একই ভাবে চিন্তা করে দেখবেন, আমাদের দেশে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকিং হচ্ছে ইসলামী belief system-এর সাথে কুফফারের worldview-কে সংযোজিত করার একটা হাস্যকর ও করুণ প্রচেষ্টা। এমনিতে হয়তো আক্ষরিক অর্থে সুদের কারবার তারা করছেন না সত্যি – কিন্তু ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গণসাধারণের যে কল্যাণ এবং সুযোগ-সুবিধা বা সম্পদের যে পুনর্বন্টন হবার কথা, তা নিয়ে কেউ ভাবিত বা চিন্তিত বলে তো মনে হয় না। বাংলাদেশের একটি ইসলামী ব্যংক, কেবল একটি শিল্প পরিবারকে ২০০০ কোটি টাকারও বেশী অর্থ-সহায়তা দিয়েছে – যা দিয়ে ঐ সংস্থাটি বাংলাদেশকে হিন্দুস্থানী যানবাহনের একচেটিয়া বাজারে পরিণত করেছে। তাহলে এই ব্যাংকিং-এর দর্শনের সাথে চেজ ম্যানহাটন বা আরভিং ট্রাস্টের তফাৎ রইলো কোথায়? আগে পাকিস্তানের বিত্তশালী ২২ পরিবারের চিন্তায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীদের ঘুম হতো না – এখন দেশে কোটিপতির সংখ্যা কত? এহেন ইসলামী ব্যাংকিং কি ধনী এবং দরিদ্রের মাঝে ব্যবধান কমিয়েছে, না কি কুফফার শ্রেষ্ঠ যুক্তরাষ্ট্রের আদলে, এমন সব বিশাল কর্পোরেট সংস্থা বা conglomerate-এর জন্ম দিতে সাহায্য করছে, যারা ইতোমধ্যেই দেশ বা জাতিকে চোখ রাঙ্গানোর মত ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে (এই তো কিছুদিন আগে, পূর্ববর্তী একটি সরকারের দুর্নীতির অংশীদার এক শিল্পপতি, বাংলাদেশকে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপের ভয় দেখিয়ে সীমাহীন ধৃষ্টতার পরিচয় দিলেন)। দ্বিতীয়ত ঐ ব্যাংকের “ইসলামী মুরুব্বীরা” যখন গুজরাটে মুসলিম হত্যাযজ্ঞের পরে হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন, সেটারই বা কি অর্থ রইলো – সেটাতো, যে কোন যুক্তিতে, কূম্ভিরাশ্রু বলেই মনে হবার কথা। না কি তারাও, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর তাগুত শাসকরা যেভাবে লোক দেখাতে, ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে থাকেন, সেভাবেই তাদের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের দেখাতে হিন্দুস্থানে মুসলিম হত্যার বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদ জ্ঞাপন’ ‘প্রতিবাদ জ্ঞাপন’ খেলা খেলে থাকেন – অথচ, মনে মনে ভাবেন যে, হিন্দুস্থানের সাথে সুসম্পর্ক না থাকলে তো তাদের ‘তিজারাহ্’ মাঠে মারা যাবে??
