মুম্বাইভিত্তিক নাগরিক সমাজ সংগঠন ‘Centre for Study of Society and Secularism (CSSS)’ এবং ‘India Hate Lab’ যৌথভাবে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
২৮টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
CSSS–এর গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সংঘটিত ২৮টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ৪ জন নিহত এবং ৩৬০ জন আহত হয়েছেন।
এই ২৮টি দাঙ্গার মধ্যে সর্বাধিক ৭টি ঘটেছে মহারাষ্ট্রে। এর পরে পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাটে ৪টি করে, মধ্যপ্রদেশে ৩টি, এবং উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, আসাম ও উত্তরাখণ্ডে ২টি করে দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে। বিহার ও ওডিশায় একটি করে দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
মোট দাঙ্গার প্রায় ৪০ শতাংশ মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে, ৩৭ শতাংশ পূর্ব ভারতে এবং ২৫ শতাংশ উত্তর ভারতে সংঘটিত হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা রিপোর্ট হয়নি।
২৮টি দাঙ্গার মধ্যে ৯টি দাঙ্গা ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা উৎসবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
- পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে রাম নবমী শোভাযাত্রা,
- মধ্যপ্রদেশে হনুমান জয়ন্তী শোভাযাত্রা,
- আসামে ঈদ উদযাপন,
- গুজরাটে গরবা অনুষ্ঠান।
অন্য কয়েকটি দাঙ্গা শুরু হয় ওয়াকফ সংশোধনী আইন–এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে। এসব ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এক হিন্দু বাবা–ছেলে জুটির মৃত্যুর ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত।
১৪ জন মুসলমানের ওপর গণপিটুনি
২০২৫ সালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণপিটুনির ঘটনা বৃদ্ধি পায়। এ বছর ১৪টি ঘটনায় ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে সাধারণত ছিল গরু রক্ষা (কাউ ভিজিল্যান্টিজম), ‘অবৈধ অভিবাসী’ সন্দেহ, ‘লাভ জিহাদ’ অভিযোগ, এবং কিছু ক্ষেত্রে জোর করে ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করা।
ওডিশা
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাম্বলপুর জেলায় জুয়েল শেখ নামে এক বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম অভিবাসী শ্রমিককে ‘অবৈধ অভিবাসী’ অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই মাসে বালাসোর রেলস্টেশনে হিন্দু জনতার হামলায় আরও কয়েকজন অভিবাসী শ্রমিক আহত হন।
বিহার
নওয়াদা জেলায় গণপিটুনির তিনটি ঘটনা রিপোর্ট হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ৫০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আথার হুসেন নিহত হন। মধুবনীতে এক মুসলিম শ্রমিকের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
ঝাড়খণ্ড
গোদ্দা জেলায় পাপ্পু আনসারি (৪৫) নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে গবাদি পশু চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৫ সালের শুরুতে ঝাড়খণ্ডে আরও একটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটে।
উত্তরপ্রদেশ
এ রাজ্যে একাধিক সহিংসতা ও ভিজিল্যান্টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে এক মুসলিম ব্যক্তি গণপিটুনিতে নিহত হন।
মহারাষ্ট্র
২০২৫ সালের আগস্টে এক তরুণ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নাগপুরে আরেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে।
হরিয়ানা
টুপি (স্কালক্যাপ) সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক মুসলিম ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।
মধ্যপ্রদেশ
এক মুসলিম ব্যবসায়ীকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ হামলাকারীদের রক্ষা করেছে।
কেরালা
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পালাক্কাড জেলায় এক অভিবাসী শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ত্রিপুরা
২২ বছর বয়সী ছাত্র অঞ্জেল চাকমাকে দেরাদুনে একদল লোক জাতিগত গালিগালাজের পর ছুরিকাঘাতে হত্যা করে।
জম্মু ও কাশ্মীর
পাহালগাম হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে একাধিক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণের ভয়াবহ বৃদ্ধি
India Hate Lab–এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মুসলমানদের লক্ষ্য করে মোট ১,৩১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে জনসভা, ধর্মীয় সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৫ সালের মোট ঘৃণাভাষণের ৯৮ শতাংশই মুসলমানদের বিরুদ্ধে ছিল।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘৃণাভাষণ এখন আর শুধু নির্বাচনের সময় সীমাবদ্ধ নয়; বরং ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাস্তাঘাটের জমায়েত ও স্থানীয় আন্দোলনেও এটি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
এক মানবাধিকারকর্মী বলেন,
“এই মাত্রায় মুসলমানদের টার্গেট করা একটি ধারাবাহিক অভিযান, যা ভারতের স্বাভাবিক পরিবেশের অংশ হয়ে গেছে—এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
এই তথ্যগুলো দেখায়, কীভাবে ঘৃণাভাষণ প্রকাশ্য ও নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে এবং প্রায়শই কোনো প্রতিকার ছাড়াই থেকে যাচ্ছে। এর ফলে মুসলিম জনগোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তাহীন ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিয়ে অনিশ্চিত বোধ করছে, যদিও ভারতীয় সংবিধান তাদের সমতা ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।
বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ
CSSS–এর গবেষণায় বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোর উদাসীনতার দিকে আঙুল তোলা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যেখানে হিন্দু ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকারগুলো উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে মুসলিম ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে অনুরূপ বিচারিক অগ্রগতি না থাকা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
বিজেপি-শাসিত রাজ্য সরকারগুলো হিন্দু দাঙ্গাকারীদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করেছে এবং মুসলমানদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়,
“এই প্রবণতাগুলো সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায় কাঠামোগত ব্যর্থতা তুলে ধরে এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনকে সামনে আনে।”
দাঙ্গার পর রাজ্য কর্তৃপক্ষ ও একাংশের মিডিয়া এমন বয়ান ছড়িয়েছে, যাতে সহিংসতার একমাত্র দায় মুসলমানদের ওপর চাপানো হয়েছে।
সরকারি বক্তব্যে মুসলিম ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা ‘কিংপিন’ তৈরি করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বেশি সংখ্যক গ্রেপ্তার ও দমনমূলক পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্যান্য দিক
CSSS বলছে, ২০২৫ সালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন কেবল দাঙ্গার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে পরিচয়ভিত্তিক সংঘাত, ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষ, ঘৃণাভাষণ এবং ভিজিল্যান্টি গোষ্ঠীর দায়মুক্তিতে।
জনপরিসরে হিন্দু উৎসব, প্রতীক ও আচার–অনুষ্ঠানের অত্যধিক প্রদর্শন ও আধিপত্যের প্রকাশ বেড়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে আরও দৃঢ় করছে।
গবেষণাটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, তাদের সংস্কৃতির জোরপূর্বক অদৃশ্যকরণ ও প্রান্তিকীকরণ–এর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠীগুলোর দায়মুক্তি ২০২৫ সালের ভারতে একটি ‘নতুন স্বাভাবিক’ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই গবেষণাটি মুম্বাই সংস্করণের The Indian Express, The Hindu, The Times of India, Sahafat এবং Inquilab পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে।
© Muslim Mirror থেকে অনুবাদকৃত
