২০২৪ সালে ফ্রান্সে ডমিনিক পেলিকট ও তাঁর ৫০ সহযোগীর বিচার ইন্টারনেটে যৌন নির্যাতনকারী এক ভয়াবহ চক্রকে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করে। ডমিনিক তাঁর স্ত্রী জিসেল পেলিকটকে মাদক খাইয়ে অচেতন করে ১০ বছর ধরে প্রায় ৭০ জন অপরিচিত পুরুষকে দিয়ে ২০০ বারের বেশি ধর্ষণ করিয়েছিলেন। এই অপরাধের পরিকল্পনা করা হয়েছিল ‘উইদাউট হার নলেজ’ নামক একটি অনলাইন চ্যাটরুমে।
পেলিকট মামলার পর ওই ওয়েবসাইট বন্ধ হলেও মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের দীর্ঘ অনুসন্ধানে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার আরও একটি অন্ধকার জগতের খোঁজ মিলেছে, যাকে বলা হচ্ছে অনলাইন ‘রেপ একাডেমি’ বা ধর্ষণের পাঠশালা।
সিএনএনের তথ্য মতে, ‘মাদারলেস ডটকম’ নামক একটি পর্নোগ্রাফি সাইটে ২০ হাজারেরও বেশি ভিডিও রয়েছে, যেগুলোকে ‘স্লিপ কনটেন্ট’ বলা হয়। সেখানে #passedout এবং #eyecheck ট্যাগ ব্যবহার করে ভিডিও আপলোড করা হয়। ‘আইচেক’ ভিডিওগুলোতে পুরুষেরা তাঁদের স্ত্রী বা সঙ্গিনীর চোখের পাতা টেনে তুলে দেখান যে তাঁরা মাদকের প্রভাবে অচেতন কি না। টেলিগ্রামের ‘জেডজেডজেড’ (Zzz) নামক গ্রুপে সঙ্গিনীকে মাদক খাইয়ে অচেতন করার ওষুধের ডোজ সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে সিএনএন পিওতর (Piotr) নামের এক পোলিশ নাগরিকের সন্ধান পায়, যিনি নিজের স্ত্রীকে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও ওই গ্রুপে শেয়ার করতেন। ছদ্মবেশে সিএনএন তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, এই গ্রুপগুলোতে অনেকে নিজ স্ত্রীকে অচেতন করে সেই দৃশ্য লাইভ স্ট্রিমিং করেন এবং প্রতি দর্শকের কাছ থেকে ২০ ডলার ফি নেন। স্পেনের এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তিনি স্বাদহীন ও গন্ধহীন ‘স্লিপিং লিকুইড’ সরবরাহ করেন যা প্রয়োগ করলে ভুক্তভোগী কিছুই মনে রাখতে পারেন না।
ভুক্তভোগী জো ওয়াটস জানান, তাঁর স্বামী দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করেছেন। ২০১৮ সালে তাঁর স্বামী অপরাধ স্বীকার করলে তাঁর ১১ বছরের কারাদণ্ড হয়। আমান্ডা স্ট্যানহোপ নামের আরেক নারী জানান, ৫ বছর ধরে তিনি সকালে শরীরে কালশিটে দাগ নিয়ে জেগে উঠতেন। জিসেল পেলিকটের সাহসে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হন, তবে তাঁর স্বামী বিচারের আগেই আত্মহত্যা করেন। ইতালির ভ্যালেন্টিনা (ছদ্মনাম) ২০ বছর সংসার করার পর স্বামীর কম্পিউটারে নিজের ওপর চলা নির্যাতনের ভিডিও খুঁজে পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলধারার পর্নো সাইটে এসব কনটেন্টের সহজলভ্যতা সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ ক্লেয়ার ম্যাকগ্লিন সরকারের অনীহাকেই এর জন্য দায়ী করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ‘সেফ হারবার’ আইনের কারণে প্ল্যাটফর্মগুলো সরাসরি দায়বদ্ধ থাকে না। ফরাসি সংসদ সদস্য স্যান্ডরিন জোসো একে ‘সহিংসতার পাঠশালা’ বলে অভিহিত করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ড্রাগ ফেসিলিটেটেড সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট (ডিএফএসএ)-এর সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা স্মৃতি মনে না থাকায় অভিযোগ করতে পারেন না। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে অচেতন অবস্থায় যৌন নির্যাতনের হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জিসেল পেলিকটের ভাষ্য অনুযায়ী, লজ্জার ভার এখন ভুক্তভোগীর নয়, বরং অপরাধীর হওয়া উচিত। তবে অনলাইন রেপ একাডেমিগুলোর বিস্তার নারীদের নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