এই পর্বে বলার জন্য আমার আরো কিছু কথা মনে আসছে – আপনি ভেবে দেখুন অন্য সব বাদ দিলেও, এমনকি উপাসনার ক্ষেত্রেও কিভাবে আমাদের worldview বদলে গেছে এবং যাচ্ছে। আমাদের দ্বীন আমাদের কাছে সমষ্টিগত সামাজিকতা (collectivism) দাবী করে – সুতরাং, জীবনের অন্য সব কিছুর মতই আমাদের উপাসনাতেও collectivism প্রতিফলিত হবার কথা – যেমন জামাতে মসজিদে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে হয়ে থাকে। কিন্তু এখানেও পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে এবং ইসলামী belief system-এর সাথে কুফফারের worldview এসে মিশেছে। দেশের প্রায় আড়াই লক্ষ মসজিদের মাঝে, হয়তো হাতে গোণা ২৫টির মত মসজিদে জামাতে দাঁড়ানোর সময়, পায়ে পা লাগিয়ে এবং কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে ফাঁক বন্ধ করে দাঁড়ানো হয় – যেমনটা রাসূল(সা.) আমাদের দাঁড়াতে বলেছেন এবং যা নিশ্চিত করা ইমামের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বাকী মসজিদগুলোতে পাশাপাশি দাঁড়ানো দুইজন মুসল্লির মাঝে ৬ ইঞ্চি থেকে ১ ফুটের মাঝে বিভিন্ন মাপের ফাঁক দেখতে পাবেন আপনি – যা আমাদের হৃদয়ের অমিলের পরিচায়ক । আপনি যদি সেই ব্যবধান কমিয়ে আনতে কারো গা ঘেঁষে দাঁড়ান, তবে তিনি যে আপনার দিকে বিরক্তি ভরে তাকাবেন তা ৯৫% ক্ষেত্রে নিশ্চিত! উপরন্তু, আমরা অনেকেই একখানা জায়নামাজ নিয়ে যখন মসজিদে যাই, সেই জায়নামাজে অন্য কেউ দাঁড়ানোটা অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পছন্দ করি না – বিশেষত তা যদি দামী কোন উৎসের হয়। আমাদের worldview-এ যেমন collectivism থাকার কথা, কুফফারের worldview-এ তেমন individualism বা ‘যার-যার-তার-তার’ মানসিকতা রয়েছে। অথচ, আজ আমদের belief system-এর সাথে কুফফারের worldview মিশে গেছে। আমরা নামাজে আলগা আলগা ভাবে দাঁড়াতে পছন্দ করি – আমরা মসজিদে কুশল বিনিময় করি না – অন্য কোন মুসলিম ভাইয়ের সমস্যা সমষ্টিগতভাবে সমাধানের কোন চেষ্টা করি না । সবাই ‘যার-যার-তার-তার’ মত ‘একা একা’ ‘জামাতে’ নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরি!!
কি জানি আমাদের দেশে ইসলামের ধারক, বাহক বা অভিভাবক যারা – যারা নিজেদের ইসলামপন্থী বলতে পছন্দ করেন – তারা হয়তো পথ চেয়ে আছেন ইমাম মাহদীর আগমনের জন্য, যখন তিনি এসে তাদের বর্তমান দুরবস্থা থেকে উদ্ধার করবেন – অথবা – তারা হয়তো মনে করেন যে, ইসলামী worldview আজ আর চলবার কথা নয়। আমরা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের উপর বক্তৃতা করে মুখে ফেনা তুলে ঘরে ফিরে যখন ‘ফ্রেন্ডস’ বা ‘বিগ ব্রাদার শো’ দেখতে অথবা হিন্দুস্থানী রূপ ব্যবসায়ের সর্ব সাম্প্রতিক সংযোজন দেখতে আমাদের টিভি ‘অন’ করবো, তখন যেন একবার ভেবে দেখি যে, আমার ঐ বক্তৃতায় আসলে আমি নিজেই বিশ্বাস করি কিনা। এভাবে জীবনের ছোট বড় সব ঐচ্ছিক সিদ্ধান্তের বেলায় ভাবতে হবে যে, আমার ইচ্ছাটায় কি ইসলামী worldview প্রতিফলিত হলো, না কাফির worldview প্রতিফলিত হলো।
