কবীরা গুনাহকারীদের বিষয়টি এমন একটি মাসআলা যা নিয়ে সাহাবায়ে কিরামের পরে কিছু মানুষের মাঝে মতভেদ হয়েছিল। বরং অনেক আলেম গুনাহের কারণে কাফের বলার বিষয়টি উম্মতের মাঝে সংঘটিত প্রথম বিদ‘আতও বলেছেন। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৩/৩১] ইবন কাসীর বলেন, তখন খারেজীদের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গিয়েছিল, তারা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর বিরোধিতা করছিল এমনকি সরাসরি কাফেরও বলছিল। [ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১০/৫৭৭] মুহাক্কিকগণ একমত যে খারেজীরা প্রথম আলী, উসমান, জামালের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, যুদ্ধের মীমাংসাকারী পক্ষদ্বয়, আর যারা মীমাংসায় রাযী হয়েছিল তাদের সকলকে কাফির ঘোষণা করেছিল। [আল-আশ‘আরী, মাক্বালাতুল ইসলামিয়্যীন, ১/১৬৭; বাগদাদী, আল-ফারক্বু বাইনাল ফিরাক্ব পৃ. ৭৩; আসফারায়ীনী, আত-তাবসীর ফিদ দীন পৃ. ৪৫]
তাদের বিপরীতে বের হয়েছিল মুরজিয়া সম্প্রদায়, যারা খারেজী বিদ‘আতকে আরেক বিদ‘আত দিয়ে মুকাবিলা করে। তারা বলতে থাকে গোনাহর কোনো প্রভাব ঈমানে পড়ে না। তারা আমলকে ঈমানের অধীন বলাও অস্বীকার করে। [শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৩/৩৮] তাদের অভ্যুদয় ঘটেছিল সাহাবায়ে কিরামের যুগের শেষের দিকে। [শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৭/৩১১, ১৩/৩৪, ১০/৩৪৭]
উম্মতের সালাফে সালেহীন একদিকে খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, অপরদিকে মুরজিয়াদের রদ্দ করেছেন। আবার কাদারিয়্যাহ ও জাবরিয়াদের বিরুদ্ধে প্রতিরোাধ গড়ে তুললেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইবন আব্বাস, ইবন উমার, জাবের, ওয়াসিলা ইবনুল আসকা‘ প্রমুখ। সালাফে সালেহীন মুরজিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে দাঁড়ালেন যখন তারা আমলকে ঈমান থেকে বের করে দিল এবং বললো যে, সব মানুষ ঈমানের ব্যাপারে সমান। [মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১০/৩৫৭]
এরপর মু‘তাযিলাদের ফিতনা আসলো, যারা ঈমান ও কুফরের দু স্থানের মাঝে একটি স্থান আবিষ্কার করলো। যা হাসান বসরীর যুগে প্রথম বলেছিল ওয়াসিল ইবন আতা। [মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৭/৫৫৫]
মোটকথা: কবীরাগুনাহকারীর বিধান নিয়ে ফির্কাবন্দীর প্রথম থেকেই একদল ভুল পথে ছিল। তাই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে। আমর এখানে কেবল আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা বর্ণনা করবো:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মত:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করে যে, ঈমান হচ্ছে কথা ও কাজের নাম। সে কথা দু’ প্রকার অন্তরের কথা ও মুখের কথা। আর কাজ তিন প্রকার, মুখের কাজ, অন্তরের কাজ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ। সুতরাং ঈমান বাড়ে ও কমে। গুনাহের কারণে ঈমান কমে যায়, আর আনুগত্যের কারণে ঈমান বেড়ে যায়। বড় কুফরী, বড় শির্ক ও বড় নিফাক ব্যতীত অন্য কোনো গুনাহের কারণে কারও ঈমান চলে যায় না।
[আজুররী, আশ-শরীআহ ২/৬১১; ইসমা‘ঈলী, ই‘তিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ পৃ. ৩৯; লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ৫/৮৮৬, ৮৮৭]
আর যেহেতু আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট ঈমান ভগ্নাংশ হয়, অংশ বিশেষ হয়, কারণ এর রয়েছে অনেক শাখা, যা হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী সত্তরের উপরে বা ষাটের উপরে, সেহেতু তার কোনো অংশ চলে গেলেও অপর অংশ থেকে যায়। ইমাম ইবন হাজার বলেন, অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত কথা ও কাজ ২৪টি। জিহ্বার সাথে সংশ্লিষ্ট কথা ও কাজ সাতটি। আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজের সংখ্যা ৩৮ টি। এসব মিলে সংখ্যা ৬৯ দাঁড়ায়। যা আরও বিস্তারিত আলোচনা করলে ৭৯ পর্যন্ত পৌঁছবে। [ইবন হাজার, ফাতহুল বারী ১/৫২]
আর জানা কথা যে, যে জিনিস এর অনেক অংশ রয়েছে তা দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায় না। তাই কবীরা গুনাহকারীকে সকল গুনাহের কারণে কাফের যেমন বলা যাবে না, তেমনি তাকে পূর্ণ ঈমানদারও বলা যাবে না। তবে মনে রাখতেই হবে ঈমানের এসব অঙ্গ কখনো এক পর্যায়ের নয়। কোনোটি চলে গেলে মূল ঈমান চলে যায়, আর কোনোটি চলে গেলে পূর্ণ ঈমান চলে যায়। [ইবনুল কাইয়্যেম, কিতাবুস সালাত ওয়া হুকমু তারিকিহা পৃ. ৩৪]
