‘সবজি আর দুইটা পরোটা খাইলাম। ৪৫ ট্যাকা নিল। একটা ডিম আর আরেকটা পরোটা নিমু সেই উপায় নাই। সকালের নাশতায় অনেক খরচ।
পকেটে এত ট্যাকা নাই।’ সকালের নাশতা সেরে এভাবে খেদ প্রকাশ করেন রিকশাচালক রাসেল মিয়া (৩২)। রাজধানীর পুরানা পল্টন মোড় এলাকায় ‘মনার খাবারদাবার’ নামের সাধারণ একটি খাবারের হোটেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
কায়িক শ্রমে জীবিকা চলে রাসেলের।
তাই সকালের নাশতা একটু ভালোভাবে করতে চান। কিন্তু আর্থিক কারণে তা হচ্ছে না। রাসেল বলেন, কম খেয়েও বেশি দাম দিতে হচ্ছে। সকালের নাশতায় সাধারণত পরোটা, ভাজি, ডাল আর ডিম থাকে।
রাজধানীর কয়েকটি খাবারের হোটেল ঘুরে দেখা গেল, একটি পরোটার ন্যূনতম দাম ১০ টাকা। তবে হোটেলের মান ও পরোটার আকারভেদে কোথাও কোথাও পরোটা ১৫ থেকে ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ডাল ও সবজি-ভাজি বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৪০ টাকা। বেশির ভাগ হোটেলে সকালের নাশতায় ডিমের দাম নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। ফলে দুটি পরোটা, সবজি-ভাজি আর ডিম দিয়ে সকালের নাশতার খরচ দাঁড়াচ্ছে ৬৫ টাকা।
বিজয়নগরের নিউ ভোজ রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের নাশতা শেষ করা একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তেমন কিছুই খাইনি। পরোটা, ডিম, সবজি আর কফি খেয়ে ৮৫ টাকা বিল দিলাম। ভালো হোটেলে খেতে গেলে আরো বেশি খরচ হতো।’
তিনি বলেন, ‘এক বছরের মধ্যে পরোটার দাম দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছরের শেষেও একটি পরোটার দাম ছিল পাঁচ টাকা। আটা-তেলের দাম বেড়েছে দেখে ১০ টাকা করেছে। আবার সাইজেও ছোট করে ফেলেছে।’
সকালের নাশতার খরচ বাড়ার বিষয়ে নিউ ভোজ রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক সাগর খান বলেন, ‘কন তো ভাই, কোন জিনিসের দাম বাড়ে নাই? ১৫ থেকে ১৬ টাকার একটা ডিম, ২৪০ টাকা কেজি কাঁচা মরিচ দিয়া ভাজলে কত টাকা বেচা উচিত? হোটেল চালায়া দিন দিন লস বাড়তাছে।’
বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় ডিমের মূল্যবৃদ্ধির হার ১.০৩ শতাংশ। বাজারে এক হালি ডিম এখন ৬০ টাকা। টিসিবির তালিকার ১৬টি মসলা পণ্যের মধ্যে গত বছরের তুলনায় কোনোটির দাম সর্বোচ্চ ১৫০ শতাংশ, আবার কোনোটির দাম সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। ডিম ছাড়াও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম গত সপ্তাহের ব্যবধানে ১১.১১ শতাংশ, মসুর ডাল ১০.২৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে ভাজির উপকরণ বেগুন, কুমড়া, লাউ ও পেঁপের মতো সবজির দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। সব কিছুর প্রভাব সরাসরি পড়েছে রেস্তোরাঁর খাবারের দামে।
নাশতা বিক্রি কমেছে
রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, সকালের নাশতা বিক্রির খরচ আগের চেয়ে কমেছে। ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ডের কাছের এশিয়া গার্ডেন রেস্তোরাঁ, পারাবত রেস্টুরেন্ট, দ্য গাউছিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা যায়, রেস্তোরাঁগুলোর বেশির ভাগ চেয়ার-টেবিল ফাঁকা।
গাউছিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক সাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকালের নাশতায় এখন আর কেউ মুরগি খায় না। ডিম, সবজি আর ভাজি খায়। সকালের নাশতা বেচা এখন আগের চেয়ে অনেক কইমা গেছে।’
রাজধানীর রেস্তোরাঁগুলোতে বিক্রির হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এখন প্রয়োজনের বাইরে খরচ করে না। রেস্তোরাঁয় সকালের নাশতায় সবজি-ভাজি বা ডাল দিয়ে পরোটা খেয়ে চলে যায়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকবে।’
জাতীয় শিল্পনীতি-২০২২ অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ খাতকে ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাই শিল্প খাতের বিভিন্ন সুবিধা পেলে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে মত দেন ইমরান হাসান। তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা শিল্প খাতে, তাই গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল শিল্প খাতের রেট অনুযায়ী দিতে চাই। টিসিবি থেকে সুলভ মূল্যে খাদ্যপণ্য কেনার জন্য আমরা দাবি জানিয়েছি। এসব হয়তো দেশের অর্থনীতিতে রেস্তোরাঁশিল্পের ভূমিকা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।’
