গত কয়েক বছর ধরে LGBTQ এজেন্ডার সাথে সাথে আরেকটি বিষয়ের প্রচারণায় হাত মিলিয়েছে বড় বড় কর্পোরেটগুলো (বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে) – সেটি হল Gender Role Inversion বা পরিবার/সমাজে নারী পুরুষের ভূমিকাকে উল্টে দেয়া। যেমন: মা স্কুটিতে করে বাজারে যাচ্ছেন আর বাবা স্কুলে যাবার আগে মেয়ের চুল বেঁধে দিচ্ছেন, স্ত্রী অফিসে ক্যারিয়ারের উন্নতির জন্য অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন আর তার সাপোর্ট দিচ্ছেন স্বামী নিয়মিত রান্না বান্না করে – এই মেসেজগুলো কিন্তু কেবল বিজ্ঞাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আপনারা কর্মক্ষেত্রে চারিদিকে তাকালে এমনটি দেখবেন যে বাচ্চার অসুস্থতার জন্য কর্মজীবী বাবা মা দুজনের মধ্যে বাবাকেই অফিস থেকে ছুটি নিতে হচ্ছে; মায়ের নয়। কেননা বাচ্চার অসুখ হলে কেবল মা যত্ন নিবেন – এটি গ্রহণযোগ্য নয়; এটাই তাদের বার্তা। এই বিষয় নিয়ে লেখার তাড়না অনুভব করলাম টিকটক করে বিখ্যাত হওয়া এক মুসলিম দম্পতির সাম্প্রতিক বিচ্ছেদ নিয়ে একজন মুসলিম আলোচকের ভিডিও চোখে পড়ার পর। তিনি সেখানে তুলে ধরেছেন কীভাবে পুরো বিশ্ব জুড়ে মুসলিম বা অন্য ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর সামনে সুখী পরিবারের সংজ্ঞা হিসেবে নারী পুরুষের ভূমিকাকে উল্টো করে দেখানো হচ্ছে – এবং বুঝে না বুঝে বিবাহিত নারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে বৈবাহিক জীবনে সুখী হতে হলে তাদের হতে হবে স্বামীর উপর ছড়ি ঘোরানো একজন নারী – তার প্রতিটা আদেশ পালন করতে স্বামী বাধ্য থাকবেন এবং অন্যথায় সন্তানদের বা পরিবারের অন্যদের সামনে অপমানিত হওয়ার ভয়ে স্বামী থাকবেন সর্বদা ভীত; আর ঘনিষ্ঠতা থেকে বঞ্চিত করার অস্ত্রতো স্ত্রীর আছেই। এই সব কিছুই স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক যেমন হবার কথা ইসলাম বলে, তার বিপরীত হলেও কেউ এই বিষয়টি সংশোধনের জন্য কাজ করছেন না। এই সব নিয়ে যখন চিন্তা করছি, তখন একদিন এক সহকর্মীর পাঠানো একটা WhatsApp জোক পেলাম। সেটা বেশ পুরোনো হলেও আমার তখনি মনে হল Gender Role Inversion নিয়ে অনেক দিন ধরে আমাদের অলক্ষ্যে কাজ চলছে আর আমরা এতে প্রভাবিত হয়ে চিন্তাধারা পরিবর্তন করে ফেলছি মনের অজান্তে। জোকটা এমন: অফিসে একজন লোক তার সহকর্মীকে তার পারিবারিক জীবনে সুখী হবার রহস্য জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন যে তিনি সব বড় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন আর ছোটখাট বিষয়গুলো স্ত্রীর উপর ছেড়ে দেন। আরো বিস্তারিত বলতে বললে তিনি বললেন, ঘর কীভাবে চলবে সব কিছুই তার স্ত্রীর সিদ্ধান্তে হয়, আর তিনি কেবল World Politics নিয়ে চিন্তা করেন। এটা বেশ চালু জোক হলেও এখানেও সেই একই বার্তা। এর মধ্যে এক শনিবার মেট্রো রেলে চড়তে গিয়ে বিজ্ঞাপনের স্ক্রীনে দেখলাম কুখ্যাত মোটু পাতলু কার্টুনের বিজ্ঞাপন। খেয়াল করে দেখলাম সেখানে পুরুষরা নাচছে আর এক মেয়ে পুলিশ ডাকাতদের মেরে শুইয়ে দিচ্ছে – এইভাবে পত্রিকা থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন, কার্টুন, নাটক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম সব জায়গাতে একই মেসেজ – নারীই হল এখন পরিবারের রক্ষাকর্তা আর পুরুষ হলো ঘর সামলানোর মানুষ। এ এক মহামারী! নারী এবং পুরুষের ভূমিকার এই ১৮০ ডিগ্রী উল্টানো রূপ পরিবারগুলোকে টেকসই হতে দিচ্ছে না। এর করাল গ্রাস হতে মুসলিম পরিবারগুলোও নিস্তার পায় নি। আমি এই লেখাতে মুসলিম পরিবারগুলোর কাছে এই প্রচারণা বা মেসেজগুলো গ্রহণযোগ্যতার কারণ এবং এর থেকে উত্তরণের উপায় তুলে ধরার চেষ্টা করব। অবশ্যই, এই লেখার কিছু অংশ অস্বস্তিকর হবে (অন্তত তাদের জন্য, যাদের কাছে এই লেখার এইটুকু পর্যন্তই আজগুবি মনে হচ্ছে)। আল্লাহ আমাকে তৌফিক দান করুন।
১. কুরআন সুন্নাহর সালাফদের বুঝ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়া:
উম্মাহর এমন কোন সমস্যা নেই যার কারণ হিসেবে কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে বিচ্যুতিকে দেখানো যাবেনা। কাওয়াম (এই লেখার বাকি অংশে কাওয়াম এবং অভিভাবক শব্দটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছি যদিও কাওয়াম শব্দের সরাসরি অনুবাদ অভিভাবক নয়) হিসেবে পরিবারে পুরুষদের কর্তৃত্ব এবং মর্যাদাকে মুসলিম নারীরাও অনেক সময় যেকারণে মেনে নিতে পারছেন না, তার কারণ হল ওয়াহীর ব্যাপারে সালাফদের বুঝকে এড়িয়ে গিয়ে পাশ্চাত্যে প্রচারিত কোন বুঝকে গ্রহণ করা। দেখা যাক এই ব্যাপারে ওয়াহী থেকে আমাদেরকে কী বলা হয়েছে।
আল্লাহ সুবহানা তা’আলা সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন,
“পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের এককে অন্যের উপর মর্যাদা প্রদান করেছেন, আর এজন্য যে, পুরুষেরা স্বীয় ধন-সম্পদ হতে ব্যয় করে। ফলে পুণ্যবান স্ত্রীরা (আল্লাহ ও স্বামীর প্রতি) অনুগতা থাকে এবং পুরুষের অনুপস্থিতিতে তারা তা (অর্থাৎ তাদের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদ) সংরক্ষণ করে যা আল্লাহ সংরক্ষণ করতে আদেশ দিয়েছেন।…………”
এই আয়াতটির তাফসীরে বেশ অনেকগুলো হাদীস এসেছে; তার মধ্যে একটি হাদীস (যেটিকে নাসিরুদ্দিন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সহীহ বলেছেন) থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ উল্লেখ করছি।
মুআয রাদিআল্লাহু আনহু সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না।……… (ইবনে মাজাহ ১৮৫৩। লিংক)
এতদসত্ত্বেও আজকের অনেক মুসলিম নারী তার স্বামীকে অভিভাবকের (কাওয়াম) মর্যাদা দিতে চাননা; বিভিন্ন খোঁড়া যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে – যেমনটা আমরা হাদীসকে সরিয়ে প্রচলিত রীতির পক্ষে সাফাই গাওয়ার সময় করে থাকি। এর মধ্যে আছে, “আমাদের স্বামীরা সালাফদের মতন নন যে আমরা সালাফ মহিলাদের মতন আচরণ করব; তারা এমন আচরণ পাওয়ার মতন আগে যোগ্য হোক, এরপর করব।”, “আমাদের বয়সের পার্থক্য খুব কম বলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে গেছে, আর তা ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো তাঁর স্ত্রীদের সাথে অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেছেন; তাই এতো অভিভাবকত্ব ফলাতে দিতে পারবো না।” ইত্যাদি। কিন্তু এই ধরণের কোন শর্ত স্বামীকে সম্মান দেখানোর জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরের হাদীসে বা অন্য কোথাও দেননি। এখন আসা যাক এ থেকে উত্তরণের উপায়ে।
