২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর, সন্ধ্যা প্রায় ৭টা। পোশাক কারখানাটি ছুটি হওয়ার আগমুহূর্ত। কর্মীরা তখনো কাজে ব্যস্ত। এ সময় হঠাৎ আগুন লেগে গেল।
নিমেষে আটতলা ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আগুন। দিশাহারা কর্মীরা যে যাঁর মতো পালাতে ব্যস্ত। তাঁদের মধ্যে রবিন আর ফাতেমা দম্পতিও ছিলেন। বাঁচার তাগিদে চারতলা থেকে লাফিয়ে পড়েন তাঁরা।
তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়ার এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন কারখানার অপারেটর ফাতেমা খাতুন। সেই দুর্ঘটনার ১১ বছর পূর্ণ হলো আজ। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে ওই কারখানার আগুনে পুড়ে প্রাণ হারান ১১৭ জন শ্রমিক। আহত হন কয়েক শ।
ফাতেমা জানান, ওই সময় ছয় মাসের সন্তানসম্ভাবনা ছিলেন তিনি। এত উঁচু থেকে লাফিয়ে পড়ায় তিনি ও তাঁর স্বামী কারখানার কোয়ালিটি কন্ট্রোলার খোরশেদ আলম রবিন দুজনই গুরুতর আহত হন। দীর্ঘ চিকিৎসায় সেরে উঠলেও স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারান তাঁরা।
পরবর্তী সময়ে ছোট্ট একটি ফটোকপির দোকান চালু করেন এই দম্পতি। করোনার সময় এটিও বন্ধ হয়ে যায়।
দোকান ছেড়ে অন্যের পরিত্যক্ত জমিতে সবজি চাষ শুরু করেন তাঁরা। এতেও তেমন সুবিধা হয়নি। পরে দুজন মিলে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান দেন। কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটছিল, কিন্তু গত মে মাসে রবিন মারা যাওয়ায় বড্ড বিপাকে পড়েছেন ফাতেমা। দুই শিশুকন্যা নুরে জান্নাত (১১) ও জায়রা নুরজাহাত ফাইজাকে (৪) নিয়ে একলা সংসারের বোঝা টানতে হচ্ছে তাঁকে।
ফাতেমা খাতুন বলেন, ‘চায়ের দোকান দেওয়ার দুই মাসের মাথায় স্বামী চইলা যাওয়ায় খুব বিপদে আছি। দিনে পাঁচ-ছয় শ টাকার মতো বিক্রি হয়। এই টাকা দিয়া দোকানের মাল কিনি, আবার চলতেও হয়। এক কেজি চাইল, এক পোয়া ডাইল কিনা কোনো মতে খাওয়া-দাওয়া চলতেছে।’ তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর সরকার আর বিভিন্ন সংস্থা থিকা দুইজনে ছয় লাখ টাকা অনুদান পাইছিলাম। সব টাকা চিকিৎসায় গেছে। চাওয়া এখন একটাই—ক্ষতিপূরণ। ক্ষতিপূরণ পাইলে দুই মেয়ে নিয়া কোনো মতে বাঁইচা থাকতে পারমু।’
তাজরীনের আরেক আহত শ্রমিক নাজমা আক্তারও চারতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করেন। তিনিও গুরুতর আহত হন। নাজমা বলেন, ‘আগে সিআরপিতে চিকিৎসা নিতাম, এখন সেইটা বন্ধ। আমার তো ব্রেনে সমস্যা। এখন কোনো কাজ করতে পারি না। আমার তিন সন্তানের একজন চাকরি আর দুজন পড়াশোনা করে। একজনের আয় দিয়াই পুরা সংসার চলতাছে।’ তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার ১১ বছর পার হইয়া ১২ বছরে পড়ল। এখনো ক্ষতিপূরণ পাইলাম না!’
চারতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করা আরেক শ্রমিক জহির অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ‘আমি সরকারের কাছ থিকা একটা টাকাও পাই নাই। অনেকেই পাইছে শুনছি, কিন্তু আমি নাম দিয়াও পাই নাই। এখন কষ্ট কইরা চলতেছি। সরকার সহায়তা দিলে বড় উপকার হইত।’
তাজরীনের তৃতীয় তলায় সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন রেহানা আক্তার। তিনিও অন্যদের মতো লাফিয়ে পড়ে আহত হয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রেহানা তাঁর বড় বোন, দুলাভাই, তাঁদের ছেলে ও ছেলের স্ত্রীকে হারিয়েছেন। তাঁরাও একই কারখানার কর্মী ছিলেন।
রেহানা আক্তার বলেন, ‘আমাদের দাবি নিয়ে আমরা অনেক আন্দোলন করছি, যুদ্ধ করছি। আমাগোর দীর্ঘমেয়াদি সুচিকিৎসা দিক, টাকা-পয়সা দিক, যাতে আমরা ছেলেমেয়ে নিয়া দুবেলা দুই মুঠো ডাইল-ভাত খাইয়া বাঁচতে পারি। কিন্তু কেউ আমাগোর খোঁজখবর করতেছে না। ছেলেমেয়ে নিয়া খুব কষ্টে আছি।’
তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি কারখানা মালিক দেলোয়ার খানের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন এই শ্রমিক। তিনি বলেন, ‘উনি আমাদের সঙ্গে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কইরা কথা বলেন। অন্যায় কইরা উনি পার পাইয়া যাইতাছেন।’
সরেজমিনে দেখা যায়, নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন কারখানার আটতলা ভবনটি এখনো আগুনের পোড়া চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে। প্রতিটি তলা ফাঁকা। বাইরের মূল ফটকটি বন্ধ। পাহারায় একজন নিরাপত্তাকর্মী। তিনি কোনো বিষয়ে কথা বলতে নারাজ।
ঘটনার পর থেকে আহতদের পুনর্বাসনের দাবি করে আসছেন শ্রমিক নেতারা। তাঁরা দোষীদের শাস্তির দাবিও করছেন।
ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্সের সাভার-আশুলিয়ার আঞ্চলিক সভাপতি মো. ইমন সিকদার বলেন, ‘তাজরীন ট্র্যাজেডি ভোলার মতো না। ১১ বছর পার হলো, এখনো বিচার চলছে। আমরা দেখেছি, নিজ উদ্যোগে কিছু শ্রমিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, যাঁরা পঙ্গু। আমরা চাই, সরকার ও বিজিএমইএ থেকে সহায়তা করে যেন তাঁদের নিজেদের চলার মতো, চিকিৎসা চালানোর মতো ব্যবস্থা করা হয়। আহত শ্রমিকরা তাজরীনের পরিত্যক্ত ভবনটি ব্যবহার করার সুযোগ পেলে তাঁদের জন্য সুবিধা হতো। তাঁরা অনেকে বাসস্থান না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।’
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, আগুন লাগার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ গেটে তালা লাগিয়ে শতাধিক শ্রমিককে পুড়িয়ে হত্যা করে। এ ঘটনার ১১ বছর পার হলেও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি।
দেশের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারকে আরো মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘প্রতিবছর এই দিন এলে আমরা তাঁদের কথা মনে করি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি, সেটা আমরা লক্ষ্য করি না। যাঁরা মানবেতর পরিবেশে জীবন যাপন করছেন, তাঁদের দিকে আমাদের তাকাতে হবে। আমি মনে করি, শিল্প-বাণিজ্য এবং শ্রম মন্ত্রণালয় একসঙ্গে মিলে এই পোশাক খাতের জন্য একটা আলাদা মন্ত্রণালয় করতে পারে, যাঁরা এলো ভালোমন্দের দেখভাল করবে।’
