Thursday, April 16, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeযুগ জিজ্ঞাসাআয়ানদের মৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসাসেবার অব্যবস্থাপনা

আয়ানদের মৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসাসেবার অব্যবস্থাপনা

দেখভাল করার কমিটি আছে, কাজ করছে না চিকিৎসাসেবাকে বাণিজ্য হিসেবে নিচ্ছেন অনেকেআবুল খায়ের

দেশের স্বাস্থ্য সেবায় যে অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে ছয় বছরের শিশু আয়ান জীবন দিয়ে তা প্রমাণ দিলো। রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ৩১ ডিসেম্বর সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে চিকিত্সকদের অসতর্কতা ও গাফিলতির শিকার হয়ে আয়ানের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় দেশবাসী হতবাক হয়েছে, দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। এই সরকারের আমলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চিকিত্সা ব্যবস্থা ব্যাপক ভাবে গড়ে উঠেছে। এগুলো দেখভাল করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অধিদপ্তর, বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়, সিভিল সার্জন কার্যালয়, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তারা রয়েছেন। পাশাপাশি রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যান্ত রয়েছে দেখার জন্য রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মনিটরিং কমিটি। কিন্তু এই কমিটিও কাজ করছে না। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে আলাদা বিভাগ রয়েছে। এতো কিছু থাকার পরও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, মাঠ পর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে অব্যবস্থাপনার যে চিত্র উঠে আসে, তাতে স্পষ্ট হয় যে তারা কোন কাজই করছেন না।

বর্তমান সরকারের আমলে নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ণ এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ইএনটি ইনস্টিটিউট, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে বিশেষায়িত পূর্ণাঙ্গ এমন চিকিত্সা ব্যবস্থা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের রয়েছে এটি। মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জেলা কিংবা কোন কোন উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জেলা-উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোর বেড দ্বিগুণ করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাসহ অবকাঠামো বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সাব সেন্টার রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩৩ ধরনের ওষুধ সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। অর্থাত্ হাতের কাছেই হাসপাতাল রয়েছে। এতো কিছু থাকার পরেও রোগীরা কেন চিকিত্সা সেবা নিয়ে হয়রানি শিকার হবে, দরিদ্র রোগীরা কেন গলাকাটা বাণিজ্যের শিকার হবে। তবে এটি পরিচালনা করার যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে সেটি দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনারই ফল।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মালেক ড্রাইভারের শত কোটি টাকা টাকার মালিক। কেরানী আবজালও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে কয়েকশ কোটি টাকা পাচার করেছেন। সেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র কেমন হবে-সেটা সবার জানা। আবজাল-মালেকরা দুর্নীতি করেছে, সেখানে তারা সিগনেচার করেনি। ফাইল তারা অনুমোদন করে না। এতে প্রমাণিত হয়, তাদের উপরের কর্মকর্তারা যে অবৈধ কত টাকার মালিক। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, চিকিত্সা সেবা ও শিক্ষায় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্র আপোষহীন ভাবে থাকতেই হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের মতে, চিকিত্সকদের নিয়োগ-পদোন্নিততে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকতেই হবে। এ নিয়ে কোন আপোষ করা যাবে না। নইলে আয়ানদের মতো সাধারণ একটা খত্না করতে গিয়েও মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে। কিন্ত এদেশে দলবাজ, লাইনবাজ ও দুর্নীতিবাজ, তদবিরবাজ বেশিরভাগ চিকিত্সকই পদোন্নতি পাচ্ছেন, অধিদপ্তর-হাসপাতালগুলোতে ভালো ভালো জায়গায় তারাই পদায়ন পাচ্ছেন। এদের যেমন সৃষ্টি, তেমন ফল।

অনেক চিকিত্সক বলেছেন, আয়ানের মৃত্যুর জন্য ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সকই দায়ী। যেখানে অতীতে হাজমরা খত্না করতে গিয়েও মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়নি, সেখানে এই আধুনিক যুগে খত্না করতে গিয়ে শিশুর মৃত্যু হবে-এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। এছাড়াও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সার নামে যে গলাকাটা বাণিজ্য হচ্ছে, সেটাও কেউ দেখছে না। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত অগণিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। অনেকের অনুমোদন নেই। আবেদন করেই হাসপাতাল-ক্লিনিক চালু করে দিয়েছে। এই ধরনের অননুমোদিত ক্লিনিক খোদ রাজধানীতেই রয়েছে। এসব ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজন না থাকলেও টাকার লোভে অনভিজ্ঞ জনবল দিয়ে সিজার করে অনেক শিশুর অঙ্গহানীর ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি হাসপাতাল ও  ক্লিনিকে ডেলিভারি করতে গিয়ে মা-শিশু উভয়ই জটিলতা নিয়ে প্রতিদিনই আসছে। এটি হলো নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ে অব্যবস্থাপনার ফল বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। 

