এই পৃথিবীতে আমাদের সবচেয়ে সুন্দর ও নিরাপদ পরিচয় হলো, আমরা আল্লাহর বান্দা। মানুষকে কিছু না কিছুর দাস হতেই হবে- হয় প্রবৃত্তির, নয়ত কোনো সিস্টেমের। যখন মানুষ বলে “আমি কারুর দাস না। আমি নিজের মত চলি।” তখন কিন্তু সে আসলে নিজের দাস। তাই এইসবের মাঝে যার দাস হওয়াটা “worth”, তিনি হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ আমাদের কেন সৃষ্টি করেছেন?
কারণটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজেই স্পষ্ট ভাবে কুরআনে ব্যাখ্যা করেছেনঃ
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।
(সূরা আয যারিয়াতঃ ৫৬)
তাহলে, এই যে আমাদের অস্তিত্ব, এর উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর ইবাদত করা। ইবাদত আমরা কিভাবে করি? আমরা যেহেতু কেউ আল্লাহ কে দেখিনি, আর কী তাঁকে সন্তুষ্ট করবে আমরা ভেবে ভেবে বের করতে পারবো না- এর সম্পর্কে তাই আমরা জানবো যখন আল্লাহ নিজে আমাদের কিছু জানাবেন। তিনি আমাদের কিভাবে জানাবেন?
কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে। কুরআন, যা কিনা আল্লাহর কালাম। আর হাদীস, যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, করেছেন বা সায় দিয়েছেন। কুরআন ও হাদীস কিভাবে সংরক্ষিত হলো সেটা যদি জানতে চাই, সে অনেক বড় কাহিনী। এখানে নয়। আমার এই লেখা যাদের উদ্দেশ্যে, তারা সবাই আমার মুসলিম বোন- আর তাই কুরআন ও হাদীসে বিশ্বাসী।
তাহলে আমরা জানলাম যে আমরা আল্লাহর ইবাদত করবো, তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করবো, এবং তিনি যেভাবে জানিয়েছেন সেভাবে করবো। তাই না? তাহলে, বোন আমার, আমাদের হিজাব আল্লাহর জন্য, আল্লাহ যেভাবে চান, সেভাবেই হতে হবে, তাই না?
কিন্তু, সেটা কি হয়??
হিজাবের উদ্দেশ্যই তো সৌন্দর্য ঢেকে রাখা। কেবল হাত পা আর শরীরের উপর কাপড় থাকাটা হিজাব না। সেটা তো লজ্জা নিবারণ করা- হিজাব করা না।
বোন আমার, এই যে মানুষের সামনে যাওয়ার সময় তুমি সেভাবেই যাও যেভাবে হিজাব করার আগেও যেতে- খালি মাথায় এক টুকরো কাপড় থাকে- তোমার কি সত্যিই এটাকে হিজাব মনে হয়? মেক আপ, পারফিউম, টাইট কাপড়, সব সৌন্দর্য্য যেন দেখা যায় সেদিকে সতর্ক হয়ে শুধু চুলটা ঢাকাই কি হিজাব? আজকাল তো কপালের উপরের চুল একটু করে বের করে রাখাটাও ফ্যাশন হয়েছে। কেউ কেউ করে- সেই দেখে যারা এতদিন অন্তত এইটুকু করতো না তারাও এখন সামনের চুল দেখায়- এটা কি হিজাব? Seriously? চুল ও দেখানো যাবে?? দেখানো যাবে পা টাখনুর উপর পর্যন্তও? কেন বোন?
হ্যাঁ। হঠাৎ হিজাব করা কষ্ট। কষ্ট জেনেও তো সেটা করার মত ভালো নিয়তটা আমরা নিয়েছি। তাহলে কেন হিজাব দিয়েও হিজাব মুক্ত আগের জীবন আঁকড়ে ধরার চেষ্টা?
বোন, যেই হিজাবে শরীরের শেপ বুঝা যায়, যেই হিজাবে চেহারাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করা হয়, যেই হিজাবে চুড়ি, আংটি, টিকলি, নাকফুল আর অনেক ক্ষেত্রে দুলও প্রকাশ করা হয়- সেটা হিজাব হয় না। হয় না। তুমি নিজেই ভেবে দেখ- সবকিছুই দেখা যাচ্ছে, চুলটা ছাড়া- এটাই হিজাব- এমনটা আমরা কই পেলাম?
