জামানা পরিবর্তনশীল, বিপদাপদ পর্যায়ক্রমে আবর্তনশীল। এর সাথে শান্তি ও যুদ্ধ, তিক্ততা ও মিষ্টতা, প্রাচুর্য ও দুর্ভিক্ষ জড়িত। একজন মুমিনের কাছে যত বড় বিপদ ও সীমাহীন পরীক্ষা আসুক না কেন, সে জানে যে দয়াময় আল্লাহর ফয়সালা ও নির্ধারিত তকদিরের কোনো পরিবর্তনকারী নেই। তিনি যা ফয়সালা করে রেখেছেন তা সংঘটিত হবেই, যা নির্ধারণ করেছেন তা আসবেই এবং যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অপেক্ষমাণ। আল্লাহতায়ালা যা চান তাই হয়, তিনি যে হুকুম করেন তাই বাস্তবায়িত হয়। তিনি যা প্রবর্তন করেন তার কোনো প্রতিরোধকারী নেই, আর যা প্রতিরোধ করেন তার কোনো প্রবর্তনকারী নেই। তিনি যা দেন তা রোধ করার কেউ নেই আর যা রোধ করেন তা দেবার কেউ নেই। আমাদের রব যা চান তাই করেন। সুতরাং অস্থিরতা ও উদ্বেগের কোনো কারণ নেই, বরং ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতে হবে এবং এই সু-ধারণা রাখতে হবে যে, মুসলিম ও মুমিনদের অবশ্যই বিজয় আসবে, আর অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারীরা অবশ্যই লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ নিজ কর্ম সম্পাদনে প্রবল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত : ২১)
আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম গাজাবাসীদের ওপর ইতিহাসে নজিরবিহীন যে বিপদ ও দুর্যোগ নেমে এসেছে তার ব্যথা ও বেদনায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। শত্রুর ষড়যন্ত্র ও অত্যাচার চরম সীমায় পৌঁছেছে। তবে জুলুম-অত্যাচার দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তা অচিরেই নিশ্চিহ্ন ও বিলীন হবে। যুগ পরিবর্তনশীল, অচিরেই অত্যাচারীরা দাম্ভিকতার পরিণতি জানতে পারবে। হজরত আবু মুসা আশয়ারি রা: থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা জালেমদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন আর ছাড়েন না। এরপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন- এবং এরূপই তোমার রবের শাস্তি। তিনি শাস্তি দান করেন জনপদসমূকে যখন তারা জুলুম করে থাকে। তার শাস্তি মর্মন্তুদ, কঠিন।’ (সহিহ বোখারি ও মুসলিম)
অত্যাচারী আগ্রাসীরা কতটা প্রতিরক্ষা শক্তি, নিখুঁত আক্রমণ এবং ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিল! কিন্তু নিপীড়িত-মজলুমদের আল্লাহ যে ধৈর্য ও শুভ পরিণাম দান করেন তারা সে সম্পর্কে গাফেল ছিল। জালেম যতই শক্তিশালী এবং মজলুম যতই অসহায় হোক, নিঃসন্দেহে জালেমরা পরাজিত, অপদস্থ ও শৃঙ্খলিত হবে। জালেমের পরাজয় অত্যাসন্ন, আর সবচেয়ে কার্যকর তীর হলো- নির্যাতিতদের দোয়া; চিরঞ্জীব সর্বসত্তার ধারক তা ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন করেন।
হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া রদ হয় না ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার যতক্ষণ না ইফতার করে এবং মজলুমের দোয়া। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোয়া মেঘমালার ওপরে তুলে নেবেন এবং তার জন্য আসমানের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং আল্লাহ বলবেন, আমার মর্যাদার শপথ! কিছুকাল পরে হলেও আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব, একটু বিলম্বেই হোক না কেন। (সুনানে তিরমিজি)
দয়াময় আল্লাহ কতই না মহান, তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্তের আর্তনাদ শ্রবণ ও বিপদগ্রস্তের ডাক শুনেন! অতঃপর তিনি মজলুমের সম্মান বৃদ্ধি ও জালেমকে ধ্বংস করেন; ফলে জালেমরা অপদস্থ হয়। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারী জালেম ঘৃণা, শত্রুতা এবং হিংসা-বিদ্বেষের অনুভূতির মধ্যে বেষ্টিত থাকে; ফলে সে শান্তিতে থাকে না এবং নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারে না। বরং তার জীবন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং বিপদাপদ ও নিদ্রাহীনতায় পূর্ণ থাকে- যতই না সে মিথ্যাকে ঢাল হিসেবে গ্রহণ করুক, ছলনার আশ্রয় নিক এবং নিজেকে অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও আক্রান্ত হিসেবে জাহির করুক। কেননা জুলুম হলো- শত্রুতা আনয়নকারী এবং কষ্ট-ক্লেশের কারণ। আর অন্যায় নেয়ামত ছিনিয়ে নেয় এবং প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে।
