ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য ঠেকাতে ভারতের উদ্যোগে পুনরুজ্জীবিত হওয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে (সিএসসি) পূর্ণ সদস্য হলো বাংলাদেশ। গত ১০ই জুলাই চীন বিরোধী জোটটির পঞ্চম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। জোটের চতুর্থ সদস্য রাষ্ট্র মরিশাসের উদ্যোগে ভার্চুয়্যালি আয়োজিত ৮ম ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার লেভেল বৈঠকে বাংলাদেশ পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। ঘটনাটি কাকতালীয় হলেও ওই ১০ই জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনে তার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করে দেশে ফিরেন।
২০২১ সালে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ (সিএসসি)র উপ-নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে ভারত, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার ত্রিদেশীয় ওই জোটে বাংলাদেশ ৬ষ্ঠ পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করেছিলো। ওই বছরের আগস্টে শ্রীলঙ্কার উদ্যোগে ভার্চ্যুয়ালি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অপর দুই সদস্য ভারত ও মালদ্বীপ এবং তৎকালীন দুই পর্যবেক্ষক মরিশাস ও সেশেলসের সঙ্গে নতুন পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ আমন্ত্রণ পায়। সেই থেকে পর্যবেক্ষক হিসেবে জোটে ভূমিকা রেখে আসছে বাংলাদেশ। করোনা মহামারির মধ্যে অনুষ্ঠিত কলম্বোর নিরাপত্তা জোটের তাৎপর্যপূর্ণ সেই বৈঠক ছিলো পুনরুজ্জীবিত কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের প্রথম বৈঠক। যেখানে তিন পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র বাংলাদেশ, মরিশাস এবং সেশেলসকে পর্যায়ক্রমে সংগঠনের পূর্ণ সদস্য করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।
পরের বছরে মালদ্বীপে আয়োজিত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের ইন-পারসন বৈঠকে ( ৯ ও ১০ই মার্চ ২০২২) মরিশাস চতুর্থ সদস্য রাষ্ট্রের মর্যাদা পেলেও বাংলাদেশ এবং সেশেলসকে অপেক্ষায় রাখা হয়। গত ১০ই জুলাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, জোটের পুরাতন ৪ সদস্যরাষ্ট্র ভারত, শ্রীলঙ্কা, মরিশাস ও মালদ্বীপ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। স্মরণ করা যায়, ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব ও উপস্থিতি বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালে মূলত ভারতের উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত হয় কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ।
দিল্লির সেই উদ্যোগীর সঙ্গী ছিল কলম্বো এবং মালে। সে সময়ই সামুদ্রিক সহযোগিতা জোরদারে জোটের পরিধি বাড়াতে সম্মত হয় প্রতিষ্ঠাতা ৩ সদস্যরাষ্ট্র। নয়াদিল্লির বিবৃতি মতে, গত ১০ই জুলাই ভার্চুয়াল বৈঠকে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ২০২৩-২৪ বছরের জন্য সিএসসির রোডম্যাপে বর্ণিত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম। ভারতের পক্ষে অংশ নেন দেশটির উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পঙ্কজ কুমার সিং। অপর ৩ সদস্য রাষ্ট্র মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও মরিশাস এবং একমাত্র পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র সেশেলসের যথোপযুক্ত প্রতিনিধি
বৈঠকে ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেন।
নয়াদিল্লির বিবৃতি জানানো হয়,
সেই বৈঠকে গত বছরের ১২ই জুলাই মালদ্বীপ আয়োজিত জাতীয় উপ-নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের ৭ম বৈঠকের গৃহীত সিদ্ধান্ত, গত বছরের ৭-৮ই ডিসেম্বর মরিশাসের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ তম জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা হয়েছে। বৈঠকে কলম্বো কনক্লেভের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের পরবর্তী বৈঠক (৭ম বৈঠক) চলতি বছরের শেষের দিকে ভারতে আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, গত মে মাসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রার ঢাকা সফরকালে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে বাংলাদেশের পূর্ণ সদস্য পদ পাওয়ার ইঙ্গিত মিলে। দুই পররাষ্ট্র সচিবের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মার সেই বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, এ বছরে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের সদস্য হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটের পুরনো সদস্যরা।ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দুর্যোগ প্রশমন কার্যক্রম একসঙ্গে করার ব্যাপারেও ভারতের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্র সচিব। বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার উদ্যোগে গঠিত হয় ‘কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ’। তবে এটি দীর্ঘদিন অকার্যকর ছিলো। ২০২০ সালে ভারত এটাকে পুনরুজ্জীবন দান করে। ‘কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ’কে ওই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে চীনবিরোধী জোট হিসেবে দেখা হয়।
