এটাই চূড়ান্ত…! আছে কোন মায়ের ব্যাটা…!! কিয়ামত পর্যন্ত এই ফাতওয়া কেউ উল্টে দিতে পারবে না…!!!
ফাতওয়া প্রদানকারী কে❓
ইসলামী শরীয়তে ফাতওয়া প্রদান করা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কাজ। এটা কোনো যদু, মধু, বা কদুর কাজ নয় 🚫। কতিপয় জ্ঞানী মুসলিম এ কাজে নিয়োজিত থাকবে। ইমাম নববী (রহিমাহুল্লহ) বলেন: ”ফাতওয়া প্রদান করা অতীব মর্যাদা, কৃতিত্ব ও ঝুঁকির কাজ। কেননা ফাতওয়া প্রদানকারী নাবী
এর উত্তরসূরি। ফরজে কিফায়াহ সম্পাদনকারী। কিন্তু তিনিও ভুলভ্রান্তির সম্মুখীন হন” আল-মাজমু মিন শারহিল মুহাযযাব, পৃষ্ঠা নং ৬৭। [গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লহ, পৃষ্ঠা নং ১১]
🔴 সালাফগণ সহজে ফাতওয়া প্রদান করতেন না 🚫:
কথায় কথায় ফাতওয়া প্রদান করা সালাফদের মানহাজ নয়🚫 । ‘ফাতওয়া’ দেওয়াকে তাঁরা এতো সহজ ও সস্তা মনে করতেন না। বরং ফাতওয়া প্রদানে তাঁরা খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং ভয় করতেন। কেননা ফাতওয়া প্রদানকারী প্রকৃতপক্ষে আল্লহর পক্ষ হতে স্বাক্ষর করে থাকেন। ইমাম নববী (রহিমাহুল্লহ) বলেন: ”ফাতওয়া প্রদানকারী হলেন, আল্লহর পক্ষ হতে স্বাক্ষরকারী” মুকাদ্দামাতুল মাজমু, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা নং ৭২। [গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ, পৃষ্ঠা নং ২৪]
ফাতওয়া প্রদানকারীকে ইলমে যথেষ্ট পারদর্শী হতে হবে:
ফাতওয়া প্রদানকারীর যোগ্যতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো কুরআন ও হাদিসের যথেষ্ট জ্ঞান থাকা। যে বিষয়ে জ্ঞান নেই সে বিষয়ে ফাতওয়া দেয়া নিষেধ 🚫। ইলম ছাড়া ফাতওয়া প্রদান করার অর্থ হচ্ছে, আল্লহ ও তাঁর রসূলের উপর মিথ্যারোপ করা। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে কঠোর সতর্কবাণী উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লহ তাআলা বলেন: ‘’আপনি বলে দিন- নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীল বিষয়সমূহ হারোম করেছেন। আরও হারোম করেছেন, গুনাহের কাজ, সত্যের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি, আল্লহর সাথে এমন কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা, যার স্বপক্ষে তিনি কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লহর প্রতি এমন আরোপ করা যা তোমরা জানো না’’ [আ’রাফ ৭/৩৩]
📌 যে বিষয়ে জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কেউ ফাতওয়া দিতে পারবে না, মহান আল্লহ্ তাআলা বলেন: ‘’যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেই বিষয়ের পিছনে তুমি ছুটো না’’ [ইসরা ১৭/৩৬]
সুতরাং ফাতওয়া প্রদানে মুফতীগদেরকে সচেতন, বিচক্ষন ও মাস’আলা উদঘাটনে পারদর্শী হতে হবে। নির্বোধ, বোকা ও অজ্ঞ লোকের মুফতী হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই। যিনি বেশি বেশি ভুল করেন, তিনিও মুফতী হওয়ার অনুপযুক্ত।
ইমাম নববী (রহ.) উল্লেখ করেন: ”মুফতীকে ফাতওয়া তলবকারীর ভাষা, শব্দচয়ন ইত্যাদি সম্পর্কে পারদর্শী হতে হবে। যাতে তিনি উল্টো বুঝে ফাতওয়া দিয়ে না বসেন” আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা নং ৬৯। [গৃহীত: ফাতওয়া-মুহাম্মাদ আবদুল্লহ, পৃষ্ঠা নং ৩২]
ফাতওয়া প্রদানের সময় ফাতওয়া তলবকারীর অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করাও একজন বিজ্ঞ মুফতির জন্য জরুরি:
