এবার তুরস্কের নির্বাচনটি ছিল উপভোগ্য ও টানটান উত্তেজনাকর। ফলাফল ঘোষণার সময় বিশ্বের কোটি মানুষ তাকিয়েছিলেন টিভির পর্দায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। কী হতে যাচ্ছে তুরস্কের নির্বাচনের ফলাফল! এরদোগান কি আবার জয় পাচ্ছেন? এরকম প্রশ্নই ছিল সবার মনে।
প্রথমত, নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি ছিল- ৮৭ শতাংশ। কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধান বিরোধী নেতাসহ কেউ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেননি এবং নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যা এরদোগানের গণতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতির স্পষ্ট বার্তা দেয়।
দ্বিতীয়ত, সংসদ নির্বাচনে সরকারি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছে। ৬০০ আসনের সংসদে তাদের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ৩২১টি। এর মধ্যে এককভাবে একে পার্টির ২৬৬টি। জাতীয়তাবাদী এমএইচপির ৫০টি এবং ইসলামপন্থী নিউ রেফা পার্টির পাঁচটি। এখানে নিউ রেফা পার্টির নিজস্ব প্রতীকে লড়ে পাঁচটি আসন এবং ২.৮ শতাংশ ভোট পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।
বিরোধী জোট ২১৩টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে কামালিস্ট সিএইচপির ১৬৯টি এবং জাতীয়তাবাদী ইয়ি পার্টির ৪৪টি। উল্লেখ্য, সিএইচপির প্রার্থী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাওতুলুর দল ফিউচার পার্টি ১০টি, সাবেক ডিপুটি প্রধানমন্ত্রী আলী বাবাজানের দল দেভা পার্টি ১৪টি ও সাদেত পার্টি ৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এর বাইরে কুর্দিদের সেক্যুলার ও বাম জোট পেয়েছে ৬৬টি।
সংসদ নির্বাচনের এই ফলাফল সরকারি জোটের জন্য সন্তোষজনক। একে পার্টির আসন যদিও ৩০টির মতো কমেছে, তারপরও তারা খুশি, কারণ আরো কমার আশঙ্কা ছিল। এমএইচপির আসন কমেনি; বরং একটি বেড়েছে। জরিপগুলো তাদের ভোট মারাত্মক কমার আভাস দিচ্ছিল কিন্তু ভুল প্রমাণিত হলো।
কামালিস্ট সিএইচপিসহ বিরোধী জোট সংসদে আরো অনেক ভালো করবে বলে মনে করছিল। কিন্তু তাদের আসনও কমেছে; যদিও সংখ্যায় সিএইচপির আসন ১৪৬ থেকে ১৬৯ হয়েছে কিন্তু এখানে ছোট চার দলের আসন রয়েছে। সব মিলিয়ে তাদের আসনও ১৫টির মতো কমেছে।
তৃতীয়ত, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোগান ৪৯.৪২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন এবং নিকটতম প্রার্থীর চেয়ে ৪.৫ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন। ভোটের সংখ্যায় ব্যবধানটি প্রায় ২৫ লাখ। সরকারি জোটের জরিপগুলো আগে থেকেই প্রায় এরকম একটি আভাস দিচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ভোট সংখ্যা ৪৯ শতাংশের ঘরে। শেষে সেটিই হলো; যদিও অন্যান্য বেশির ভাগ জরিপ বিরোধী প্রার্থী কামাল কিলিচদারোগলুর ভোট ৫২ শতাংশের মতো দেখাচ্ছিল। তিনি পেয়েছেন ৪৪.৯৫ শতাংশ ভোট। নির্বাচনে তৃতীয় হওয়া প্রার্থীর ভোটও ধারণার চেয়ে অনেক বেশি- ৫.২ শতাংশ। জরিপগুলো তার ১-২ শতাংশের মতো ভোট পাওয়ার কথা বলেছিল।
সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫০ শতাংশ+একটি ভোট পেলেই কেবল কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারে। ফলে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও ২৮ মে দ্বিতীয় রাউন্ডের নির্বাচনটি নিশ্চিতই বলা যেতে পারে। এ দফায় শুধু দু’জনের (প্রথম ও দ্বিতীয় হওয়া প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর) মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় দফাটি এরদোগানের জন্য সহজ হবে বলেই মনে হয়। কেননা,
১. সংসদে সরকারি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বিরোধী জোটের সাথে শতাধিক আসনের ব্যবধান। ফলে, এটি দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা ভোটারদের প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে ভোট দিতে উৎসাহিত করবে।
২. প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রাপ্ত ভোট বিরোধী প্রার্থীর চেয়ে ৪.৫ শতাংশ বেশি। এটিও মানসিকভাবে ভোটারদেরকে দ্বিতীয় দফায় তাকে ভোট দিতে উৎসাহিত করবে।
৩. তৃতীয় হওয়া প্রার্থী জাতীয়তাবাদী যদিও আতাতুর্ক তথা কামালিস্ট জাতীয়তাবাদী। কুর্দি বাম দল কামালকে সমর্থন দেয়ায় তিনি শুরু থেকেই এ ব্যাপারে নেতিবাচক ছিলেন। ফলে যদি এরদোগান তার সমর্থন লাভ করতে পারেন তবে জার্নিটা আরো সহজ হবে। ইতোমধ্যে সে দ্বিতীয় দফায় কাকে সমর্থন করবে এ বিষয়ে দরকষাকষির কথা বলেছে। যদিও তার সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তাও আছে।
৪. প্রত্যাশা অনুযায়ী ভোট না পাওয়ায় বিরোধী জোটের মনোবল এখন বেশ দুর্বল। গতকাল প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার সমর্থকদের উদ্দেশে বিজয়ী ভাষণ দেয়ার সময় বিরোধী প্রার্থীর ক্যাম্পেইন সেন্টারে কর্মীদের মধ্যে হতাশার ছাপ দেখা গেছে। অপরদিকে সরকারি জোটের সবাই বেশ উৎফুল্ল। ইস্তান্বুলসহ বিভিন্ন শহরে বিজয় উৎযাপন করেছে একে পার্টিসহ সরকারি জোটে থাকা দলগুলো। স্বভাবতই আগামী দুই সপ্তাহের প্রচারণায় এর প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে এখন সময়ের অপেক্ষা। যদিও বিরোধী জোটও সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাবে। কারণ, বিরোধী ছয় দলের মধ্যে বাকি পাঁচ দলের প্রধানরা কেউই সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি। তাদের সবাইকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করার কথা ছিল। এর বাইরে মন্ত্রী হওয়ার তালিকায় ছয় দলেরই সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতাও সংসদ নির্বাচন করেননি। স্বভাবতই তারা সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন জেতার জন্য।
তবে সব কিছু মিলিয়ে ২৮ তারিখের দ্বিতীয় দফায় হয়তো এরদোগানেই ‘হ্যাঁ’ বলবেন তুরস্ক।