কবীরা গুনাহকারীর দুনিয়াবী বিধানের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অবস্থান:
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আলেমগণ বলেন, দুনিয়ার দৃষ্টিতে এদেরকে ফাসিক মুসলিম বলা হবে, গুনাহের কারণে দীনে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবার ঘোষণা দেয়া হবে না, তবে তাকে পূর্ণ ঈমানদারও বলা যাবে না। বরং সে ঈমানের কারণে মুমিন, আর কবীরা গুনাহের কারণে ফাসেক। [ইবন আবিল ইয্য এর ব্যাখ্যাসহ আকীদা তাহাওয়িয়্যাহ পৃ. ৪৩২; ইবন আবি যাইদ আল-ক্বাইরোয়ানী, পৃ. ৬০; ইবন বাত্তাহ, আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ পৃ. ২৬৫, সাবূনী, আকীদাতুস সালাফ, আসহাবুল হাদীস পৃ. ২৭৬; ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ৩/১৫১; ইবন আবিল ইয্য, শারহুত তাহাওয়িয়্যাহ পৃ. ৪৪২]
সুতরাং দুনিয়ার জীবনে সে জান ও মালের নিরাপত্তা পাবে, তার সাথে মুসলিমদের মত লেনদেন, বিয়ে শাদী ইত্যাদি করা হবে। মীরাস, যবাই, হুদুদ ইত্যাদি মুসলিমদের মতই হবে। তবে কারও কারও মতে তাকে মুসলিম বলা হবে মুমিন বলা হবে না, অপর কারও মতে, তাকে অপূর্ণাঙ্গ মুমিন বলা যাবে। আবার কারও কারও মতে, তাকে ঈমানদারও বলা যাবে। [শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৭/৩৫৪]
আর কবীরা গুনাহকারীর আখেরাতের বিধানের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অবস্থান:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করে যে, কবীরা গুনাহকারী আখেরাতে আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছার অধীন, তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিবেন, যা তার ইনসাফের দাবী, অথবা তাকে তিনি ক্ষমা করবেন, যা তার রহমত ও দয়ার দাবী। [ত্বাহাওয়ী, ইবন আবিল ইয্য এর ব্যাখ্যাসহ পৃ. ৫২৪; সাবূনী, আকীদাতুস সালাফ, আসহাবুল হাদীস পৃ. ২৭৬; বাগাওয়ী, শারহুস সুন্নাহ ১/১১৭]
মোটকথা: কবীরা গুনাহকারীর আখেরাতের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মত নিম্নোক্ত ছয়টি বিষয়ে জড়িত:
• যে কবীরা গুনাহ করবে সে আখেরাতে আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে, তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিবেন, আর চাইলে ক্ষমা করবেন।
• কবীরা গুনাহকারী তার গুনাহের কারণে শাস্তির হক্বদার ও জাহান্নামে প্রবেশের অধিকারী হয়ে গেছে।
• কবীরা গুনাহকারী যদি জাহান্নামে প্রবেশ করে তবে সেখানে চিরস্থায়ী হবে না।
• জাহান্নামে কবীরা গুনাহকারীর আযাব কখনো কাফেরদের আযাবের মত হবে না।
• কবীরা গুনাহকারীর সর্বশেষ পরিণতি জান্নাত হবে, তার শাস্তি পর্ব পূর্ণ হওয়ার পর।
• কবীরা গুনাহকারী আল্লাহর অনুমতিক্রমে শাফায়াত প্রাপ্ত হবে, আর আল্লাহর রহমতেও বের জাহান্নাম থেকে বের হবে।
কবীরা গুনাহকারীর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদার মূলনীতি:
কবীরা গুনাহকারীর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদার মূলনীতি হচ্ছে,
১- ঈমান অংশ বিশিষ্ট সাব্যস্তকরণ।
২- ঈমানের শাখাগুলোর সব একই মর্যাদার না হওয়া।
৩- ঈমান ও গুনাহ একসাথ হতে পারা। [ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহুল আকীদাতিল আসফাহানিয়্যাহ পৃ. ২৩৫, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৮/২৭০]
এ মতের সপক্ষে দলীল:
১- আল্লাহ বলেন, ﴿ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ ﴾ [النساء : ٤٨] “আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সাথে শির্ক করাকে কখনো ক্ষমা করবেন না, এর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের সকল গুনাহ যার জন্য ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন”। [সূরা আন-নিসা: ৪৮, ১১৬] ইমাম তাবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ আয়াত স্পষ্ট করে দিল যে, প্রত্যেক কবীরা গুনাহকারী আল্লাহর ইচ্ছাধীন, তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দিবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কবীরা গুনাহটি শির্কের পর্যায়ে চলে না যাবে। [তাবারী, আত-তাফসীর ৫/১২৬]