আল্লাহতায়ালা কাফেরদের ওপর কল্যাণ অথবা প্রতিরক্ষা বা মর্যাদার নেয়ামত দিয়ে থাকেন। তবে এটা তার পক্ষ থেকে নেয়ামত ও দানের আদলে তাদের ধীরে ধীরে পাকড়াও করার প্রক্রিয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কাফেররা যেন কিছুতেই মনে না করে যে, আমি অবকাশ দিই তাদের মঙ্গলের জন্য, আমি অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায়। আর তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৮)
কোরআন মাজিদে আরো ইরশাদ হয়েছে, তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সহযোগিতা করছি, তার মাধ্যমে তাদের জন্য সব মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা উপলব্ধি করে না। (সূরা আল মুমিনূন, আয়াত : ৫৫-৫৬)
তাদের এ সমৃদ্ধি নানাবিধ মুসিবত ও বিপদ দ্বারা পরিবেষ্টিত, রোগ ও দুর্দশায় ভরা এবং আতঙ্ক ও তৃপ্তির অভাব দ্বারা পরিপূর্ণ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যারা কুফর করেছে তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে, অথবা বিপর্যয় তাদের আবাসের আশপাশে আপতিত হতেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এসে পড়বে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।’ (সূরা আর রাদ, আয়াত : ৩১)
তাদের প্রস্তুতি ও রসদ যেন আপনাকে বিচলিত না করে, তাদের দাম্ভিকতা ও স্বেচ্ছাচারিতা যেন বিভ্রান্ত না করে এবং তাদের শক্তি, অস্ত্র ও সরঞ্জাম যেন চিন্তিত না করে। ‘এ তো স্বল্পকালীন ভোগ মাত্র; তারপর জাহান্নাম তাদের আবাস; আর ওটা কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৯৭)
কালের দুটি রূপ- মিষ্টতা ও তিক্ততা এবং যুগের রয়েছে কঠিন ও সহজ আবর্তন। প্রত্যেক দুর্দশার পরই স্বাচ্ছন্দ্য আসে, সব কষ্টই একসময় দূরীভূত হবে। নিশ্চয় পঙ্কিলতার পরে স্বচ্ছতা আসে, বৃষ্টির পরে আকাশ পরিষ্কার হয়, সূর্য অস্তমিত হয়ে আবার উদিত হয় এবং বাগান কৃশকায় হওয়ার পর আবার পল্লবিত হয়। আর আল্লাহতায়ালা একদিন অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারীর ওপর বদলা নেবেন।
আপনারা দয়াময় আল্লাহর আনুগত্য করুন, মুসলিম জামাতকে আঁকড়ে ধরুন এবং বিভেদ ও সংঘাত পরিহার করুন, বিতর্ক ও বিরোধিতা পরিত্যাগ করুন। জেনে রাখুন! যে ব্যক্তি মনগড়া কাজ করে সে কষ্টের সম্মুখীন হয়। আর যে তার মন্দ বিষয় সংশোধন করে নেয় সে তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীকে ধ্বংস করে দেয়। সর্বাধিক সংরক্ষিত ঢাল হলো- উম্মাহর পূর্ববর্তীদের পথ অনুযায়ী কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা।
সর্বদা মনে রাখতে হবে, এক আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণ ছাড়া যন্ত্রণা প্রশমিত হয় না ও ভীতি দূরীভূত হয় না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়; তার ব্যথা থেমে যায় ও দুঃখ নিঃশেষ হয়। অস্থিরতা তকদির প্রতিহত করতে পারে না। যখন মৃত্যু পরিবেষ্টন করে ও ভীতিকর বিষয় নেমে আসে তখন আপনারা দয়াময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করুন, তার কাছে আপনাদের চাহিদা ও অভিযোগ ব্যক্ত করুন এবং তার কাছে বিপদমুক্তির দোয়া করুন। আপনারা মিনতি ও দোয়ার মাধ্যমে বিপদমুক্তি কামনা করুন। কেননা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বিষয় হলো- দোয়া। সবচেয়ে অক্ষম ব্যক্তি সে- যে দোয়া করতে অক্ষম। একমাত্র দোয়াই তকদিরের পরিবর্তন করতে পারে। আল্লাহ ছাড়া অন্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তি রহমত থেকে বঞ্চিত এবং তাকে ছাড়া অন্যের দিকে মনোনিবেশকারী ব্যক্তি সর্বহারা ও বিতাড়িত।
-১৭ নভেম্বর (শুক্রবার) মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