আমরা কিন্তু এমনটা পাইনি। বানিয়ে নিয়েছি। নিজেরা না বানাই- অন্য বোনদের দেখে শিখেছি। কিন্তু, কিয়ামতের দিন কি আমরা আল্লাহকে বলতে পারবো, আমরা তাঁদের দেখাদেখি এমনটা করেছি? বলতে পারবো কি, আমাদের জানার উপায় ছিল না? না। পারবো না।
দেখো, আল্লাহ কী সুন্দর করে কুরআনে হিজাবের নির্দেশ দিয়েছেন?
আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীরা, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা- রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র দিকে ফিরে আস, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।
(সূরা আন নূরঃ ৩১)
হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
(সূরা আল আহযাবঃ ৫৯)
(অবশ্যই তাফসীর দেখে নিবেন। বাংলায় হলে ড. আবু বকর যাকারিয়া , ইংরেজিতে হলে শায়খ আস সা’দির)
আর ওলামারা কী বলেন?
তাঁদের মাঝে বেশীর ভাগই বলেন, হাত এবং মুখ ঢাকতে হবে। আর কেউ কেউ যাঁরা বলেন মুখ খোলা রাখা যাবে, তাঁরা সেই সাথে এও বলেন যে, মুখে মেক আপ বা অর্নামেন্টস থাকবে না। এই নিয়ে চাইলে আমরা একটু পড়াশুনা করতে পারি, islamqa.info তে খুঁজলেই হবে। নিদেনপক্ষে আমাদের দেশের নামকরা ওলামাদের জিগ্যেস করলেও হবে।
প্রিয় বোন- হিজাব আমরা যখন সব সাজ প্রকাশ করে দেই- অন্তরে আমরা কিন্তু জানি, তাই না, যে আমরা আসলে আল্লাহর অবাধ্যতাই করছি? কী লাভ আল্লাহকে নারাজ করে? কী লাভ তিনি যেভাবে একটা কাজ করতে বলেছেন, সেভাবে না করে তাঁর নির্দেশের পরিপন্থী কাজটা করে? দ্বীন তো ঠাট্টা মশকরা করার বিষয় না, তাই না? আর যখন বলছি ” আমি আল্লাহর জন্য করি” – তখন ইচ্ছেটাও আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সঁপে দিবো- এমনটা হওয়াটাই তো একজন মুসলিমের জন্য স্বাভাবিক। তাহলে হিজাব নিয়ে যথেচ্চাচার কেন?
এখন তুমি জানতে চাইবে, “তাহলে কি আমার হিজাব হচ্ছে না? আপনি বলে দিলেই হলো?” না বোন। হচ্ছে না ই। আর আমি সেটা জোর দিয়ে কিভাবে বলছি? কারণ ইবাদত আমরা ভেবে নিয়ে করি না, গায়ের জোরে কবুল করাই না, ইমোশন দিয়েও কবুল করাই না। ইবাদতের সীমা আল্লাহর নির্ধারিত। সেটার মাঝে না হলে তো ইবাদত হলো না তাই না? কেউ যদি বলে “আমি রোজা রাখি কিন্তু ইফতার আসরের সময় করবো”- তুমি কি বলবে তার রোজা হয়েছে? তাহলে কেউ যদি বলে আমি চুল বের করে, নিজের শেপ দেখিয়ে হিজাব করবো- আমি কি বলবো না যে তার হিজাব হয়নি??