২- আল্লাহর বাণী, ﴿ وَإِن طَآئِفَتَانِ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱقۡتَتَلُواْ فَأَصۡلِحُواْ بَيۡنَهُمَاۖ ﴾ [الحجرات: ٩] “আর যদি ঈমানদারদের দু’টি দল পরস্পর হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মাঝে তোমরা মীমাংসা করে দিবে”। [সূরা আল-হুজুরাত: ৯] ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াতটি তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা প্রমাণ করার জন্য এনেছেন যে, মুমিন গুনাহ করলে তাকে কাফির বলা হবে না, তার থেকে ঈমান নামটি রহিত করা হবে না, কারণ আল্লাহ তা‘আলা পরস্পর যুদ্ধ করার পরও তাদেরকে ঈমানদার বলেছেন। [বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, ১/৮৪]
৩- আল্লাহর বাণী, ﴿ ۞قُلۡ يَٰعِبَادِيَ ٱلَّذِينَ أَسۡرَفُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمরۡ لَا تَقۡنَطُواْ مِن رَّحۡمَةِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًاۚ﴾ [الزمر: ٥٣] “বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের নাফসের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করবেন”। [সূরা আয-যুমার: ৫৩] অর্থাৎ যারা ঈমানের ওপর আছে, এমন গোনাহকারীকে তাঁর বান্দা হিসাবে সুসংবাদ দিয়েছেন যে তিনি তাদের ক্ষমা করবেন। সুতরাং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না।
৪- আল্লাহর বাণী, ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلۡقِصَاصُ فِي ٱلۡقَتۡلَىۖ ٱلۡحُرُّ بِٱلۡحُرِّ وَٱلۡعَبۡدُ بِٱلۡعَبۡدِ وَٱلۡأُنثَىٰ بِٱلۡأُنثَىٰۚ فَمَنۡ عُفِيَ لَهُۥ مِنۡ أَخِيهِ شَيۡءٞ فَٱتِّبَاعُۢ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيۡهِ بِإِحۡسَٰنٖۗ ﴾ [البقرة: ١٧٨] “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর হত্যার ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ ফরয করা হয়েছে, স্বাধীন স্বাধীনের বিপরীতে, দাস দাসের বিপরীতে, নারী নারীর বিপরীতে, অতঃপর যে কেউ তার ভাই থেকে কিছু ক্ষমা করে দেয়, তবে সেটা যেন হয় প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে এবং ইহসানের সাথে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে”। [সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৭৮] এ আয়াতে হত্যার পরও হত্যাকারীকে হত্যাকৃত পরিবারের ভাই বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করছে যে, গুনাহগার ব্যক্তি ঈমানদার থাকবে।
৫- আল্লাহর বাণী, ﴿ قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ إِن يَنتَهُواْ يُغۡفَرۡ لَهُم مَّا قَدۡ سَلَفَ وَإِن يَعُودُواْ فَقَدۡ مَضَتۡ سُنَّتُ ٱلۡأَوَّلِينَ ٣٨ ﴾ [الانفال: ٣٨] “হে নবী, আপনি কাফেরদের বলে দিন, যদি তারা কুফরী পরিত্যাগ করে তবে তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, আর যদি তারা আবার শির্ক ও কুফরীতে প্রত্যাবর্তন করে তবে তাদের জন্য পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি তো গত হয়েছেই”। [সূরা আল-আনফাল: ৩৮] এ আয়াতে কাফেরদেরকে ঈমানে আসলে পূর্বে করা কবীরা গুনাহ ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তাহলে ঈমানদার কাফেরদের মত কেন হবে? তাদের তো গুনাহ ক্ষমা হবেই। তাদের অবস্থা আর কাফের এর অবস্থা একরকম হবে না। ইবন আব্দুল বার বলেন, আর এটা জানা কথা যে এটি মৃত্যুর পরে যে তাওবা করে মারা যায়নি তার জন্য, কারণ শির্ক থেকে তো সে মৃত্যুর আগে তাওবা করেছে, আর তা থেকে মুক্ত থেকেছে, তাকে ক্ষমা করা হবে, যেমনটি তাওবার মাধ্যমে সকল গুনাহ ক্ষমা করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন, “হে নবী আপনি কাফেরদেরকে বলে দিন, যদি তোমরা কুফরি থেকে বিরত থাক, তবে তোমাদের থেকে যা ইতোপূর্বে হয়েছে তা ক্ষমা করা হবে।” [আত-তামহীদ, ১৭/১৬]
৬- নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لَا يَدْخُلُ النَّارَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ، وَلَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرِيَاءَ»
“এমন কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে শরিষা দানা পরিমাণ ঈমান অবশিষ্ট আছে, আর এমন কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে শরিষা দানা পরিমাণ অহঙ্কার অবশিষ্ট আছে”। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৯১]
৭- অপর হাদীস, যা উবাদাহ ইবনুস সামেত রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আক্বাবার রাত্রিতে আমাদের বলেন, তাঁর চারপাশে সাহাবীগণ বসা ছিলেন,
«بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لاَ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلاَ تَسْرِقُوا، وَلاَ تَزْنُوا، وَلاَ تَقْتُلُوا أَوْلاَدَكُمْ، وَلاَ تَأْتُوا بِبُهْتَانٍ تَفْتَرُونَهُ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ، وَلاَ تَعْصُوا فِي مَعْرُوفٍ، فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ فِي الدُّنْيَا فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا ثُمَّ سَتَرَهُ اللَّهُ فَهُوَ إِلَى اللَّهِ، إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَاقَبَهُ» فَبَايَعْنَاهُ عَلَى ذَلِكَ
“তোমরা আমার হাতে বাই‘আত করো এটার ওপর যে, আল্লাহর সাথে কাউকে সামান্যতমও শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, এমন কোনো অপবাদ নিয়ে আসবে না, যা তোমরা রটনা করে থাক তোমাদের সামনে বা পশ্চাতে, ভালো কাজে অবাধ্যতা করবে না। অতঃপর তোমাদের মধ্য যে কেউ সেটাকে পূর্ণ করবে তার সাওয়াব তো আল্লাহর যিম্মাদারীতে, আর যে কেউ উপরে বর্ণিত গুনাহসমূহের কোনোটি করবে, অতঃপর তার শাস্তি দুনিয়াতে দেয়া হয়ে যাবে, তবে সেটা তার জন্য কাফফারা হবে, আর যে কেউ উপরে বর্ণিত গুনাহসমূহ করবে কিন্তু আল্লাহ তাকে গোপন করে রেখেছেন, তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাতে, তিনি চাইল তাকে ক্ষমা করবেন, আর চাইলে তাকে শাস্তি দিবেন। অতঃপর আমরা তাঁর হাতে এর ওপর বাই‘আত করলাম”। [বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ১৮]
৮- অপর হাদীসে আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«يَدْخُلُ أَهْلُ الجَنَّةِ الجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ»، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: «أَخْرِجُوا مِنَ النَّارِ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ.
“জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্র্রবেশ করবে, তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তোমরা বের করে আনো এমন প্রত্যেককে যার অন্তরে শরীষা দানা পরিমাণ ঈমান অবশিষ্ট আছে”। [বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ২২; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৮৪]
৯- তাছাড়া শাফা‘আতের হাদীসে এসেছে,
انْطَلِقْ فَمَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ أَدْنَى أَدْنَى أَدْنَى مِنْ مِثْقَالِ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَخْرِجْهُ مِنَ النَّارِ فَأَنْطَلِقُ فَأَفْعَلُ “
“আপনি যান, অতঃপর যার অন্তরে সামান্য সামান্য সামান্য শরীষা দানা পারিমাণ ঈমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনুন, অতঃপর আমি যাব এবং তা করবো”। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৯৩]
১০- অনুরূপ আবু যর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
” أَتَانِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَبَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ “
“আমার কাছে জিবরীল এসে আমাকে সুসংবাদ দিলেন যে, আপনার উম্মতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শরীক না করে মারা যাবে, তারা জান্নাত প্রবেশ করবে, আমি বললাম, যদি সে যিনা করে ও চুরি করে? তিনি বললেন, যদি সে যিনা করে ও চুরি করে তবুও”। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৯৪; বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ৩২২২; ৫৮২৭; ৬২৬৮; ৬৪৪৪]
১১- অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَنِّي رَسُولُ اللهِ، لَا يَلْقَى اللهَ بِهِمَا عَبْدٌ غَيْرَ شَاكٍّ، فَيُحْجَبَ عَنِ الْجَنَّةِ»
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই, আর আমি আল্লাহর রাসূল, এ দু’টি সাক্ষ্য নিয়ে সন্দেহমুক্ত হয়ে যে কেউ আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, জান্নাতে যাওয়ার ব্যাপারে তাকে বাধা দেয়া হবে না”। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৭]
১২- অনুরূপ আবু যর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مَنْ لَقِيَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطِيئَةً لَا يُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَقِيتُهُ بِمِثْلِهَا مَغْفِرَةً “
“যে কেউ যমীন পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার সাথে সাক্ষাত করবে, তবে আমার সাথে সামান্যতমও শির্ক করেনি, আমি তার জন্য সম পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে সাক্ষাত করবো”। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৬৮৭]
১৩- আবু বকর আস-সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
«إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ مُجَانِبٌ الْإِيمَانَ»