সাঈদ বিন উবাইদাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক আবদুল্লহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লহু আনহু)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, কেউ যদি কোনো মু’মিনকে (ইচ্ছাকৃতভাবে) হত্যা করে, তার কি তাওবা আছে? তিনি বললেন, না। তার শাস্তি জাহান্নাম। ঐ ব্যক্তি চলে যাওয়ার পর উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আপনি তো আমাদেরকে এরূপ ফাতওয়া দেন নি! আমাদের তো বলেছেন, যে মুমিনকে হত্যা করলেও তাওবাহ কবুল হবে! তাহলে আজ কী হলো? আবদুল্লহ ইবন আব্বাস (র) বললেনঃ ‘’আমার কাছে মনে হলো লোকটি রাগান্বিত এবং সে একজন মুমিনকে হ*ত্যা করতে চায়। তখন সবাই খোঁজ করে ঐ লোকটির অবস্থা সেইরকমই পেলো যেমনটি ইবনু আব্বাস (র) বলেছিলেন’’ মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ, ৯/৩৬১ (শামিলাহ) হা. ২৭৭৫৩; (উসামা) হা. ২৮৩০৮; (সা’দ) হা.২৯৫৬৬ [শাইখ উসামা আসারটির সনদ সহীহ বলেছেন]
🔴 জ্ঞানহীন উদ্ভট ফাতওয়া দেয়া সম্পর্কে রসুল ﷺ এর সতর্কবাণী:
জ্ঞানবিহীন ভুল ফাতওয়ার দায়ভার ফাতওয়া প্রদানকারী মুফতীর উপরই বর্তাবে। আবু হুরয়রহ (র) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লহ ﷺ বলেছেন: ”দলিল-প্রমাণ ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ব্যতীত কাউকে সিদ্ধান্ত দেয়া হলে তার পাপের বোঝা ফাতওয়া প্রদানকারীর উপর বর্তাবে” আবু দাউদ ৩৬৫৭; মিশকাতুল মাসাবীহ ২৪২ [আলবানি হাসান বলেছেন]
♦️ সালাফগণ ফাতওয়া প্রদানে তাড়াহুড়া করতেন না:
সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগন ফাতওয়া প্রদানে তাড়াতাড়ি করতেন না, বরং তা থেকে তাঁরা দূরে থাকতেন। প্রখ্যাত তাবেঈ আব্দুর রহমান বিন আবি লায়লা আল-কুফী বলেন: ”আমি আনসারদের মধ্য হতে ১২০ জন সাহাবীকে পেয়েছি, যদি তাঁদেরকে প্রশ্ন করা হতো, তখন তারা অন্যের কাছে যেতে বলতেন। এভাবে প্রশ্নকারী ঘুরে ঘুরে প্রথম জনের কাছে ফিরে আসতো” খাতীব আল-বাগদাদী, আল ফাক্কীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, পৃষ্ঠা নং ১২। (গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লহ, পৃষ্ঠা নং ১১)
♦️ শাইখ আলবানি বলেন: ”তড়িঘড়ি করে ফাতওয়া প্রদান করা এ যুগের একটি বড় মুসীবত” সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নুর ১/৩০৬ (গৃহীত মাসিক আত-তাহরীক ২০১৩)
সকল বিষয়ে ফাতওয়া প্রদানকারী ব্যক্তি উন্মাদ ও পাগল:
আবদুল্লহ ইবন মাস’উদ (র) ও আবদুল্লহ ইবনু আব্বাস (র) উভয়ে বলেনঃ ‘’যে ব্যক্তি প্রতিটি জিজ্ঞাসার ফাতওয়া বা জবাব প্রদান করে, সে হলো একজন পাগল” আল-ফাক্কীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, পৃষ্ঠা নং ৪৩২-৪৩৩। [গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লহ, পৃষ্ঠা নং ১২]
যাদের ইলম কম, তারাই দুঃসাহসিক ফাতওয়া প্রদান করে: সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহ (রহ) বলেন, “যাদের জ্ঞান অপরিপক্ক, একমাত্র তারাই ফাতওয়া প্রদানে দুঃসাহস দেখায়” আল-ফাক্কীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খণ্ড নং ২, পৃষ্ঠা নং ১৬৮। [গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ, পৃষ্ঠা নং ১২]
