ইসলামী ফিকাহ মানবজীবনের তিনটি ক্ষেত্র শামিল করে। তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক, ব্যক্তির নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এবং সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কেননা ইসলামী ফিকাহ দুনিয়া ও আখিরাতের, দ্বিন ও রাষ্ট্রের, গোটা মানব জাতির এবং কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী। অতএব, এর সব বিধান আকিদা, ইবাদত, আখলাক ও লেনদেন ইত্যাদি সব কিছু পরিবেষ্টন করে রাখে। যাতে মানুষ তার অন্তরকে জাগ্রত করতে পারে, নিজের কর্তব্যের অনুভূতিকে সজাগ করতে পারে এবং প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে আল্লাহর তত্ত্বাবধান অনুধাবন করতে পারে। সন্তুষ্ট ও প্রশান্তচিত্তে অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে পারে। ঈমান, সৌভাগ্য, স্থিতিশীলতা, ব্যক্তিগত ও সাধারণ জীবন সুগঠিত করতে পারে এবং গোটা পৃথিবীকে সুখী ও সমৃদ্ধ করতে পারে।
এসব লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ইসলামের ব্যবহারিক বিধি-বিধান (ফিকাহ) অর্থাৎ মানুষের কথা, কাজ, চুক্তি ও লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিধি-বিধানকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
প্রথমত, ইবাদত সম্পর্কিত বিধি-বিধান। যেমন—পবিত্রতা, সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত, মানত ইত্যাদি, যা আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সুসংগঠিত করে।
দ্বিতীয়ত, লেনদেন সম্পর্কিত বিধি-বিধান। যেমন—বেচাকেনা, লেনদেন, শাস্তি, অপরাধ, জমানত ইত্যাদি, যা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সুদৃঢ় করে, চাই তারা ব্যক্তি হোক বা সমষ্টি। এ ধরনের বিধি-বিধান নিম্নোক্ত কয়েক প্রকারে বিভক্ত—
ক. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন : সেগুলো হচ্ছে পারিবারিক আইন। মানুষের পারিবারিক জীবনের শুরু থেকে শেষ বিদায় পর্যন্ত যা কিছু দরকার যেমন—বিয়ে-শাদি, তালাক, বংশ, ভরণ-পোষণ, মিরাস ইত্যাদি। এই আইনের উদ্দেশ্য হলো দাম্পত্য জীবন ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক গঠন।
খ. নাগরিক আইন : এই আইন মানুষের একজনের সঙ্গে অন্যের লেনদেন ও আদান-প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন—বেচাকেনা, ধার, বন্ধক, জামিন, অংশীদারিত্ব, ঋণ প্রদান ও গ্রহণ, অঙ্গীকার পূরণ ইত্যাদি। এই আইনের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও অধিকার সংরক্ষণ।
গ. ফৌজদারি আইন : মানুষের অপরাধ এবং এর সাজা সম্পর্কিত আইন। এই আইনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও অধিকার সংরক্ষণ করা। এ ছাড়া অপরাধীকে অপরাধের শাস্তির ভীতি প্রদর্শন এবং এর দ্বারা সমস্ত মানুষকে অপরাধের শাস্তির পরিণতির ভীতি দেখানো, সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এই আইনের অন্যতম লক্ষ্য।
ঘ. নাগরিকের কাজকর্ম ও অপরাধ উপস্থাপন সম্পর্কিত আইন : এটি বিচার ও আইন, বাদী বা বিবাদীর দাবি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, শপথ ও আলামত ইত্যাদির মাধ্যমে তা প্রমাণ সম্পর্কিত আইন-কানুন। এই আইনের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
ঙ. সাংবিধানিক আইন : রাষ্ট্র পরিচালনা ও এর নিয়মনীতি সম্পর্কিত আইন। এ আইনের লক্ষ্য হচ্ছে শাসকের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, জনগণের অধিকার ও কর্তব্য এবং শাসকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করা।
চ. আন্তর্জাতিক আইন : স্থিতিশীল ও যুদ্ধাবস্থায় ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের কী ধরনের সম্পর্ক হবে, মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিমের সঙ্গে সম্পর্ক, জিহাদ, সন্ধিচুক্তি ইত্যাদি সম্পর্ক সুবিন্যাস করা। এ আইনের লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সম্মানবোধ নির্ধারণ করা।
ছ. অর্থনীতি ও সম্পদ সম্পর্কিত আইন : এই আইনে মানুষের অর্থনৈতিক লেনদেন ও অধিকার, রাষ্ট্রের অধিকার ও এর সম্পদ নিয়ে করণীয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও এর বণ্টননীতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই আইনের উদ্দেশ্য হলো ধনী, গরিব, রাষ্ট্র ও এর জনগণের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুসংগঠিত করা।
এই আইন রাষ্ট্রের সাধারণ ও বিশেষ সব ধরনের সম্পদ শামিল করে। যেমন—গনিমত, পণ্যকর, (যেমন কাস্টমস), খাজনা (ভূমির ট্যাক্স), কঠিন ও তরল খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ। এ ছাড়া এতে আছে সমাজের সমষ্টিগত সম্পদ। যেমন—জাকাত, সদকা, মানত, ঋণ। আরো শামিল করে পারিবারিক সম্পদ। যেমন—পরিবারের ভরণ-পোষণ, উত্তরাধিকারী সম্পদ, অসিয়ত। এ ছাড়া একত্র করে ব্যক্তিগত সম্পদ। যেমন—ব্যবসায়ের লাভ, ভাড়া, অংশীদারি কারবার, সব ধরনের প্রকল্প ও উৎপাদনের ব্যয়। পাশাপাশি অর্থনৈতিক দণ্ড (জরিমানার অর্থ), যেমন—কাফফারা, দিয়ত ও ফিদিয়া ইত্যাদি।
জ. শিষ্টাচার ও রীতিনীতি : এই আইন মানুষের খামখেয়ালিপনা সীমিত করে, ভালো গুণাবলি বিকশিত করে, মানুষের মধ্যে পরস্পর সহযোগিতা ও দয়ার্দ্রতা ইত্যাদিকে উৎসাহিত করে।
ফিকাহ শাস্ত্র এত প্রশস্ত ও বিস্তৃত হওয়ার কারণ হলো, রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহের প্রতিটি অধ্যায় সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আর ইসলামী ফিকাহ মূলত হাদিসের নির্যাস।
ড. সালিহ ইবন গানিম আস-সাদলান
ভাষান্তর : সাখাওয়াত উল্লাহ