“সাবধান তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক, কারণ মিথ্যা ঈমানকে পাশ কাটিয়ে দেয়”। [লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ৬/১০৯১, নং ১৮৭৩]
১৪- আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
«الْإِيمَانُ نَزِهٌ فَمَنْ زَنَا فَارَقَهُ الْإِيمَانُ، فَإِنْ لَامَ نَفْسَهُ وَرَجَعَ رَاجَعَهُ الْإِيمَانُ»
“ঈমান পবিত্র জিনিস, সুতরাং যে কেউ যিনা করবে ঈমান তার থেকে আলাদা হয়ে যাবে, অতঃপর যদি নিজেকে সে তিরষ্কার করে ও দীনে ফিরে আসে ঈমানও তার দিকে ফিরে আসে”। [লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ৬/১০৯০, নং ১৮৭০]
১৫- আবুদ দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
«مَا الْإِيمَانُ إِلَّا كَقَمِيصِ أَحَدِكُمْ يَخْلَعُهُ مَرَّةً، وَيَلْبَسُهُ أُخْرَى، وَاللَّهِ مَا أَمِنَ عَبْدٌ عَلَى إِيمَانِهِ إِلَّا سُلِبَهُ فَوَجَدَ فَقْدَهُ»
“ঈমান তো কেবল তেমনি, যেমন তোমাদের কেউ তার জামা একবার খুলে, আবার পরিধান করে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, যখনই কোনো বান্দা তার ঈমানের ব্যাপারে শঙ্কাহীন হয়, তখন সেটি তার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় আর সে সেটা হারিয়ে যাওয়া অনুভব করতে পারে”। [লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ৬/১০৯১, নং ১৮৭১]
১৬- ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর দাসদের একজন একজন করে ডাকতেন এবং বলতেন,
كَانَ ابن عَبَّاسٍ يَدْعُو غِلْمَانَهُ غُلَامًا غُلَامًا فَيَقُولُ أَلَا أُزَوِّجُكَ مَا مِنْ عَبْدٍ يَزْنِي إِلَّا نَزَعَ اللَّهُ مِنْهُ نُورَ الْإِيمَانِ
قَالَ عِكْرِمَةُ: قُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ: كَيْفَ يُنْزَعُ الإِيمَانُ مِنْهُ؟ قَالَ: «هَكَذَا، وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ، ثُمَّ أَخْرَجَهَا، فَإِنْ تَابَ عَادَ إِلَيْهِ هَكَذَا، وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ»
“ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা তাঁর যুবকদের একজন একজন করে ডেকে বলতেন, তোমাকে কি বিয়ে করিয়ে দিব? কোনো বান্দা যখন যিনায় লিপ্ত হয় তখন আল্লাহ তা‘আলা তার থেকে ঈমানের নূর ছিনিয়ে নেন।”
ইকরিমাহ বলেন, আমি ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বললাম, কীভাবে ঈমান ছিনিয়ে নেয়া হয়? তিনি বললেন, এভাবে, আর তিনি হাতের আঙ্গুলিগুলো একটি অপরটি ভিতরে প্রবেশ করিয়ে বের করে আনলেন। তারপর যদি সে তাওবা করে তাহলে আবার এভাবে প্রবেশ করে এবং তিনি আঙুলগুলো আবার একটির ভিতরে আরেকটি প্রবেশ করালেন।
[প্রথম অংশ ইবন হাজার, ফাতহুল বারী, ১২/৫৯, লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ১৮৬৬; আর দ্বিতীয় অংশ, বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং, ৬৮০৯]
১৭- ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وَلَا نكفر مُسلما بذنب من الذُّنُوب وَإِن كَانَت كَبِيرَة إِذا لم يستحلها
“আমরা কোনো মুসলিমকে কোনো গুনাহের কারণে কাফের বলি না, যদিও সেটি কবীরা গুনাহ হয়, যতক্ষণ না সে সেটাকে হালাল মনে না করছে”। [আল-ফিকহুল আকবার এর ভাষ্য, পৃ. ৪৩]
১৮- ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(لو أن رجلاً ركب الكبائر كلها بعد أن لا يشرك بالله؛ ثم تخلى من هذه الأهواء والبدع؛ دخل الجنة)
“কোনো মানুষ যদি আল্লাহর সাথে শির্ক না করে যাবতীয় গোনাহে লিপ্ত হয়, তারপর বিদ‘আতীদের মত ও পথ থেকে মুক্ত থাকতে পারে, তবে সে জান্নাতে যাবে”। [আবু নু‘আইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৬/৩২৫]
১৯- ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(أَمَّا الَّذِينَ يَجِبُ عَلَيْهِمْ السَّخَطُ… إلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا … إلَى فِئَةٍ مِنْ الْمُسْلِمِينَ … وَإِنْ كَانَ لِغَيْرِ هَذَا الْمَعْنَى خِفْت عَلَيْهِ إلَّا أَنْ يَعْفُوَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنْ يَكُونَ قَدْ بَاءَ بِسَخَطٍ مِنْ اللَّهِ)
“আর যা তাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত করে, তা হচ্ছে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো, যদি না যুদ্ধের মোড় ঘুরার জন্য, অথবা মুসলিম শক্তির সাথে মিলিত হওয়ার জন্য হয়, সেটা ভিন্ন কথা, আর যদি এ অর্থ ব্যতীত অন্য কারণে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে আমি তার ব্যাপারে আশঙ্কা করি যে তাকে আল্লাহর ক্রোধ পেয়ে বসবে, তবে যদি তাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেয় সেটা ভিন্ন কথা”। [আশ-শাফে‘ঈ, আল-উম্ম ৪/২৫৭]