- বিয়ের সময় মুসলিম বোনদের উচিত এমন মুসলিম পুরুষকে স্বামী হিসেবে নির্ধারণ করা যাকে তাদের পক্ষে কাওয়াম হিসেবে মেনে নেয়া সম্ভব – “আমাকে তো জোর করে বিয়ে দিয়েছে এইখানে” – এমন কথা বিয়ের পরে না বলে বিয়ের কথাবার্তা চলার সময় নিজের অমতকে অভিভাবকদের সামনে নিয়ে আসুন। খেয়াল করবেন আমরা দ্বীনদার মুসলিম সমাজের ব্যাপারে উপরোক্ত সমস্যা নিয়ে কথা বলছি। অতএব, কারো ওয়ালী যদি এমন অনাকাঙ্খিত জায়গায় বিয়ে দেয়ার জন্য আয়োজন করেন, তাহলে অবশ্যই মুসলিম মেয়েদের সেটা অন্য একজন মুরুব্বীকে (যার কথা তার ওয়ালী শুনবেন) অভিযোগ হিসেবে জানানোর সুযোগ রয়েছে।
- এছাড়া স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ স্পম্পর্কের মানে এই নয় যে অভিভাবকের মর্যাদা দেওয়া যাবে না। পাশ্চাত্যের অনেক দ্বায়ী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর স্ত্রীদের বন্ধুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে (যেমন আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা বা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাঁধের পিছন থেকে হাবশীদের বর্ষা নিক্ষেপ দেখা) এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে মুসলিম নারীদের মন থেকে স্বামী যে কাওয়াম, সেই ব্যাপারটাই হারিয়ে গেছে।
- এছাড়া অনেকেই এখনকার যুগে স্বামী স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য কম হওয়ার কারণে মুসলিম স্ত্রীদের পক্ষে তাদের স্বামীদের অভিভাবকত্ব মেনে নেয়া সম্ভব নয় – বলে থাকেন। অথচ সেই খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে শুরু করে আজকের যুগ পর্যন্ত সমবয়সী বা বয়সে বড় স্ত্রীর উদাহরণ আছে প্রচুর যারা তাদের স্বামীর সাথে ভালোবাসার সম্পর্কের সাথে সাথে তাদের প্রাপ্য মর্যাদাও দিয়েছেন। আর আমাদের সবার এটা জানা আছেই যে, আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হেরা গুহা থেকে জিবরীল আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাতের পর আতঙ্কিত অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন, তখন আমাদের মা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে অসাধারণভাবে সাহস দিলেন এবং তাকে নিশ্চিত করলেন যে তার সাথে আল্লাহ নিশ্চয় খারাপ কিছু করবেন না। আর এরকম আচরণই মা খাদিজাকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে যে আল্লাহ সুবহানা তা’আলা তাকে সালাম পাঠিয়েছেন। অথচ আজকের দিনে বয়সে বড় কোনো স্ত্রী যদি এই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতেন, তাহলে স্বামীকে গুহায় গিয়ে একা সময় কাটানোর জন্য তিরস্কার করতে ছাড়তেন না। তাই আবারও বলছি যদি বয়সের ব্যবধান কম হওয়ার কারণে আপনার জন্য স্বামীকে অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়া কষ্টকর হয়, তাহলে যতটুকু ব্যবধানে বিয়ে করলে আপনার পক্ষে স্বামীকে অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়া সহজ হবে – সেই বয়সের ব্যবধানেই আপনি বিয়ে করবেন বা আপনার ওয়ালীকে বিয়ের পূর্বেই সেটা জানাবেন।
