বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০ ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুদ- বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন প্রাপ্ত পাঁচ ছাত্রলীগ নেতার কারাদ-ও বহাল রাখা হয়েছে।
আসামিদের মৃত্যুদ- অনুমোদন আবেদন (ডেথ রেফারেন্স), আসামিদের জেল আপিল এবং কারাদ-াদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানি শেষে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল রোববার এ রায় দেন। রায় ঘোষণাকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান,আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট মাসুদ হাসান চৌধুরী, আজিজুর রহমান দুলু উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আসামিদের পরিবারের সদস্য এবং ভিকটিম আবরার ফাহাদের ভাই আবরার ফাইয়াজ ও বাবা বরকত উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রায়ে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয় আমরা সেটি প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, নিম্ন আদালতের রায় বহাল রয়েছে। এ রায়টা যেন অতিদ্রু কার্যকর হয়। আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। এ রায় দ্রুত কার্যকরের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই। একজন আসামির জেল থেকে পলাতকের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা আমরা ৬ মাস পরে জানলাম। এটা আমাদের কাছে প্রশ্ন না করে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন করাই ভালো। এটা আমরা কিছু বলতে পারবো না।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় আবরার ফাহাদের ছোটভাই আবরার ফাইয়াজ বলেন, রায় বহাল রয়েছে। আমরা অবশ্যই সন্তুষ্ট। আমরা আশা করবো অতি দ্রুত যে প্রক্রিয়াগুলো আছে সেগুলো সম্পন্ন করে রায় কার্যকর করা হবে।
হাইকোর্টে মৃত্যুদ- বহাল থাকা আসামিরা হলেন, বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী হাসান রাসেল, অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মাজেদুর রহমান মাজেদ, মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, শামসুল আরেফিন রাফাত, মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ সেতু, মোর্শেদ-উজ-জামান মন্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মুজতবা রাফিদ। তখন পলাতক ছিলেন ৩ জন। মোর্শেদ-উজ-জামান ম-ল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মুজতবা রাফিদ। যাবজ্জীবন কারাদ- বহাল থাকা আসামিরা হলেন, ছাত্রলীগ নেতা মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ মুন্নার। এদের মধ্যে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি গত ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল টপকে পালিয়েছেন বলে গত ২৫ ফেব্রুারি জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে তরিৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে রাতভর নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতারা। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বুয়েটের ২৫ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর চার্জশিট দেয় পুলিশ। চার্জশিটে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশ করে ছাত্রশিবিরের কর্মী সন্দেহে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আবরারকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। মামলায় যুক্তি-তর্ক শেষে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদ- ও পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়। আসামিদের মৃত্যুদ- অনুমোদনের ( ডেথ রেফারেন্স) জন্য বিচারিক আদালতের রায়সহ নথিপত্র ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি হাইকোর্টে আসে। ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদন আবেদন), দ-িতদের পৃথক জেল আপিল শুনানি শেষ হয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখেন হাইকোর্ট।
রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান বলেন, আবরার হত্যা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো । তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার জন্য ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগের প্রতি যে ধারণা, এই রায়ের মাধ্যমে সে ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলো। আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে এই বার্তা গেল যে, আপনি যত শক্তিশালী হন না কেন, আপনার পেছনে যত শক্তি থাকুক না কেন সত্য একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে। ন্যায় বিচার হবেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড এটাই প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছে যে, ফ্যাসিজম যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের মনুষত্ববোধ কখনো কখনো জেগে ওঠে । সব ফ্যাসিজমকে ভেঙে দুমড়েমুচড়ে দিতে পারে।
রায়ে সন্তুষ্ট আবরারের মা : এদিকে ইনকিলাবের কুষ্টিয়া সংবাদাদাতা জানান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন। গতকাল রোববার দুপুরে হাইকোর্টের রায়ের পর কুষ্টিয়া শহরের নিজ বাসভবনে তিনি তাঁর সন্তুষ্টির কথা জানান।
আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যার আপিল শুনানির রায় হয়েছে। হাইকোর্টে আগের রায় বহাল থাকায় আমরা সবাই সন্তুষ্ট।
সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রোকেয়া খাতুন বলেন, দীর্ঘ ছয় বছর পরও এ দেশের মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন। কেউ আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাননি। এ জন্য আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এখন চাওয়া, এ রায় যেন দ্রুত কার্যকর হয়। এ রায় কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এমন কাজ করতে আর কেউ সাহস পাবে না।
এর আগে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের করা আপিলের শুনানি শেষ হয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। ডেথ রেফারেন্স অনুমোদন ও আসামিদের করা আপিল খারিজ করে আজ এ রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেন। এ ঘটনায় আবরারের বাবা রাজধানীর চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর মামলার রায় দেন বিচারিক আদালত। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদ- ও পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়।