ইসলামী ‘আকীদা বা belief system-এর আওতাভুক্ত যে সব বিশ্বাস রয়েছে, তার কোন একটিতে আস্থা না থাকলে আমরা কাউকে পরিপূর্ণ মুসলিম বা মু’মিন বলতে পারবো না – বরং তাদের আদৌ মুসলিম বলা যায় কিনা তা নিয়ে মুফতিদের মতামত জিজ্ঞেস করতে হবে। এছাড়া আমরা আবারো স্মরণ করতে চাই যে, ইসলামের জীবনব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ মনে করা ঈমানের একটা মৌলিক দাবী । উদাহরণ স্বরূপ আপনি যদি ‘মনে করেন’ যে, আল্লাহর আইন বা শরীয়াহর বিধি-বিধানের ৯৯% এখনো প্রযোজ্য, কিন্তু ১% এখন আর প্রযোজ্য নয় বরং তার পরিবর্তে বৃটিশ আইন, সুইস্ আইন বা অন্য যে কোন ‘কাফির আইন’ শ্রেয় – তাহলে আপনি টেকনিক্যালি ইসলামের সীমানার বাইরে চলে গেলেন। এখানে ‘মনে করেন’ শব্দ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ – কারণ আমরা সবাই আজ তাগুতের প্রচলিত আইনের অধীনে ‘নাগরিক’ এবং সে আইন মেনে চলতে আমরা অনেক ক্ষেত্রে একপ্রকার ‘বাধ্য’। কিন্তু বাধ্য-বাধকতার এই দুর্দশার মাঝেও, আমাদের হৃদয়ে এই বিশ্বাস অবশ্যই থাকতে হবে যে, আল্লাহর আইনই মুসলিমদের জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য আইন এবং মানুষকে শাসন করার অধিকার রয়েছে একমাত্র আল্লাহর। মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব বা মানুষের মনগড়া শাসন কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটুকু থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, ইসলামী belief system সংকোচন, সম্প্রসারণ, পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করার কোন অবকাশ নেই – যারাই এই belief system-কে বিকৃত করার চেষ্টা করবেন, তারা সেই বিকৃত ‘আকীদা নিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবেন – যেমনটা বেরিয়ে গেছেন বাহাইরা বা কাদিয়ানীরা।
আমাদের বুঝতে হবে যে, রাসূল(সা.)-এঁর মৃত্যুর আগেই যেহেতু ইসলামী belief system-এর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা worldview পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেছে, সেহেতু আজ তা আর নতুন ভাবে নাযিল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। আমরা অনেকেই যেমন নিজ দায়িত্ব পালন না করে ইমাম মাহদীর আগমনের অপেক্ষায় বসে আছি এই ভেবে যে, তিনি এসে আমাদের ত্রাণ করবেন, তেমনি যদি আমরা ইসলামী worldview-এর অপেক্ষায়ও বসে থাকি, তবে তা আমাদের কাছে কোনদিনও আসবে না – বরং আমাদেরই নিজেদের টেনে নিয়ে যেতে হবে সেই worldview-এর কাছে। কু্ফর যেমন ইসলামের anti-thesis, তেমনি পশ্চিমা worldview হচ্ছে, ইসলামী worldview-এর anti-thesis। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ ঘোষণায় প্রথমে যেমন বাকী সব উপাস্যকে অস্বীকার করে তবে আল্লাহকে উপাস্য বলে ঘোষণা দেয়া হয়, তেমনি আমরা যদি ইসলামের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখি, তবে বাকী সকল worldview-কে জীবন থেকে বের করে, তবে আমাদের মানসে ইসলামী worldview প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে, ৭ম শতাব্দীর সোনালী যুগের পর থেকে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার বহু ভ্রান্ত প্রচেষ্টার মতই, আমাদের সকল প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়বে।
