচল থাকা, তাওহিদী জনতার পাশে শেষ পর্যন্ত অবস্থান করা এবং আক্রমণের মুখেও পিছু না হটা তাকে শাপলা গণহত্যার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ও চরিত্রে পরিণত করে।
রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিত গণহত্যা
গভীর রাতে পুরো এলাকার আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ঘুমন্ত, ক্লান্ত ও নিরস্ত্র তাওহিদী জনতার ওপর গণহত্যা চালায় হাসিনার বাহিনী।
এই গণহত্যায় অংশ নেয় পুলিশের পাঁচ হাজার সদস্য, র্যাবের এক হাজার দুইশ’ কমান্ডো এবং বিজিবির ১৮ প্লাটুন সদস্য। আরও ১০ প্লাটুন বিজিবি সদস্যকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে পিলখানায় প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
হামলার মূল নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান, র্যাব-১০-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইমরান, র্যাব-৩-এর অধিনায়ক মেজর সাব্বির, তৎকালীন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান।
এছাড়াও গণহত্যা পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ডিসি আনোয়ার হোসেন এবং ডিবির বিশেষ টিম।
কন্ট্রোল রুম থেকে গণহত্যা পর্যবেক্ষণ
গণহত্যার পুরো কার্যক্রম কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ। তিনি নিয়মিত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
তৎকালীন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ গণহত্যা চলাকালে ওয়্যারলেসে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এছাড়া র্যাব সদর দফতর থেকেও পুরো গণহত্যা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়েছিল।
গণহত্যার লক্ষ্য ও আক্রমণের ধরন
গণহত্যার মূল লক্ষ্য ছিল শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়া হেফাজতের কর্মীদের নির্মূল করা। রাত ৩টার দিকে শুরু হয় এই দানবীয় আক্রমণ। প্রথমেই নিক্ষেপ করা হয় টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গ্যাস গ্রেনেড।
ঘুমন্ত, ক্লান্ত ও অবসন্ন নেতাকর্মীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিক থেকে নেমে আসে নির্যাতনের খড়্গ। হাসিনার বাহিনীর সদস্যরা সাঁজোয়া যান, দাঙ্গা দমনের গাড়ি ও এপিসি নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে শাপলা চত্বর।
হেফাজতের কর্মীরা ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। কিছু সময়ের মধ্যেই মঞ্চ লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয় কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও গুলি। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয় মতিঝিল এলাকা।
নিরীহ হেফাজত নেতাকর্মীরা আশ্রয় নেন সোনালী ব্যাংক ভবন, আশপাশের অলিগলি ও বিভিন্ন অফিস ভবনে। কিন্তু সেখানেও হামলা চালিয়ে তাদের টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয়। পুলিশের বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে হামলায় অংশ নেয়, যেন প্রতিরোধের সামান্য সুযোগও কেউ না পায়।
হাসিনার বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জানত, দিনের বেলায় হাজার হাজার কর্মী থাকায় প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারত। এছাড়া রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা কর্মীদের ওপর হামলা চালালে সহজেই তাদের ছত্রভঙ্গ করা যাবে। এই উদ্দেশ্য থেকেই রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিত গণহত্যা সংঘটিত হয়।
গণহত্যার পর আল্লামা বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার
শাপলা চত্বরে পরিকল্পিত গণহত্যার পরও হাসিনার বাহিনীর জুলুম থামেনি। গণহত্যার পরদিন ৬ মে রাজধানীর লালবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীকে। আল্লামা শাহ আহমদ শফী ঢাকা ছাড়ার কিছু সময় পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
গ্রেপ্তারের পর তাকে হত্যা, হামলা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। প্রথমে তাকে ৯ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে মতিঝিল থানায় দায়ের করা তিন মামলায় আবারও ২২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
রিমান্ডে নির্যাতন ও অসুস্থতা
রিমান্ডে আল্লামা বাবুনগরীর ওপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তাকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদের নামে চাপ দেওয়া হয়। আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সম্পর্ক, অর্থায়ন ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাকে নানা প্রশ্ন করা হয়। তাকে ভয় দেখানো হয়, অপমান করা হয় এবং মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
আল্লামা বাবুনগরী পরবর্তীতে জানান, রিমান্ডে তাকে ইনজেকশন ও নানা ওষুধ দেওয়া হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। কারাগার থেকে অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার কিডনির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং তাকে একাধিকবার ডায়ালাইসিস করানো হয় বলে সে সময় চিকিৎসকদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এভাবেই শাপলা চত্বরের মঞ্চে অবিচল থাকা আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীকে গণহত্যার পর গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দমন করার চেষ্টা চালায় হাসিনার সরকার।
কিন্তু শাপলা চত্বরের সেই রাত, মঞ্চে তার অটল অবস্থান, হামলার মুখেও তাওহিদী জনতাকে ছেড়ে না যাওয়া এবং রিমান্ডে নির্যাতনের ইতিহাস বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের স্মৃতিতে জুলুমের এক নির্মম সাক্ষ্য হয়ে রয়ে গেছে।
হাসিনার পালিয়ে যাওয়া ও বিচারপ্রক্রিয়ার শুরু
শাপলা চত্বরে রাতের অন্ধকারে যে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয়েছিল, সেই জুলুমের বিচার একসময় অসম্ভব মনে করা হতো। কারণ রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রচারযন্ত্র, সবকিছুই ছিল শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ইতিহাসের চাকা এক জায়গায় থেমে থাকে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। যে ক্ষমতার দম্ভে তিনি বছরের পর বছর বিরোধী মত, আলেম-ওলামা, ইসলামপ্রিয় জনতা ও সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম চালিয়েছিলেন, সেই ক্ষমতার মসনদই একদিন তার হাতছাড়া হয়ে যায়।
হাসিনার পতনের পর একে একে সামনে আসতে শুরু করে তার শাসনামলের রক্তাক্ত অধ্যায়গুলো। শাপলা চত্বর গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়াও নতুন করে গতি পায়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে ঢাকাতেই অন্তত ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।
শাপলা গণহত্যা মামলায় আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়া ইসলামপ্রিয় মানুষের দীর্ঘদিনের বিচার দাবির পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। যে গণহত্যাকে বছরের পর বছর ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল, যে রক্তাক্ত রাতের স্মৃতি মুছে ফেলতে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, আজ সেই ঘটনার তদন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুয়ারে পৌঁছেছে।
ইতিহাসের অমোচনীয় রক্তাক্ত অধ্যায়
শাপলা চত্বরের পরিকল্পিত গণহত্যা শুধু একটি রাতের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় দমননীতির এক ভয়াবহ দলিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে কটূক্তির প্রতিবাদে জড়ো হওয়া নিরস্ত্র তাওহিদী জনতার ওপর রাতের অন্ধকারে যে গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা যাবে না।
সেই রাত আজও প্রশ্ন তোলে, কেন ঘুমন্ত মানুষের ওপর আলো নিভিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। কেন নিরস্ত্র আলেম-ওলামা, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনী নামানো হয়েছিল। কেন আহত ও ক্লান্ত মানুষদের ওপর পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছিল।
শাপলা চত্বরের মাটি আজও সেই রাতের সাক্ষী। আল্লামা বাবুনগরীর অবিচল অবস্থান, তাওহিদী জনতার আত্মত্যাগ, হাসিনার বাহিনীর বর্বরতা, হাসিনার পালিয়ে যাওয়া এবং শাপলা গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়া বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের ইতিহাসে এক অমোচনীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
