মুসলিমরা ভারতবর্ষে কখনো আগমন করেছিল সব ধরনের পার্থিব স্বার্থ ও কল্যাণ পেছনে ফেলে শুধু দ্বিনি মিশন নিয়ে। যেন তারা ভারতবাসীর কাছে ইসলামের সৌহার্দ্য ও সুবিচার পৌঁছে দিতে এবং তাদের সংকীর্ণ পৃথিবী থেকে মুক্ত পৃথিবীর দিকে নিয়ে যেতে এবং তাদের শৃঙ্খলা ও বেড়ি থেকে মুক্ত করতে। যেমনটি করেছেন বহু নিঃস্বার্থ ধর্মপ্রাচরকরা। যারা তাদের স্নেহছায়ায় আশ্রয় দিয়েছেন লাখো হতভাগ্য ও অত্যাচারিত মানুষকে। যারা তাদেরকে তাদের মা-বাবা ও সন্তানের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। যেমন—সাইয়েদ আলী হেজুয়ারি (রহ.), শায়খ মুঈনুদ্দিন আজমিরি (রহ.) ও সাইয়েদ আলী বিন শিহাব হামদানি কাশ্মীরি (রহ.) প্রমুখ।
কখনো মুসলিমরা ভারতে প্রবেশ করেছে বিজয়ী বীর ও নির্লোভ শাসক হিসেবে। যেমন—সুলতান মাহমুদ গজনভি, শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরি, জহির উদ্দিন বাবর তৈয়মুরি প্রমুখ। তাঁরাই ছিলেন ‘বৃহত্তর ভারত’ (ত্বেধঃবৎ ওহফরধ)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত তা রক্ষা করেছেন। তারা দেশসেবা করেছেন এবং ভারতবর্ষের জীবনযাত্রার নানা অঙ্গনে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছেন।
তাদের প্রত্যেকে (ইসলাম প্রচারক ও শাসক) ভারতবর্ষকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছেন অথবা ভারতের মাটি ও মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। কেননা তারা বিশ্বাস করতেন, নিশ্চয়ই ভূপৃষ্ঠের মালিক আল্লাহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে এর উত্তরাধিকারী করেন। আল্লাহর মালিকানাধীন ভূখণ্ড ও দেশে মুসলিমদের অধিকার ও অগ্রাধিকার আছে। কেননা তারা আল্লাহর প্রতিনিধি এবং আল্লাহ মুমিনদের পৃথিবীর দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলিমরা এই দেশকে নিজের মাতৃভূমির মতোই দেখতেন। এ জন্য তারা এই দেশকে নিজের আবাস ও শেষ ঠিকানা (কবর) হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তারা এই দেশ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন না। আল্লাহ তাদের যে মেধা, প্রতিভা ও শক্তি-সামর্থ্য দান করেছেন তা দিয়ে তারা ভারতের সেবা করেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন, তারা মানুষের সঙ্গে যেমন আচরণ করবেন, পরকালে তারা তেমন আচরণ পাবেন। তারা ভারতবাসী ও তাদের নিজ গোত্রীয়দের প্রতি সমান সুবিচার করতেন। কেননা তারা নিজেদের এ দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবেই বিবেচনা করতেন। ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকদের সঙ্গে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের পার্থক্য এখানেই। ইউরোপীয়রা এ দেশের ধন-সম্পদ তাদের নিজ দেশে বয়ে নিয়ে গেছে। তারা এই দেশকে বন্য গাভির মতো দোহন করত—দুধ দোহনের আগে যার কাছে থাকা হয় না এবং পরেও তার কোনো খোঁজ রাখা হয় না।
মুসলিমরা যখন ভারতবর্ষে আগমন করে তখন এখানে প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতি, গভীর দর্শন, সূক্ষ্ম গণিতশাস্ত্রের চর্চা হতো। এখানে ছিল ফসল, ফল-ফলাদি ও মূল্যবান খনিজ সম্পদ। সব জ্ঞানগত ও প্রাকৃতিক সম্পদ ভারতে ছিল; কিন্তু দীর্ঘ যুগ ধরে তা বিশ্বসভা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ভারতের একদিকের পাহাড় ও অন্যদিকের সাগর তাকে বিশ্বসভ্যতা থেকে আড়াল করে রেখেছিল। মুসলিমদের আগে সর্বশেষ এ দেশে আগমন হয়েছিল আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের। এভাবেই দীর্ঘকাল পর্যন্ত বিশাল ভারতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের নিয়ে মগ্ন ছিল এবং যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে একটি বৃত্তবদ্ধ জীবন কাটিয়েছে। ফলে তাদের চিন্তা, ধর্ম, আইন, শিল্প ও অন্যান্য জ্ঞানে স্থবিরতা এসে পড়েছিল, তাতে নতুন কোনো কিছু সংযুক্ত হয়নি ভারতের বাহির থেকে এবং নতুন কিছু উদ্ভাবনও করতে পারেনি তারা।
মুসলিমরা যখন ভারতবর্ষে আগমন করেছে, তখন তারা প্রাচ্যের সবচেয়ে; বরং পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর ও সভ্য জাতি। তারা এমন ধর্মের বার্তা নিয়ে এসেছে, যা যৌক্তিক, সহজ ও সহনশীল। তারা উদ্ধার করেছেন ভারতীয় সভ্যতার যেসব উপাদান আড়াল বা বিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তারা ভারতীয়দের সভ্যতা শিখিয়েছেন, তাদের বন্যতা দূর করেছেন। তারা সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তাদের অর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার এবং বিভিন্ন সভ্যতার উত্তরাধিকার, যাতে যুক্ত হয়েছিল আরবের নিষ্কলুষ ধর্মচিন্তা, পারস্যবাসীর শিল্পবোধ, তুর্কিদের উন্নত জীবনবোধ। তারা এসব নিয়ে এসেছিলেন ভারতীয়দের জন্য। যারা এসব সম্পর্কে কোনো দূরতম ধারণাও রাখত না।
সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.) ।
‘আল মুসলিমুনা ফিল হিন্দ’ থেকে মুফতি আবদুল্লাহ নুরের ভাষান্তর