আমার বক্তব্য প্রায় শেষ। আমি আপনাদের অনেক দুঃসংবাদ দিলাম – অনেক প্রচ্ছন্ন দুঃস্বপ্ন সম্বন্ধে অবহিত করলাম। টুপি ও দাড়ির মুখোশের আড়ালে, আমাদের সত্যিকার চেহারা কি তা দেখিয়ে দিতে, আমি হয়তো অনেকের জন্য mirror বা আয়না হিসেবেও কাজ করলাম। কিন্তু একটা ব্যাপারে নিশ্চিত থাকবেন, আমার সব প্রচেষ্টা হচ্ছে as an insider – (সারা বিশ্বের বা) আমাদের দেশের কুফফার বা তাদের চামচা নাস্তিক/মুরতাদ চক্র যখন মুসলিমদের উপর – বিশেষত পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট মুসলিম ও মু’মিনদের উপর চড়াও হয় – তখন আমি পুলকিত বোধ করি না। তাদের – অর্থাৎ নিজেদের যারা মুসলিম ও মু’মিন ভাবতে ভালোবাসেন, আমার সে সব ভাইদের – কষ্টে আমার হৃদয়ে তাদের জন্য রক্তরণ হয়। অথচ, তাদের কথায়, কাজে বা কর্মে যখন স্ববিরোধিতা দেখি, তখন আমার ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে তাদের ঘোর কাটিয়ে দিই – তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিই: পৃথিবীর যে life-style তারা আকাঙ্খা করছেন এবং অবলম্বন করতে চাইছেন, সেই পথ ধরে কোন দিনই – তারা যে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কথা বলে বেড়ান – সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন না। আসলে একটা belief system-এর উপর ভিত্তি করেই যদি worldview গঠিত হয় – অথবা, “যেমন ‘আকীদা (বা belief system) তেমন worldview”, এই কথাটা যদি সত্যি হয়, তবে বর্তমানে আমাদের ‘আকীদার অবস্থা কি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি আশাবাদী, তাই, ‘যে কারো কর্মই তার ঈমানের নির্ণায়ক বা সূচক’ – এই সূত্রটা অনুযায়ী আমাদের ঈমানী স্ট্যাটাস যা হবার কথা, সেটা আমি উচ্চারণ করলাম না। বরং এই পর্যায়ে নিজেকে এবং অন্য সকল মুসলিম পরিচয়ধারী ইসলামপন্থীকে মু’মিন বলেই ধরে নিলাম – ধরে নিলাম যে, আমাদের অবস্থা আসলে ‘হাল-ভেঙ্গে-দিশা-হারানো-নাবিক’ বলতে যা বোঝায় তেমন। আমরা জানি আমাদের গন্তব্য কি, তবু একটা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আমরা দিশা হারিয়েছি – প্রাণপণ চেষ্টায় সেই ভাঙ্গা হাল মেরামত করতে পারলে, আমরা হয়তো আবার আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর আশা করতে পারি। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানমতে সেই মেরামত কর্মের পদক্ষেপগুলি কি হতে পারে, আসুন আপনাদেরকে তা বলি:
১) আমরা যখন বাজারের লিস্ট তৈরী করি, তখন চাল ও মাছের মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোকে প্রথমে লিখি, আর নীচের দিকে অনেক কষ্টে মনে করে করে ধনিয়ার পাতা বা মেথির মত কম গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর নাম লিখি। আমাদের জীবনের লিস্টে বর্তমানে আল্লাহ্ যদি নীচের দিকে থেকে থাকেন(নাউযুবিল্লাহ্), তবে আসুন তাঁকে আমরা ১ নম্বরে নিয়ে আসি – আমাদের জীবনে তাঁকে সব কিছুর উপরে স্থান দিই – সবচেয়ে বেশী priority দিই। আমরা, আমাদেরকে সৃষ্টি করার একমাত্র উদ্দেশ্যটা মনে রাখতে চেষ্টা করি – যেমনটা আল্লাহ্ আমাদের কুর’আনে মনে করিয়ে দিয়েছেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“জ্বিন ও মানুষকে আমি শুধু এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব করবে।” (কুরআন, সূরা আয যারিয়াত, ৫১:৫৬)
২) আমাদের যাদের জীবন, এ যাবত অর্থের পেছনে অর্থহীন ছুটোছুটিতে কেটে গিয়েছে – সেই জীবনকে আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে চেয়ে, সুসংহত করার লক্ষ্যে, দ্বীন শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আসুন, আমরা ভাষা হিসেবে কুর’আনিক আরবী শিখতে চেষ্টা করি। সত্যিই যদি আল্লাহকে আমরা ১ নম্বর priority দিয়ে থাকি, তবে অতি অবশ্যই আমরা তাঁর কথা মনে করে এ কাজের জন্য সময় বের করতে পারবো ইনশা’আল্লাহ্!
