ইসলামের দৃষ্টিতে মহররম একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাস। কেননা পবিত্র কোরআনে যে চার মাসকে সম্মানিত বলা হয়েছে মহররম তার অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনায় মাসের সংখ্যা ১২টি, যেদিন থেকে তিনি সব আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এ বিষয়ে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার কোরো না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩৬)
তবে মহররমের ১০ তারিখ তথা আশুরা বিষয়ে মুসলিমসমাজে যেসব কথা প্রচলিত আছে তার কিছুসংখ্যকের ভিত্তি থাকলেও বেশির ভাগেরই কোনো ভিত্তি নেই অথবা তা খুব দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিম্নে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো—
১. আশুরার দিন কিয়ামত হবে : প্রচলিত আছে যে আশুরার দিন শুক্রবার কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবে কথাটি সঠিক নয়। এ কথার কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না। কিছু ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে এসব কথা বলা হয়।
২. আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল হয় : কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায় আশুরার দিনেই আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল হয়েছে। এ কথা আবুল কাসিম ইস্পাহানি (রহ.) কর্তৃক সংকলিত ‘আত-তারগিব ওয়াত তারহিব’-এর ১৮৬৮ নম্বর বর্ণনায় এসেছে। কিন্তু এই বর্ণনার সনদ খুবই দুর্বল। এ ছাড়া আরো কিছু বর্ণনায় এই কথা এসেছে, তবে সেগুলো বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
অবশ্য কোনো কোনো তাবেয়ি থেকে এই কথা বর্ণিত হয়েছে যে তাঁরা আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল হওয়া সম্পর্কে আশুরার দিনের কথাই বলতেন। (ইমাম ইবনে রজব, লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা : ১১৩-১১৫; আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ, আল-ইলাল ওয়া মারিফাতির রিজাল, হাদিস : ৩৭৯৫)
৩. নুহ (আ.)-এর নৌকা পাহাড়ে থেমেছিল : আশুরার দিনে নুহ (আ.)-এর নৌকা ‘জুদি’ পাহাড়ে থেমেছিল বলে প্রচলিত আছে। এ কথা মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় এসেছে। কিন্তু তার সনদ ও বর্ণনাসূত্র দুর্বল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮৭১৭)
৪. ঈসা (আ.)-এর জন্ম : আশুরার দিন ঈসা (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল বলে যে কথা প্রচলিত আছে তাও প্রমাণিত নয়। আবুল কাসিম ইস্পাহানি (রহ.)-এর কিতাব ‘আত-তারগিব ওয়াত তারহিব’-এর পূর্বোক্ত বর্ণনাতেই এ কথা এসেছে। যার সনদ খুবই দুর্বল।
৫. মুসা (আ.)-এর মুক্তি : শুধু দুটি বিষয় এমন, যা আশুরার দিন ঘটেছে বলে প্রমাণিত। তা হলো—এক. মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের ফেরাউন ও তার সৈন্যদের থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা, যেখানে দরিয়ায় রাস্তা বানিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁদের নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছেন।
দুই. ওই রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করার সময় ফেরাউন ও তার সৈন্যদের নদীতে ডুবিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল।
এই দুটি ঘটনা বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ হাদিসের বহু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক-এর ‘মুহাররম ও আশুরা : কিছু কথা, কিছু প্রশ্নের উত্তর’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে নেওয়া।
