পুরো ঘটনাটা আমার চোখের সামনেই ঘটেছে তাই বর্ণনা করতেছি।
৪ তারিখ রাতে রোগীটা কে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে নিয়ে আসা হলো, রোগীটার ইমারজেন্সি অপারেশন দরকার ছিল এবং তারপর ICU ও বাচ্চার জন্য NICU দরকার ছিল। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কে দেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ মেডিকেল কলেজ ধরা হয়, কিন্তু লজ্জার সাথে বলতেছি এখানে NICU সাপোর্ট নেই। ফলাফল এখানকার ডাক্তাররা ঢাকা মেডিকেল কলেজে রেফার করেন। অনেক রোগী এখান থেকে ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত নেওয়া যায় না ,এর মধ্যেই মারা যায়। আমি এই মেডিকেলের একজন শিক্ষার্থী, ভবিষ্যত ডাক্তার, কিন্তু ওই রোগীর জায়গায় আমার মা হলেও আমার নিজের মেডিকেলে চিকিৎসার অভাবে আমার মা হয়তো মারা যেত।
দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলাম, সেখানে ডাক্তাররা বললো দ্রুত OT করা লাগবে, Eclampsia র রোগী যেহেতু।
১. দিলো কিছু ইমার্জেন্সি টেস্ট ৫-৬ হাজার টাকার মতো, ঠিক ডাক্তার রুমের বাহিরেই দাঁড়িয়ে আছো কয়েকটা ডায়গনস্টিক সেন্টার এর দালাল। রোগী নিরুপায় কি করবে? দিয়ে দিল টাকা।
২. বললো ২ ব্যাগ ব্লাড লাগবে, বললাম কোথা থেকে ম্যানেজ করবো এতো দ্রুত? দেখি পিছনেই দালাল দাঁড়িয়ে আছে বললো, ১ ব্যাগ ৫৫০০৳ , আপনি ডাক্তার মানুষ ৫০০ ৳ কম রাখা যাবে আপনার সম্মানে। যাক দালাল ও সম্মান করে।
৩. রোগী দ্রুত OT তে নিলাম, গাইনী OT তে দেখি পুরুষ ওয়ার্ড বয়। ( এটা বললাম কারণ ওয়ার্ড বয় এমন কোন জরুরী ব্যক্তি না, যে পুরুষ ওয়ার্ড বয়ই রাখতে হবে, মহিলা রাখলেই হয়। নারীদের সম্ভ্রমের ব্যাপারটা মাথায় রাখা উচিত আমাদের।)।
৪. Anesthesia ( অজ্ঞান) দেওয়া হলো, তখন একজন কে বলতে শুনলাম Patient monitor ভালোমতো কাজ করে না!.
Patient monitor হলো সেই যন্ত্র, যে যন্ত্র দেখে ডাক্তাররা নির্ণয় করে রোগীর অবস্থা কি? বেঁচে আছে না মারা গেছে, সেটা ঠিকঠাক কাজ সবসময় করে না!!
৫. আগেই বলেছি রোগীর অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল, OT তে ইমারজেন্সি একটা জিনিস খুজতেছিল ডাক্তাররা, ৫ মিনিট ধরে খুঁজে ও পায়নি( নাম মনে করতে পারতেছি না) । OT তে ১ মিনিট কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা একজন ডাক্তার না হলে আপনার বুঝার কথা না। ১ সেকেন্ডর ভুলে ও রোগী মারা যায় অনেক সময়। তো ডাক্তাররা সেই ওয়ার্ড বয়কে বললো অন্য OT থেকে দ্রুত খুঁজে নিয়ে আসার জন্য। ওয়ার্ড বয় যেভাবে গিয়েছে, কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো সে গর্ভবতী। আমার মেডিকেল হলে হয়তো আমি একটা থাপ্পর বসিয়ে দিতাম।
যাইহোক কোনোমতে অপারেশন শেষ হলো, সার্জনদের প্রশংসা করতেই হয়, রাত দুইটায় এত দ্রুত সবকিছু ম্যানেজ করা কেবলমাত্র ডাক্তারদের দ্বারা ই সম্ভব। ঠিক কত লক্ষ টাকা বেতন দিলে আপনি রাতের তিনটা বাজে গিয়ে মানুষ কাটবেন? তাও প্রতিনিয়ত?.. সে আলাপ আরেকদিন করবো।
তো অপারেশন হওয়ার পর হঠাৎ ডাক্তাররা বলল আমাদের এখানে তো ICU , NICU কিছুই খালি নেই!!