২. নারীদের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব পালন করার জন্য পুরুষদের পক্ষ থেকে নারীদের প্রতি অবজ্ঞা:
এই পয়েন্টটি আমি একেবারে লেখার শেষে নিয়ে আসার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু মনে হয়েছে এর ফলে নারী পাঠকরা লেখাটি পড়ার আগ্রহ হারাবেন। তাই কুরআন ও সুন্নাহর থেকে বিচ্যুতির পরই এই পয়েন্টটি নিয়ে আসলাম। মুসলিম নারীদের আল্লাহ সুবহানা তা’আলা অর্থনৈতিক দায়িত্বের বোঝা দেননি। অনেকে, এটিকে নারীর মা, স্ত্রী এবং অন্যান্য ভূমিকা পালনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ছাড় হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু এর পেছনে আল্লাহর আরো বড় হিকমাহ থাকতে পারে। তাই মুসলিম নারী উত্তরাধিকার অথবা পারিবারিক দায়িত্ব অবহেলা না করে হালাল কাজ করে সম্পদ অর্জন করতে পারলেও পরিবারের প্রতি তাদের কোনো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। এর অর্থ হল মুসলিম নারীরা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অভিভাবকদের (বাবা, স্বামী, ভাই বা সন্তান) উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল থাকে। দেখা গেছে মুসলিম পুরুষরা নারীর প্রতি তাদের এই অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বুঝে বা না বুঝে অনেক সময় তাদেরকে খোঁটা দিয়ে থাকে বা অপমানসূচক ব্যবহার করে। এই ধরনের কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি যে মুসলিম পুরুষরা বাসায় ফিরে নারীদের এমন মন্তব্য করছেন, “টাকা তো রোজগার করো না, তাই বুঝনা।” অথবা “এতকিছু কেন চাচ্ছো, টাকা কি গাছে ধরে?” অথবা “সারাদিন বাসায় বসে বসে কি করো?” যখন আল্লাহ প্রদত্ত এই দায়িত্ব পুরুষেরা আল্লাহর জন্য না করে বরং সামাজিক রীতি-নীতি হিসেবে করে থাকেন, তখন তাদের দ্বারা এধরনের অপমানসূচক ব্যবহার হয়। এই ধরনের পরিবারের নারী সদস্যরা জেন্ডার রোল ইনভারশন প্রচারনার খুব সহজ শিকারে পরিণত হন, কেননা তারা মানসিকভাবে নাজুক অবস্থায় থাকেন এবং তারা মনে করেন তাদের এই অবস্থার জন্য তাদের অভিভাবকদের ইসলাম বিচ্যুতি নয় বরং ইসলামই দায়ী।
এই অবস্থার উন্নতির জন্য করণীয় হল দুটি (এই মুহূর্তে এই দুইটাই মাথায় আসছে)
- মুসলিম পুরুষদের এই উপলব্ধি হতে হবে যে তারা তাদের মা, বোন, স্ত্রীর জন্য যা খরচ করেন সেটাকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মর্যাদাপূর্ণ খরচের খাত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এমন একটি ভাল আমল করার পর সেটা নিয়ে নারীদের খোঁটা দিলে সে আমলটির গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে – সেটাই স্বাভাবিক। এছাড়া মুসলিম পুরুষদের উচিত তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প হলেও তাদের স্ত্রীদের কিছু হাত খরচ দেয়া যেন প্রতিটি ছোট খাটো বিষয় নিয়ে তাদের বারবার পুরুষদের কাছে আসতে না হয়।