২০- ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(يخرج الرجل من الإيمان إلى الإسلام، ولا يخرجه من الإسلام شيء إلا الشرك بالله العظيم، أو برد فريضة من فرائض الله – عز وجل – جاحداً بها؛ فإن تركها كسلاً، أو تهاوناً كان في مشيئة الله، إن شاء عذبه، وإن شاء عفا عنه)
“একজন মানুষ ঈমান থেকে ইসলামের গণ্ডিতে চলে আসে, তবে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক না করলে কেউ ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় না। অথবা যদি আল্লাহর ফরযসমূহের কোনোটি অস্বীকার করে প্রত্যাখ্যান করে, আর যদি অলসতা করে ছাড়ে, অথবা গুরুত্বহীন মনে করে ছাড়ে তবে সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন হবে, তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিবেন, আর চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন”। [ইবন রাজাব আল-হাম্বলী, ত্বাবাকাতুল হানাবিলাহ ১/৩৪৩]
২১- ইমাম আবু ‘উবাইদ আল-কাসেম ইবন সাল্লাম বলেন,
(إن المعاصي والذنوب لا تزيل إيماناً، ولا توجب كفراً، ولكنها إنما تنفي من الإيمان حقيقته وإخلاصه، الذي نعت الله به أهله واشترطه عليهم في مواضع من كتابه)
“গুনাহ ও অপরাধ ঈমানকে তিরোহিত করে দেয় না, কুফরকেও আবশ্যক করে না। তবে তা ঈমানের প্রকৃত অবস্থা ও ইখলাস বিনষ্ট করে দেয়, যে গুণের কারণে আল্লাহ ঈমানদারদের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর কিতাবের বিভিন্ন স্থানে তা তাদের ওপর শর্ত করেছেন”। [আবু উবাইদ, কিতাবুল ঈমান পৃ. ৪০]
২২- ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর আল-জামে‘উস সহীহ গ্রন্থে অধ্যায় বিন্যাস করে সেখানে অকাট্যভাবে এটা বর্ণনা করেছেন যে, গুনাহের কারণে গুনাহকারীকে কাফের বলা যাবে না। তিনি বলেন, ‘অধ্যায়, গুনাহসমূহ জাহেলী কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত, যারা গুনাহ করবে তাদেরকে শির্ক না করলে কাফের বলা যাবে না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় তুমি একজন লোক, যার মাঝে জাহেলিয়াত কাজ করছে।” আর আল্লাহর বাণী, “”। [সূরা আন-নিসা: ৪৮]
২৩- ইমাম আবু জা‘ফর আত-তাহাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর আকীদাহ গ্রন্থে বলেন,
(ولا نكفر أحداً من أهل القبلة بذنب ما لم يستحله) .
“আর আমরা কিবলার অনুসারী (সালাত আদায়কারী) কাউকে কোনো গুনাহের কারণে কাফির বলি না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সেটাকে হালাল মনে না করবে”। [বায়ানু আকীদাতি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ]
২৪- ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরী বলেন,
(وندين بأن لا نكفر أحداً من أهل القبلة بذنب يرتكبه؛ كالزنا والسرقة وشرب الخمر، كما دانت بذلك الخوارج وزعمت أنهم كافرون. ونقول: إن من عمل كبيرة من هذه الكبائر؛ مثل الزنا والسرقة وما أشبهها، مستحلاً لها غير معتقد لتحريمها؛ كان كافراً)
“আর আমরা এটা দীন হিসাবে গ্রহণ করি যে, কিবলার অনুসারী (সালাত আদায়কারী) কাউকে কোনো গুনাহে পতিত হওয়ার কারণে তাকে কাফের বলি না, যেমন: যিনা, চুরি, মদপান; যেমনটি খারেজীরা দীন হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং মনে করেছে যে, এ কাজগুলো যারা করবে তারা কাফের হয়ে যাবে; বরং আমরা বলি, যে কেউ এসব কবীরা গুনাহ হতে কোনো কবীরা গুনাহ করবে যেমন যিনা, চুরি ও অনুরূপ কিছু, সেগুলোকে হালাল মনে করে করবে, সেগুলোকে হারাম মনে না করে করবে, সে কাফের হয়ে যাবে”। [আশ‘আরী, আল-ইবানাহ ‘আন উসূলিদ দিয়ানাহ পৃ. ২৬]
২৫- ইমাম আবু বকর আল-ইসমা‘ঈলী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ই‘তিক্বাদু আহলিল হাদীস ওয়া আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ গ্রন্থে বলেন,
(ويقولون: إن أحداً من أهل التوحيد ومن يصلي إلى قبلة المسلمين؛ لو ارتكب ذنباً، أو ذنوباً كثيرة، صغائر، أو كبائر مع الإقامة على التوحيد لله، والإقرار بما التزمه وقبله عن الله؛ فإنه لا يكفر به، ويرجون له المغفرة، قال تعالى: {وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء} )