আমি থ বনে গেলাম!! কিছুক্ষণের জন্য ওনাদের উপর মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল, এতো সিরিয়াস একটা রোগী আপনি অপারেশন কেন করবেন যদি , post operative সাপোর্ট না থাকে?!..এখন রোগীর কি হবে!.
একটু পর বুঝলাম ওনাদেরও আসলে দোষ দিয়ে লাভ নেই, রোগীদের শেষ ভরসাই ঢাকা মেডিকেল এখান থেকে রোগী ফেরত পাঠানোর অপশন নেই। কিন্তু এখানে রোগীর জন্য Emergency support নেই!! চিন্তা করেন, আপনি আপনার বাবা-মা কে নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ হাসপাতালে গিয়েছেন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে, ডাক্তাররা মোটামুটি জানে তারা অপারেশন করলেই এই রোগীটা মারা যাবে, কারণ অপারেশনের পরের ব্যবস্থা নেই। এরপরেও আপনার মনকে বুঝানোর জন্য অপারেশন করে মৃত্যুর পথে এগিয়ে দিচ্ছে।
যাই হোক, এখন প্রাইভেটে ICU এত রাতে পাবো কোথায়, রোগীর টাকা পয়সাই সেরকম নেই, তাও প্রিয়জনকে বাঁচানোর জন্য তো মানুষ চেষ্টার কমতি রাখে না। আমি খুঁজতে গিয়ে দেখি ঠিক OT র বাইরে ICU র দালালও বসে আছে , সোনায় সোহাগা।
প্রাইভেটেই ঠিক করলাম, কিন্তু আমি OT তে ডাক্তারদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম, হয়তো ICU পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সময় পাবো না। তাও বের করে আনলাম, ডাক্তাররাও নিরুপায়,কারণ সিরিয়ালে তো আরো কয়েকশ রোগী ফ্লোরে শুয়ে আছে 😅
তারপর যা হওয়ার তাই হলো , ভোর ৪ টায় প্রাইভেটে দিয়ে হলে আসলাম, সকাল ৭ টায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বললো রোগী মৃত। সম্ভবত, আনার পথেই মারা গিয়েছিল । হাসপাতাল একটু পর চেক করে মৃত ঘোষণা করেছে হয়তো।
এবার একটু থামুন, এই রোগীর জায়গায় আপনার প্রিয়জনকে ভাবুন। কসম করে বলতেছি, অনেক টাকার মালিক না হলে আপনি জীবনেও এর চেয়ে ভালো চিকিৎসা পাবেন না। কারণ আমি একজন ভবিষ্যত ডাক্তার, আমি আমার বোন পরিচয় দিয়েছি রোগীকে। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের রোগীর চেয়ে বেশি প্রাধান্য কখনো আপনি পাবেন না, যেই হোন না কেন আপনি।
আমি ভাবতে ছিলাম, আজকে যদি আমার মা হতো তাও আমার কিছু করার ছিল না এখানে 😅..
এই হচ্ছে আপনার দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ( অন্যতম প্রধান মৌলিক অধিকার!)
সেখানে আপনি কিছু টাকা পেয়ে দাবি করেন আপনার রাষ্ট্রে অনেক উন্নতি হয়েছে? How lame!!
ভেবেছিলাম অন্তবর্তীকালীন সরকার হয়তো কিছুটা পরিবর্তন করবে। হয় আল্লাহ এরা দেখি এক বৃদ্ধ বীমা কোম্পানির কর্মচারীকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বানিয়ে বসে আছে!!
কথা বলার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু আজকে দেখলাম স্বাস্থ্যের ডিজি মহোদয় এক ডাক্তারকে OT তে টেবিল রাখা নিয়ে শাসাচ্ছেন, যেখানে ওনার সর্বোচ্চ মেডিকেল কলেজের সেবার এই অবস্থা?..
আপনি ধারণাও করতে পারবেন না প্রতিদিন কি পরিমাণ অপমৃত্যু হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে।
আবার ডিজি স্যার সহ পুরো কমিউনিটির কাছে প্রশ্ন রাখলাম,
© ইকবাল হোসেন
