উম্মাহর বর্তমান দুর্দশা এবং বিজয় না পাওয়ার পেছনের কারণ কী? ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহি. উম্মাহর বিজয়ের মূলনীতি নিয়ে তার লেখা ‘আল জাওয়াবুল কাফি’ গ্রন্থে কিছু আলোচনা করেছেন।
মূলনীতিগুলোর মধ্যে একটি হলো, সফলতা বা বিজয়ের পরিমাণ ঈমানের সমানুপাতিক।
কুরআন-সুন্নাহতেও আমরা এই মূলনীতির বিষয়ে জানতে পারি।
যেমনটি আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَاَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ۟
আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, আর তোমরাই বিজয়ী যদি মুমিন হয়ে থাক।
[আল-ই-ইমরান : ১৩৯]
اِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْا فِی الْحَیٰوةِ الدُّنْیَا وَیَوْمَ یَقُوْمُ الْاَشْهَادُ۟ۙ
নিশ্চয় আমি আমার রাসূল ও যারা ঈমান এনেছে, তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দন্ডায়মান হবে সেদিন সাহায্য করব। [আল-গাফির : ৫১]
…..আর আল্লাহ্ মুমিনদের ওয়ালী (অভিভাবক ও রক্ষক)।” [ আল ই ‘ইমরান :৬৮]
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তিনি তাদের ভয়-ভীতি শান্তি-নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা আমারই ইবাদাত করবে, আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর এরপর যারা কুফরী করবে তারাই ফাসিক।
[আন-নূর : 55]
অর্থাৎ উম্মাহর মাঝে সময়ে সময়ে বিপর্যয়, পরাজয় ও সংকট নেমে আসবে। এই বিপর্যয়ের কারণও উম্মাহর ঈমান, তাকওয়া এবং তাওয়াক্কুলের জায়গায় ঘাটতি। আল্লাহর দ্বীন এবং আখিরাতের ব্যাপারে গাফিল হয়ে দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া।
উম্মাহ যখন পুনরায় ঈমানকে পরিশুদ্ধ করে নেবে, অন্তত উম্মাহর বিজয়ের জন্য যারা কাজ করবে, তারা তাদের ঈমান, ইয়াকীন ও তাওহীদে পরিশুদ্ধি আনবে – আল্লাহ তাদের বিজয় দেবেন, ইন শা আল্লাহ।
ইমাম মালিক রাহি. বলেন,
“এই উম্মতের শেষ অংশ তখনই সফল হবে, যখন তারা সেই পথ অবলম্বন করবে, যার ওপর ছিল এই উম্মতের প্রথম অংশ।”
ঈমান বলতে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহর বুঝ হলো, তা বাড়ে এবং কমে। হাদিস অনুসারে ঈমানের একাধিক স্তর আছে। যেখানে এক হাদিস থেকে আমরা পাই, গুনাহের কাজে হাত দিয়ে প্রতিরোধ করা হলো সর্বোচ্চ ঈমানের লক্ষণ। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে হারামের বিরুদ্ধে মৌখিক প্রতিবাদ। আর শেষ স্তর হচ্ছে, এসব অন্যায়কে মিনিমাম অন্তর থেকে ঘৃণা করা। অন্য হাদিসে ঈমানের ৭০ টি স্তরের কথাও আছে। অর্থাৎ ঈমানের সাথে নেক আমল তথা শরীয়াহর সীমারেখা মেনে চলার এক যোগসূত্র আছে।
অথচ আমরা যদি আজকের বাস্তবতার দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব যে – একদিকে উম্মাহর অধিকাংশই ঈমানের ব্যাপারে উদাসীন, আল্লাহর শরীয়তের সীমারেখা ভুলে আখিরাতের ব্যাপারে গাফিল হয়ে দুনিয়ার ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে আছে। আরেকদিকে ইকামতে দ্বীনের কর্মীরা দুনিয়াবি হিসাব-নিকাশ ও রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে তাওহীদের ব্যাপারে আপসকামী হয়ে, শরীয়তের সীমারেখা লঙ্ঘন করছে, হাক্কুল্লাহর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যাচ্ছে। অথচ তারা নিজেদের ইকামতে দ্বীনের কর্মী দাবি করেন।
আমরা নিজেদের গুনাহের পাল্লা ভারি করে, হারাম এবং কুফরের মধ্যে নিজেকে লিপ্ত করে ভাবছি – এভাবেই কেবল তত্ত্ব আর কৌশল খাটিয়ে বিজয় অর্জন করে ফেলা সম্ভব। অথচ বাস্তবে মুমিনদের জন্য কৌশল, রোডম্যাপ, স্ট্র্যাটেজি কেবল তখনই ফলদায়ক, যখন তার সাথে ঈমান এবং শরীয়তের সংযোগ থাকে। কিন্তু শরীয়তের সীমারেখা অতিক্রম করে শুধু বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করলে উম্মাহ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে যেতে পারবে না।
কারণ আমরা বনি ইসরাঈল বা ইয়াহুদী না; যারা কেবল নিজেদের অহংকার, চতুরতা বা ঠকবাজি দিয়ে দুনিয়ায় কর্তৃত্ব অর্জন করতে চেয়েছিল। ফলত তারা অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে। প্রকৃত দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে কাফিরে পরিণত হয়েছে।
বিজয়ের জন্য আমাদের বাস্তবতার বুঝ, দুর্দান্ত কৌশল, দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ – সবকিছুই লাগবে। তবে তার সাথে তাওহীদ ও ঈমানের পরিশুদ্ধি না থাকলে সফলতা আসবে না।
ওআল্লাহু আ’লাম।