- আর মুসলিম নারীদেরও দ্বীনের জ্ঞান বাড়াতে হবে যেন তারা অভিভাবকদের উপর তাদের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নিয়ে কোন হীনমন্যতায় না ভোগেন। আত্মীয় স্বজন বা বান্ধবীদের প্ররোচনায় অনেক সময় দ্বীনদার মুসলিম নারী নিজেকে গৃহিণী (কেবল মা এবং স্ত্রী) হওয়ার কারণে অনেক সময় মূল্যহীন ভাবা শুরু করেন। দেখা যায় ঘরের কর্তা পুরুষটি যথেষ্ট চেষ্টা করা সত্ত্বেও নারীর হীনমন্যতার কারণে বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ৪ জন নারী খাদীজা, ফাতিমা, মারিয়াম, আসিয়া সকলেই মা, স্ত্রী এবং মেয়ে হিসেবে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে আল্লাহর নিকট এই মর্যাদা পেয়েছেন। তাই মুসলিম নারীদের এ থেকে মানসিক শক্তি নেয়া চাই। এছাড়া তাদের অভিভাবকদের (কাওয়াম) প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং ছোটখাটো ভুলগুলোকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
৩. উচ্চশিক্ষা, নারীর স্বনির্ভরশীল হওয়া এবং নারীবাদের প্রচ্ছন্ন প্রভাব
উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে স্বনির্ভর নারী হওয়ার স্বপ্ন নারীবাদ কেবল নারীদেরকেই দেখায়নি বরং তাদের পিতা-মাতাদেরকেও এই স্বপ্নে বিভোর করেছে। অনেক বাবা মা বিয়ের পরও তাদের মেয়েদের সংসারে হস্তক্ষেপ করতে সচেষ্ট থাকেন এবং মেয়েদেরকে তাদের স্বামীদেরকে একজন প্রতিযোগী হিসেবে দেখার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এর মধ্যে আছে মেয়েকে স্বামীর আয় রোজগারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বলা, তার ফাইন্যান্সিয়াল ডিসিশনগুলোতে তার ইচ্ছাকে প্রতিফলন করানো। অনেক মুসলিম নারী ইসলামী জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বাবা মায়ের দেওয়া মানসিক চাপে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে একজন অমুসলিম নারীর লেখা The Surrendered Wife নামের একটি বই নারীবাদের এই যুগে বেশ নতুন করে একটা পুরোনো দৃষ্টিকোণকে সামনে নিয়ে এসেছিল। ভদ্রমহিলা তার বৈবাহিক জীবনে একটা খারাপ সময় পার করার পর খেয়াল করে দেখলেন তিনি আসলে নিজের অজান্তে স্বামীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে থাকেন এবং এই প্রবণতাই তার সম্পর্কের অবনতির জন্য দায়ী।
নারীদের এই নিয়ন্ত্রণ স্বামীর অর্থ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তেই কেবল সীমাবদ্ধ নয়। আমি কিছু উদাহরণ দিলে আপনারা সেটা correlate করতে পারবেন। দূরের যাত্রায় কোন রুটে গেলে ট্রাফিক জ্যাম এড়ানো যাবে সেটা থেকে শুরু করে (যেমন: সন্তানদের সামনে স্বামীকে বলা, “আমি বলেছিলাম এদিক দিয়ে আসলে ট্রাফিক জ্যাম পাবে। এখন?” ), সন্তান কোন স্কুলে পড়বে, হজ্জ্ব উমরাতে যাবার সময় সন্তানকে কোথায় রেখে যাবে বা কোন এজেন্সীর মাধ্যমে উমরাতে যাবে, সব কিছুতেই নারীরা চায় তাদের পরামর্শ গৃহীত হোক। এবং তাদের সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত না হলে তারা ধরে নেন যে তাদের সাথে সম্মানসূচক আচরণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে অনেক মুসলিম নারী সীরাহ থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার দেওয়া পরামর্শের রেফারেন্স টেনে আনেন। স্ত্রীরা অবশ্যই তাদের স্বামীদের কিছু বিষয়ে পরামর্শ দিবেন – কিন্তু তাদের সকল পরামর্শ বা সিদ্ধান্তই ১০০% গৃহীত হবে – এই চিন্তাটি ভুল। এতে পুরুষরা নিয়ন্ত্রিত বোধ করে এবং তাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে আগ্রহ হারাতে শুরু করে। এছাড়া আল্লাহর কাছে পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন পুরুষরাই।