এখন বলতে পারো, “হিজাবই কি সব? ঠিকমত হিজাব দিয়েও আপনারা কি অন্যায় করেন না?” হ্যাঁ। মানুষ হয়ে জন্মেছি, অন্যায়, ভুল- সবই করি। অন্য কেউ ঠিকমত হিজাব দিয়েও অন্যায় করে বলে কি তুমি জেনে শুনে ভুল ভাবেই হিজাব দিবে?? আরেকজনের ভুলের হিসাব কারুরই দিতে হবে না, কিন্তু নিজেরটা তো দিতে হবে? আল্লাহর সামনে কি এটা বলতে পারবে, “আল্লাহ, ওরা হিজাব দিয়েও আপনার অবাধ্যতা করত। আমি সেই অবাধ্যতাগুলো করিনি।আমি ওদের মত না- আমি তাই হিজাব না দিয়ে আপনার অবাধ্যতা করেছি!” পারবে বলতে? হিজাব যেহেতু একজন মুসলিমাহর জীবনের প্রধান একটি বিষয়- এটা ঠিক করতেই হবে, তাই না? আর রইলো “হিজাবই কি সব?” না। সব না।কিন্তু জানো তো, আমাদের হাতের যে কনিষ্ঠা আঙ্গুল, সেটাও কিন্তু আমাদের জীবনের সব না- আপাতদৃষ্টিতে দেখলে কিছুই না। তাও কিন্তু ওটাকে আমরা কেটে ফেলে দেই না। তাহলে এই যুক্তিতে- হিজবটাই বা কাট ছাট করবো কেন?
আরেকটা বড় সমস্যা কী হয়েছে জানো? তুমি যদি আজকে ফ্যাশন বহাল রেখে হিজাব কর, গুনাহটা কেবল তোমার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তোমাকে দেখে যারা inspired হবে , তাদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ছে। না বুঝেই একজন আরেকজনকে ভুল পথ দেখাচ্ছে। না বুঝেই ভুল পথের সঙ্গী হচ্ছে। এই সঙ্গ আল্লাহর সামনে কি কোনো কাজে আসবে?
বোন আমার, এই ফ্যাশনটা শেষ পর্যন্ত কারা দেখবে বলতে পারো? মাহরামদের সামনে তো হিজাব নেই। নেই মহিলা বা বাচ্চাদের সামনে। দেখবে তাহলে সেই মানুষগুলো যাদেরকে আল্লাহ আমাদের দিকে তাকানোর অধিকারই দেননি। আর আমরা তাদেরকে অধিকার দিয়ে ফেললাম?
সত্যিই, আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। আমরাই নিজেদের টেনে নামাই।
হিজাব কিন্তু একজন মুসলিমাহর আইডেন্টিটি। সেটাকে আমরা মানুষের কাছে হাস্যকর করে তুলে ধরতে পারি না। “আল্লাহর জন্য হিজাব করছি” এই স্টেটমেন্ট এর সাথে “আল্লাহ যেভাবে বলেছেন সেভাবে করছি না”- এটা কিন্তু যায় না।
প্রিয় বোন, একটু ভাবো। কই চলেছি, কী করছি? আমাদের জীবনটা কিন্তু আল্লাহর ইবাদতের জন্য। আর শেষ ঠিকানা আল্লাহর কাছেই। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুতে শেষ পর্যন্ত কিছু আসে যায় না। সেই আল্লাহ যেভাবে আমাদের দেখতে ভালোবাসেন, আমরা কি সেভাবে চলবো না? আমরা মানুষের মাঝে স্বীকৃতি, সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা পেতে চাই। সম্মানের মালিক কে?? অন্যদের হৃদয়ের মালিক কে? আমরা কি বুঝবো না এখনো যে আল্লাহর হাতেই আমাদের সম্মান? তাঁর অবাধ্যতা করে কোন সম্মানের পেছনে ছুটছি আমরা?? আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে যেয়ে কি সম্মান পাওয়া যায়? যেই সম্মান, যেই গ্রহণযোগ্যতা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে আসে, সেটা কি আদৌ আমাদের প্রয়োজন? সেটা যে শেষ পর্যন্ত আমাদের জন্য কোনো ভালো বয়ে আনবে না, এটা বুঝার সময় কি এখনো হয়নি?
না। অবশ্যই সময় হয়েছে। তাওবা করার, নিজেদের বদলে নেয়ার। সময় হয়েছে এখন থেকেই আল্লাহর জন্য, আল্লাহর পথে জীবন অতিবাহিত করার। এতদিন ভুল করেছি বলে এখনো ভুলের ওপর থাকবো না আমরা। এই এখন থেকেই নিজেদের শুধরে নিবো, ইন শা আল্লাহ।