“আর আহলুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বলে, তাওহীদের অনুসারী, আর যারা মুসলিমদের কিবলামুখী হয়ে সালাত আদায় করে তাদের কেউ যদি কোনো গুনাহ করে, অথবা অনেক গুনাহ করে, ছোট হোক কিংবা বড়, কিন্তু সে আল্লাহর জন্য তাওহীদ ঠিক রেখেছে, আল্লাহ থেকে যা আবশ্যক হিসাবে নিয়েছে ও তা গ্রহণ করে নিয়েছে তাকে উক্ত গোনাহের কারণে কাফের বলা যাবে না, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তার জন্য ক্ষমার আশা করে”। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তিনি এর চেয়ে ছোট পর্যায়ের যা আছে তা ক্ষমা করবেন যার জন্য ইচ্ছা’। [আল-ইমাম আল-ইসমা‘ঈলী, ই‘তিক্বাদু আহলিল হাদীস, পৃ. ৪৩; তাহক্বীক, মুহাম্মাদ আল-খুমাইয়েস]
২৬- ইমাম ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(وقد أجمعت العلماء – لا خلاف بينهم – أنه لا يكفر أحد من أهل القبلة بذنب، ولا نخرجه من الإسلام بمعصية؛ نرجو للمحسن، ونخاف على المسيء)
“আলেমগণ একমত হয়েছেন, তাদের মাঝে মতভেদ নেই যে, কোনো কিবলার অনুসারী কাউকে গোনাহের কারণে কাফের বলা যাবে না, কোনো অবাধ্যতার কারণে তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়া যাবে না; ইহসানকারীর জন্য আশা করি, আর অপরাধকারীর জন্য আশঙ্কা করি”। [আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ আলা উসূলিস সুন্নাতি ওয়াদ দিয়ানাহ, আল-ইবানাতুস সুগরা পৃ. ২৯২; তাহকীক: ড. রেদ্বা ইবন না‘সান মু‘ত্বী]
২৭- ইমাম আবু ইসমা‘ঈল আস-সাবুনী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ই‘তিক্বাদু আয়িম্মাতিস সালাফ আসহাবুল হাদীস আহলুস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ গ্রন্থে বলেন,
(ويعتقد أهل السنة: أن المؤمن وإن أذنب ذنوباً كثيرة صغائر كانت، أو كبائر؛ فإنه لا يكفر بها، وإن خرج من الدنيا غير تائب منها، ومات على التوحيد والإخلاص؛ فإن أمره إلى الله – عز وجل – إن شاء عفا عنه، وأدخله الجنة يوم القيامة سالماً غانماً، غير مبتلى بالنار، ولا معاقب على ما ارتكبه من الذنوب، واكتسبه ثم استصحبه – إلى يوم القيامة – من الآثام والأوزار، وإن شاء عاقبه وعذبه مدة بعذاب النار، وإذا عذبه لم يخلده فيها؛ بل أعتقه وأخرجه منها إلى نعيم دار القرار)
“আর আহলুস সুন্নাহ বিশ্বাস করে যে, মুমিন ব্যক্তি যদিও অনেক গুনাহ করে, ছোট হোক কিংবা বড়, তাকে সেটার জন্য কাফের বলা যাবে না, যদিও সে দুনিয়া থেকে তাওবা না করে চলে যায়, তবে তাওহীদ ও ইখলাস নিয়ে মারা যায়; কারণ তার বিষয়টি মহান আল্লাহর নিকট ন্যস্ত, তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা করে কিয়ামতের দিন তাকে তাঁর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, পূর্ণ নিরাপত্তা সহকারে লাভবান করে, কোনো প্রকার আগুনের পরীক্ষা না করেই। যে গুনাহ সে করেছে, যা সে অর্জন করেছে, যা সাথে নিয়ে সে কিয়ামতের মাঠে উঠে এসেছে সে সব গুনাহ ও অপরাধের জন্য তাকে শাস্তি না দিয়ে। আর যদি তিনি ইচ্ছা করেন, তবে তিনি তাকে শাস্তি দিবেন, আযাব দিবেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাহান্নামের শাস্তি দিয়ে, আর যদি তাকে আযাবও প্রদান করেন তাকে সেখানে চিরস্থায়ী করবেন না, বরং তাকে মুক্তি দিবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে স্থায়ী আবাস জান্নাতে প্রদান করবেন”। [‘আকীদাতুস সালাফ ওয়া আসহাবুল হাদীস, পৃ. ২৭৬; তাহকীক ড. নাসের ইবন আব্দুর রহমান আল-জুদা‘ই]
২৮- ইমাম মুহিউস সুন্নাহ বাগাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(اتفق أهل السنة على أن المؤمن لا يخرج عن الإيمان بارتكاب شيء من الكبائر، إذا لم يعتقد إباحتها، وإذا عمل شيئاً منها؛ فمات قبل التوبة، لا يخلد في النار؛ كما جاء به الحديث؛ بل هو إلى الله، إن شاء عفا عنه، وإن شاء عاقبه بقدر ذنوبه، ثم أدخله الجنة برحمته)
“আহলুস সুন্নাহ এ ব্যাপারে একমত যে, মুমিন কোনো কবীরা গুনাহের কারণে ঈমান থেকে বেরিয়ে যাবে না, যদি না সে সেটাকে বৈধ হওয়া বিশ্বাস না করে বসে; আর যদি এর কোনো কিছু সে করে বসে, তারপর তাওবা করার আগেই মারা যায়, তাহলে সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না, যেমনটি হাদীসে এসেছে, বরং তার বিষয়টি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন, আর চাইলে তাকে গোনাহ পরিমাণ শাস্তি প্রদান করবেন, তারপর তাকে তাঁর রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন”। [বাগাওয়ী, শারহুস সুন্নাহ ১/১০৩]
২৯- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(من أصول أهل السنة والجماعة: أن الدين والإيمان قول وعمل: قول القلب واللسان، وعمل القلب واللسان والجوارح، وأن الإيمان يزيد بالطاعة وينقص بالمعصية. وهم مع ذلك:
لا يكفرون أهل القبلة بمطلق المعاصي والكبائر، كما يفعله الخوارج؛ بل الأخوة الإيمانية ثابتة مع المعاصي؛ كما قال سبحانه في آية القصاص: {فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ} .. ولا يسلبون الفاسق الملي الإسلام بالكلية، ولا يخلدونه في النار، كما تقوله المعتزلة؛ بل الفاسق يدخل في اسم الإيمان المطلق؛ كما في قوله تعالى: {فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ} .وقد لا يدخل في اسم الإيمان المطلق؛ كما في قوله تعالى: ﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ﴾
ونقول: هو مؤمن ناقص الإيمان، أو هو مؤمن بإيمانه فاسق بكبيرته؛ فلا يعطى الاسم المطلق، ولا يسلب مطلق الاسم)
“আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকদের অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে, দীন ও ঈমান হচ্ছে কথা ও কাজের নাম। অন্তরের কথা ও মুখের কথা, অন্তরের কাজ, মুখের কাজ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ। আর ঈমান আনুগত্যের মাধ্যমে বাড়ে আর গোনাহের মাধ্যমে কমে, এরপরও তারা:
কিবলার অনুসারী সে দিকে ফিরে সালাত আদায়কারীদেরকে নিছক গুনাহ ও কবীরার জন্য কাফের বলে না, যেমনটি খারেজী সম্প্রদায় করে থাকে, বরং পাপাচারে লিপ্ত হলেও তাদের জন্য ঈমানী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকে, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “অতঃপর যে তার ভাই থেকে কোনো কিছু ক্ষমা করে দেয়, তাহলে প্রচলিত নিয়মে তা করবে..”
আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত মুসলিম মিল্লাতের কোনো ফাসেক ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয় না, এবং মৃত্যুর পরে তাকে জাহান্নামী চিরস্থায়ী হওয়ার কথা বলে না, যেমন বলে থাকে মু‘তাযিলারা। বরং ফাসেক সাধারণ নিঃশর্ত ঈমানে প্রবেশ করবে, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সে যেন একজন মুমিন দাস মুক্ত করে”। আবার কখনো কখনো সে সাধারণ নিঃশর্ত ঈমানে প্রবেশ করতে পারবে না, যেমন আল্লাহ বলেন, “ঈমানদার তো তারাই, যাদের কাছে আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে তাদের অন্তরে কম্পন আসে, আর যখন তার আয়াত তেলাওয়াত করা হয় তখন তাদের ঈমান বর্ধিত হয়, আর তারা তাদের রবের ওপর তাওয়াক্কুল করে”। তাই উপরোক্ত গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে আমরা বলবো, ‘তারা ত্রুটিপূর্ণ মুমিন, অথবা বলবো, তার মধ্যে ঈমান থাকার কারণে সে মুমিন, আর কবীরা গুনাহ থাকার কারণে সে ফাসিক। সুতরাং তাদের পূর্ণ ঈমানদার বলা যাবে না এবং মুমিন পদবী তার থেকে একেবারে ছিনিয়েও নেয়া যাবে না”। [আল-আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বিয়্যাহ পৃ. ৮১]
৩০- ইমাম ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(إن أهل السنة متفقون كلهم على أن مرتكب الكبيرة لا يكفر كفراً ينقل عن الملة بالكلية، كما قالت الخوارج؛ إذ لو كفر كفراً ينقل عن الملة؛ لكان مرتداً يقتل على كل حال، ولا يقبل عفو ولي القصاص، ولا تجري الحدود في الزنى والسرقة وشرب الخمر، وهذا القول معلوم بطلانه وفساده بالضرورة من دين الإسلام. ومتفقون على أنه لا يخرج من الإيمان والإسلام، ولا يدخل في الكفر، ولا يستحق الخلود في النار مع الكافرين)
“আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, কবীরা গুনাহকারীকে এমন ভাবে কাফির বলা হবে না যে সে দীন ও মিল্লাত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেছে। যেমনটি খারেজী সম্প্রদায় বলে থাকে। কারণ যদি মিল্লাত থেকে বের হওয়ার মতো কুফরী করত তবে তো মুরতাদ হয়ে যেতো, সর্বাবস্থায় তাকে হত্যা করা হতো, কিসাস নেওয়ার অধিকারী ওলীর পক্ষ থেকে ক্ষমার প্রস্তাব গ্রহণ করা হতো না। আর যিনা-ব্যভিচার, চুরি ও মদ্যপানের মত গোনাহের শাস্তি তার ওপর প্রয়োগ করা যেতো না। আর এটি যে বাতিল কথা তা সবার জানা, আর এটি অগ্রহণযোগ্য কথা হওয়ার বিষয়টি দীনে ইসলামের আবশ্যকীয় জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। আর আহলুস সুন্নাত এ ব্যাপারেও একমত যে, সে ঈমান ও ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে না, কাফের এর গণ্ডিতেও প্রবেশ করবে না আর জাহান্নামে কাফেরদের সাথে চিরস্থায়ীও হবে না।” [শারহু ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী, আলাল আকীদাতিত ত্বাহাওয়িয়্যাহ পৃ. ৪৪২]