তাই সুখী পরিবার গঠনের জন্য মুসলিম নারীদের উচিত তাদের চিন্তা এবং পরামর্শ গুলো স্বামীর কাছে মার্জিতভাবে তুলে ধরা এবং সেটাকে গ্রহণ করতে হবে এমন কোন শর্ত আরোপ না করা। এর ফলে পরিবার পরিচালনায় তাদের ভূমিকা যেমন তারা পালন করলেন, তেমনি তাদের সিদ্ধান্ত গৃহীত না হওয়ার কারণে তারা কোন মানসিক অশান্তিতে ভুগবেন না। এই ধরণের অভ্যাস গড়ে তুললে প্রাথমিক ভাবে আপনি পরাজিত হচ্ছেন মনে হলেও দেখবেন আপনার স্বামী আপনার প্রতি আরো ভালোবাসা অনুভব করছেন এবং আপনারা পরামর্শগুলো আরো বেশি আমলে নিচ্ছেন।
৪. সংসারের কাজে স্বামীর অংশগ্রহনকে বাধ্যতামূলক মনে করা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে পারিবারিক কাজগুলোতে তার অংশগ্রহণের কথা আমরা জানতে পারি। অনেকে পুরুষই এই সুন্নাহর কথা খেয়াল করে পারিবারিক কাজগুলোতে কমবেশি অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যা বাঁধে যখন স্ত্রীরা মনে করেন সংসারের এই কাজগুলোতে তাদের স্বামীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক এবং এর ব্যতিক্রম হলে মনে করেন তাদের সাথে তাদের স্বামীরা সম্মানসূচক আচরণ করছেন না। পরামর্শ চাপিয়ে দেয়ার মতন এক্ষেত্রেও জোর জবরদস্তি না থাকলে আমার বিশ্বাস অনেক মুসলিম পুরুষই পরিবারের কাজগুলোতে অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করতেন আরও বেশি। কিন্তু যখনই স্ত্রীর পক্ষ থেকে এটিকে চাপিয়ে দেয়া হয় তখন সেটিকে বোঝা মনে হয়। আর পুরুষদের উচিত পারিবারিক কাজগুলোর ব্যাপারে অযাচিত প্রত্যাশা আরোপ না করা (যেমন রামাদানের সময় হরেকরকম ইফতারির প্রত্যাশা যা মুসলিম নারীদের ইবাদত থেকে দূরে নিয়ে যায়)।
খেয়াল রাখতে হবে আল্লাহ সুবহানা তা’আলা সূরা আলে ইমরানে মারিয়াম আলাইহাস সালামের মায়ের কথার মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন
অতঃপর যখন সে তাকে প্রসব করল, বলে উঠল, হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যা প্রসব করেছি এবং আল্লাহ ভাল করেই জানেন যা সে প্রসব করেছে; বস্তুতঃ পুত্র কন্যার মত নয় এবং আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম এবং আমি তাকে ও তার বংশধরকে বিতাড়িত শয়ত্বান হতে তোমার আশ্রয়ে ছেড়ে দিলাম। (আলে ইমরান, আয়াত ৩৬)
পরিশেষে Gender Role Inversion এর বিপরীতে আমাদের করণীয়গুলো যদি একত্রিত করি তাহলে দাঁড়াবে এরকম।
- পুরুষদের অভিভাবক হিসেবে মেনে নেয়া, এর জন্য বিয়ের আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া এবং নারী সালাফদের উদাহরণকে অনুসরণ করা।
- দায়িত্বশীল মুসলিম পুরুষের উচিত নয় যে তার উপর নির্ভরশীল নারীদেরকে তিনি হেয়প্রতিপন্ন করছেন।
- নারীদের উচিত পরিবার পরিচালনার কাজে স্বামীকে তার পরামর্শ মার্জিতভাবে উপস্থাপন করা এবং বিরোধকে লুকানো। অতঃপর স্বামী তার পরামর্শের বাইরে সিদ্ধান্ত নিলে তাতে খুশি হওয়া।
- পারিবারিক কাজে স্বামীদের অংশগ্রহণকে ভালো স্বামী হবার আবশ্যকীয় গুন হিসেবে বিবেচনা না করা।
আল্লাহ আমাদের মুসলিম পরিবারগুলোকে শত্রুর চক্রান্ত থেকে রক্ষা করুন।
আবু আঈশা
৯ মুহাররম ১৪৪৬
