প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতিটি রাকাতে আমরা তিলাওয়াত করি : (হে আল্লাহ!) আমাদের সরল পথে পরিচালিত করো। সেই সকল লোকের পথে, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ। ওই সকল লোকের পথে নয়, যাদের প্রতি গজব নাজিল হয়েছে এবং তাদের পথেও নয়, যারা পথহারা। (সূরা ফাতিহা : ৫-৭)। এখানে ‘যাদের প্রতি গজব নাজিল হয়েছে’ বলে যে জাতিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তারা হলো ইহুদি জাতি। এদের থেকেই আমরা নামাজের প্রতি রাকাতে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। কেন?
কারণ তারাই সেই জাতি, যারা সত্য জানার পরও হঠকারিতা ও বিদ্বেষবশত তা গ্রহণ করেনি। উপর্যুপরি বিদ্বেষ ও হঠকারিতার কারণে যাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তা’আলার কুদরত, নিয়ামত ও আজাব সরাসরি প্রত্যক্ষ করার পরও যারা সবক নেয়নি। বরং নিজেদের অন্যায়-অনাচার ও দুশ্চরিত্রের ফলে আল্লাহর রহমত থেকে ছিটকে পড়েছে। কুফর, শিরক, অন্যায়-অনাচারে যারা সকল সীমা অতিক্রম করেছে। বহু নবীকে যারা হত্যা করেছে, যাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যই হলোÑ সত্য গোপন করা, নবীদের বিরুদ্ধাচারণ করা, বিশেষত ইসলাম ও ইসলামের নবী এবং মুসলমানদের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করা, ইসলামের বিরুদ্ধে কঠিন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা, ওয়াদা ও চুক্তিভঙ্গ করা, বিশ্বাসঘাতকতা, খেয়ানত ও গাদ্দারি, খুন-খারাবি, পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি, যুদ্ধ-বিগ্রহ জিইয়ে রাখা, অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রাস করাসহ এমন হেন অপরাধ নেই, যা তারা করেনি বা করছে না! কুরআন কারীমে আল্লাহ তা’আলা বিভিন্ন আঙ্গিকে তাদের চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এখানে আমরা কুরআনে বর্ণিত তাদের চরিত্রের মৌলিক কিছু দিক নিয়ে আলোকপাত করব।
আল্লাহর শানে বেয়াদবি : জাকাতের বিধান নাজিল হওয়ার পর তারা ব্যঙ্গ করে বলেছিল : আল্লাহ দরিদ্র আর আমরা ধনী। আল্লাহ তা’আলা তাদের এ চরম বেয়াদবির কোনো উত্তর না দিয়ে বরং শাস্তির সতর্কবাণী শুনিয়ে দিয়েছেন : আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন যারা বলে, আল্লাহ গরীব এবং আমরা ধনী। তারা যা বলে আমি তা (তাদের আমলনামায়) লিখে রাখি এবং তারা নবীগণকে অন্যায়ভাবে যে হত্যা করেছে সেটাও। অতঃপর আমি বলব, জ্বলন্ত আগুনের স্বাদ গ্রহণ কর। (সূরা আলে ইমরান : ১৮১)।
অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তা’আলা কিছুদিন এদেরকে অর্থসংকটে নিক্ষেপ করলেন। এ অবস্থায় এদের তো উচিত ছিল আনুগত্য স্বীকার করা। তা না করে বরং তাদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোক আল্লাহ তা’আলার শানে চরম অশিষ্ট বাক্য উচ্চারণ করল। এমন বেয়াদবিমূলক কথা সম্ভবত পৃথিবীতে কেবল তারাই বলেছিল : আল্লাহর হাত বাঁধা। আরবীতে ‘হাত বাঁধা’ দ্বারা কৃপণতা বোঝানো হয়ে থাকে।
তারা বলল, আল্লাহ তা’আলা তাদের অর্থসংকটে ফেলে তাদের প্রতি কৃপণতা করছেন, নাউযুবিল্লাহ। অথচ এই ইহুদি জাতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই বখিল ও কৃপণ বলে পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত। আল্লাহ তা’আলা বলছেনÑ বরং তারা নিজেরা কৃপণ এবং তাদের কথার কারণে তাদের ওপর লানত বর্ষণ করা হয়েছে। (দ্র. সূরা মায়িদা (৫) : ৬৪, তাফসিরে তাবারি; তাফসিরে কুরতুবী, আলোচ্য আয়াত)।
আল্লাহর বিধান অমান্য করার কারণে বনী ইসরাইলকে আল্লাহ তা’আলা দীর্ঘদিন সিনাই মরুভূমিতে ছন্নছাড়া জীবনযাপন করিয়েছেন। সেখানে তাদের বিভিন্ন ধরনের কষ্ট হচ্ছিল, যদিও অনেক অলৌকিক নিয়ামতও তখন তাদের ওপর নাজিল করা হয়েছে। এ থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহ তা’আলা যখন তাদের বললেন, নতশির হয়ে অমুক জনপদে প্রবেশ করো আর বলো : আল্লাহ, আমরা ক্ষমা চাই, আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন! (সূরা বাকারা : ৫৮-৫৯)। কিন্তু তারা আল্লাহর সঙ্গে মশকরা শুরু করে দিলো। তারা সেøাগান দেয়া শুরু করল : গম চাই! গম চাই!! (সহিহ বুখারী : ৪৬৪১)।
নবীগণকে হত্যা করা ও অপবাদ দেওয়া : এরা আল্লাহর প্রেরিত নবীদের হত্যা করেছে। নবীগণ শরিয়তের কোনো বিধান নিয়ে এসেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে, তাদের মনপুত না হলেই হয়তো দাম্ভিকতা দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে, নয়তো নবীকেই হত্যা করে ফেলেছে। এই ছিল ইহুদিদের পূর্বপুরুষদের চরিত্র।
আল্লাহ তা’আলা বলেন : অতঃপর এটা কেমন আচরণ যে, যখনই কোনো রাসূল তোমাদের কাছে এমন কোনো বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যা তোমাদের মনের চাহিদা সম্মত নয়, তখনই তোমরা দম্ভ দেখিয়েছ? অতএব কতক (নবী)-কে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছ এবং কতককে হত্যা করছ। (সূরা বাকারা : ৮৭)। ইহুদিদের হাতে নবীদের হত্যার বিষয়টি আল্লাহ তা’আলা বারবার বলেছেন। বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। দেখুন, সূরা নিসা : ১৫৫; সূরা আলে ইমরান : ১৮, ১১২; সূরা বাকারা : ৯১)।