৩)আমাদের প্রতিটি সন্তানকে, তাদের জীবনের প্রারম্ভে, আমরা ভাষা হিসেবে কুর’আনিক (বা ক্লাসিক্যাল) আরবী শিক্ষা দিতে চেষ্টা করবো ইনশা’আল্লাহ্। আমরা যে কুর’আন বুঝি না, এটা তাগুত ও কুফফারের কাছে অত্যন্ত স্বস্তির একটা বিষয়* । আজ তাই তাগুত শাসিত পৃথিবীর সব মুসলিম মানচিত্রের রেডিও ও টিভিতে কুর’আন তেলাওয়াত হয় নির্দ্বিধায় – এমনকি ইসরাইলের জাতীয় রেডিও থেকেও নাকি কুর’আন তেলাওয়াত সম্প্রচারিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আজকালকার আরবদের সিংহভাগই কুর’আনের ভাষা বোঝেন না – তারা ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক dialect-এ কথা বলেন। কোন জনগোষ্ঠীকে তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার সবচেয়ে প্রাথমিক, কার্যকর ও দ্রততম উপায় হচ্ছে তাকে তার “ভাষা” থেকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা যদি কুর’আনিক worldview-তে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তবে সর্বাগ্রে কুর’আনিক আরবীকে আমাদের জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। টাকার জন্য কুফফারের দাসত্ব করতে বা ‘সিলিকন ভ্যালীতে’ একটা চাকুরী করতে যাবার যোগ্যতা অর্জন করতে, আমরা যদি ‘চোস্ত’ ইংরেজী শিখতে পারি – তবে সত্যিকার অর্থে এই বিশ্ব-চরাচরের একমাত্র প্রভু আল্লাহর কিতাব বোঝার জন্য, আমরা নিশ্চয়ই মাতৃভাষার পাশাপাশি ২য় ভাষা হিসেবে আরবী শিখতে পারবো ইনশাল্লাহ্!
৪)আমাদের বর্তমান দুরবস্থার ভয়াবহতা অনুধাবন করলেও, আজ আমরা অনেকেই তা থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ পাচ্ছি না। এই দিশেহারা অবস্থার মূল কারণ হচ্ছে: আমাদের দেশে, বিশুদ্ধ দ্বীনের শিক্ষা দান করার মত শিক্ষক নেই বললেই চলে(থাকলেও আমি হয়তো জানি না) – বরং, নববর্ষের বেহায়াপনা থেকে শুরু করে, হিন্দুস্থানী মূর্তির [Indian idol কথাটার আক্ষরিক অর্থ তাই দাঁড়ায়। আমাদের কি করুণ অবস্থা – পূজা করার মত নিজ দেশীয় মূর্তিও নেই!!(নাউযুবিল্লাহ্)। ] প্রদর্শনী – এসব কিছুকেই জায়েজ করে দেবার মত, বা নিদেন পক্ষে ‘চলছে তো চলুক’ বলে দেখেও না দেখার ভান করে চুপ থাকার মত ‘হজুর’ রয়েছেন অগণিত। তাই, বিশেষত, আমাদের শিশু সন্তানদের স্বচ্ছ ও আনকোরা মগজ এদের হাতে তুলে দেয়া যে বিপজ্জনক – তা হয়তো ‘ইখলাস’ সম্পন্ন সকল বাবা-মাই বুঝবেন। আমরা তাহলে কি করতে পারি? প্রথমে, শিক্ষক তৈরী করার লক্ষ্য সামনে রেখে – পারিবারিক পর্যায়ে যারা সচ্ছল, তারা তাদের উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের সন্তানদের মাঝে, মেধার দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ যারা – তাদের সৌদী আরব, ইয়েমেন বা সিরিয়ায় দ্বীন শিক্ষার জন্য পাঠাতে পারেন – তা না হলে অন্তত এদেশেও যে ২/১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে Islamic Studies and D`awah-র মত স্নাতক(সম্মান) কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও তাদের পাঠানো যেতে পারে। এধরনের একটা প্রচেষ্টা সামাজিক পর্যায়ে সংঘবদ্ধভাবে গ্রহণ করলে, সব দিক থেকেই তা অনেক সহজ হতে পারে। ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এককভাবে বা অন্যদের সাথে মিলে মিশে মেধাবী ছেলেদের একটা ‘পুল’ তৈরী করতে পারেন (ধারণাটা আমি একটি মুখ্য ইসলামপন্থী সংগঠনের মুরুব্বিদের কাছে অনেক আগেই পেশ করেছিলাম – কিন্তু তারা তার কোন গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন বলে মনে হয় না)। তারা এই সব ছেলেদের সংসারের অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দেবার অঙ্গীকার করবেন – এবং এরা দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ফিরে এসে নির্দলীয় ও খাঁটি দ্বীন শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে, শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের ছেলে-মেয়েদের আরবী ভাষা সহ দ্বীন শিক্ষা দেবে – সুন্দর, ইসলামের জন্য অনুকূল ও সব মুসলিমের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশে। ইনশাল্লাহ্ ভাষাসহ দুটো প্রজন্মও যদি দ্বীন শিখতে পারে তবে – কুফফারের ষড়যন্ত্রে দ্বীন ও দুনিয়ার শিক্ষাকে আলাদা করার পর এবং আরবী ভাষা থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করার পর, গত প্রায় আড়াইশো বছরে যে অগ্রগতি হয়নি – ২০ বছরেই তা হওয়া সম্ভব। তার মানে এই নয় যে, আমরা আমাদের সন্তানদের সকলকে ইসলামজীবী ‘মোল্লা-মৌলবী’ বানাতে চাইছি। আমাদের প্রাথমিক টার্গেট হবে, কারিকুলাম বদলানোর অবস্থানে যাবার আগ পর্যন্ত, প্রাথমিক স্কুল লেভেলের ছেলে-মেয়েদের মগজে শক্তভাবে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান প্রোথিত করে, তবে তাদের মাধ্যমিক স্কুলে পাঠানো। মাধ্যমিক স্কুলগুলো যেন কিশোর কিশোরীদের, কুফফারের worldview থেকে মুক্ত একটা পরিবেশ দিতে পারে – সে দিকে বিশেষ সতর্ক মনোযোগ দিতে হবে। বলাবাহুল্য যে, যে সব পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে ‘ইসলামী belief system-এর সাথে ইসলামী worldview সমেত’ পূর্ণ মুসলিম ও মু’মিন হিসেবে গড়ে তুলতে চান – তারা নিশ্চয়ই যে সব স্কুলে কুফফারের অনুকরণে Halloween, New year’s day বা father’s day-র মত কুফরি কালচার থেকে আগত অনুষ্ঠানাদি পালিত হয় – সে সব স্কুলে তাদের পড়তে পাঠাবেন না!? ঐ ধরনের পরিত্যাজ্য স্কুলের তালিকায় বলতে গেলে সকল ইংরেজী মিডিয়াম স্কুলই এসে যাবে।
Footnote*:
এক কালের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোন নাকি পার্লামেন্টে বলেছিলেন: “As long as the Quran exists, Europe will never be able to conquer the Islamic East.” । আলজেরিয়ায় নিয়োজিত জনৈক ফরাসী ঔপনিবেশিক গভর্নর, সেখানে ফরাসী উপনিবেশের শতবর্ষপুর্তি উপলে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন: It is a must to remove the Arabic Quran and to remove the Arabic language from their tongues in order for us to have victory over them. দেখুন:page#47, How to Approach and Understand the Quran – Jamaal al-Din M. Zarabozo.