র্যাবের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, তিনি প্রায় চার বছর অভিযান চালিয়ে শতাধিক অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার শনাক্ত করেন। যাদের কোন লাইসেন্স নেই। আবার অনেকে লাইসেন্স একবার করলেও নবায়ন করেনি দীর্ঘদিন। অনেক হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার ছিল অব্যবস্থাপনা, ভূয়া ডাক্তার দিয়ে অপারেশন করানো হতো। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টি সেন্টারে ১০ টাকা খরচ হলে রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয় ১০০ টাকা। অনেক হাসপাতাল ভেজাল ওষুধ পান। তার এই অভিযানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও ছিলেন। এসব চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সারোয়ার আলম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছিল। কিন্তু কেউই কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এ কারণে আয়ানদের মৃত্যু এখন নিত্যনৈমিত্রিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক এমিরেটস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত এমপিসহ ২০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ইত্তেফাককে বলেন, খত্না করতে গিয়ে আয়ানের মৃত্যু-চিকিত্সা সেবায় খুবই খারাপ একটি ম্যাসেজ। সংশ্লিষ্ট সকলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ করার তাগিদ দিয়ে তারা বলেন, মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, খত্না করতে গিয়ে শিশু আয়ানের মৃত্যু সবাইকে টনক নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দিয়েছি। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব এনেসথেসিওলজিস্টস্-এর অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, শিশু আয়ানের এজমা ছিল, শরীর দুর্বল ছিল। অপারেশন করার আগে সব কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, শিশু আয়ানের মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। এক্ষেত্রে চিকিত্সায় অবহেলা করা হয়েছে কিনা তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

খতনা করাতে গিয়ে ভুল চিকিত্সায় ছয় বছরের শিশু আয়ানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসা রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুলে অবস্থিত ইউনাইটেড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবন্ধন ছিল না বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নিবন্ধন ছাড়া চিকিত্সা কার্যক্রম পরিচালনা করা অবৈধ। খোদ রাজধানীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাকের ডগায় এই ঘটনা। নিবন্ধন ছাড়াই শিশু আয়ানকে চিকিত্সা দেওয়া এবং পরে শিশুটির মৃত্যুর কারণে ঐ হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, মেডিক্যাল কলেজ অনুমোদন নেওয়ার আগে এক বছর হাসপাতাল চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তাহলে হাসপাতাল অনুমোদন নেই, অথচ মেডিক্যাল কলেজ অনুমোদন পেলো কিভাবে?

আয়ানের বাবা শামীম আহামেদ জানান, আমার ছেলের কোন এজমা ছিল না। মাঝে মাঝে ঠান্ডা লাগতো। ঠান্ডার ওষুধ খেলে ভালো হতো। তার ছেলেকে খত্না করার আগে সাড়ে তিন হাজার টাকার টেস্ট করেছে। পরীক্ষায় তেমন কিছু নেই বলে চিকিত্সক জানান। ১০ হাজার টাকার প্যাকেজে খত্না করার কথা। পরে তাকে ৬ লাখ টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। চিকিত্সার নামে রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এই ধরনের গলাকাটা বাণিজ্য চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’-এই চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু কেউই তা মানে না। আমরা অসহায়। এই ব্যাপারে নীতিনির্ধারক মহলও নিশ্চুপ থাকে। তবে কেউ কেউ বলেন, প্রচলিত আইনেই অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিতে পারে। নিজের দায়িত্ব অন্যের উপর চাপানো ঠিক না।  অধিদপ্তরের সিনিয়র একজন কর্মকর্তা বলেন, চার ক্যাটাগরির বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে পারলে চিকিত্সা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নামে গলাকাটা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। এদিকে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালাল রয়েছে। যারা রোগী ভাগিয়ে নিয়ে কমিশন পায়। এক শ্রেণীর ডাক্তার ৫০ ভাগ কমিশন পান। কেউ কেউ আরো বেশি পান। সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনিস্টক সেন্টারের নিয়োগপ্রাপ্ত দালালরা রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এসব ডাক্তারদের দাপটে হাসপাতাল পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধানরা অসহায়।

ইত্তেফাক/এসটিএম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × five =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য