♦️ ইমাম শাফিঈ (রহ)-কে একটি মাস’আলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি তার উত্তর দেননি। এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: ”আমি যখন জানবো চুপ থাকার মধ্যে নাকি বেশি বেশি উত্তর দেয়ার মধ্যে সাওয়াব হয়, তখনই আমি উত্তর দেব” সিফাতুল ফাতওয়া ওয়াল মুফতী ওয়াল মুসতাফতী, আল মাকতাবুল ইসলামী, পৃষ্ঠা নং ৬। [গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লহ, পৃষ্ঠা নং ১২-১৩]
ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: ”যে ব্যক্তি কোনো মাস’আলার উত্তর দিতে চায়, সে যেন নিজেকে প্রথমে জান্নাত ও জাহান্নামের সামনে পেশ করে এবং জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের পথ বের করে নেয়, অতঃপর উত্তর প্রদান করে” এভাবে আরেক দিন ইমাম মালিককে একটি মাস’আলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, উত্তরে তিনি জানান ‘আমি জানি না’। অতঃপর তাঁকে বলা হল, এটা তো সহজ মাস’আলা। এ কথা শুনে তিনি রেগে গেলেন এবং বললেনঃ ”জ্ঞানের মধ্যে সহজ বলে কিছু নেই” মুখতাসারু ইবনুল হাজিব খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা নং ২৯০। [গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লহ, পৃষ্ঠা নং ১৩]
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ) উল্লেখ করেনঃ ”যোগ্যতা অর্জন না করে কেউ ফাতওয়া দিলে সে গুনাহগার ও আল্লহর অবাধ্য বলে গণ্য হবে” ই’লামুল মুওয়াক্কীয়ীন খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা নং ১২৭। [গৃহীত: ফাতওয়া- মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ, পৃষ্ঠা নং ৩৪]
ফাতওয়া প্রদানের পর ‘ওয়াল্লহু আলাম’ বলা:
ফাতওয়া প্রদানের পর বিদগ্ধ আলিমগণ ‘ওয়াল্লহু আ’লাম’ বা ‘আল্লহ্ সম্যক অবগত’ বলে থাকেন। ‘আল্লহ্ সম্যক অবগত’ বলাটাও এক প্রকার ইলম।
মাসরূক (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: ”এক ব্যক্তি কিন্দাবাসীদের সামনে বলছিল, কিয়ামাতের দিন ধোঁয়া আসবে এবং মুনাফিকদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দেবে। আর মুমিনের কাছে মনে হবে সর্দি লেগে থাকা অবস্থার ন্যায়। এ কথা শুনে আমরা ভীত হয়ে গেলাম। এরপর আমি ইবনু মাস‘উদ (র)-এর নিকট গেলাম। তখন তিনি তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন। এ সব কথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে উঠে বসলেন এবং বললেন, যার জানা আছে সেও যেন তা বলে, আর যে না জানে সে যেন বলে, আল্লহ্ তা‘আলাই সম্যক অবগত। জ্ঞানের মধ্যে এটাও একটা জ্ঞান যে, যার যে বিষয় জানা নেই সে বলবে ‘‘আমি এ বিষয়ে জানি না…’’ [সহিহ বুখারী ৪৭৭৪, ৪৮০৯, ৪৮২২; সহিহ মুসলিম ৬৯৫৯-(৩৯/২৭৯৮); মিশকাতুল মাসাবীহ ২৭২]
♦️ কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এবং কেউ যেন নিজেকে সকল বিষয়ে মহাজ্ঞানী মনে না করে:
মহান আল্লহ তাআলা বলেন: ‘’প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর রয়েছে এক মহাজ্ঞানী’’ [ইউসুফ ১২/৭৬]
সুতরাং কোনো আলিম বা বক্তা যদি ফাতওয়া প্রদানের শেষে দাম্ভিকতা স্বরূপ নিজের মনগড়া ও উদ্ভট বাক্য যেমন: ‘এটাই চূড়ান্ত…!’, ‘আছে কোন মায়ের ব্যাটা…!’, ‘কিয়ামত পর্যন্ত এই ফাতওয়া কেউ উল্টে দিতে পারবে না…!!!’ ইত্যাদি ব্যবহার করেন তাহলে সে বক্তা প্রকৃতভাবেই সালাফদের অনুসরণকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না 🚫। এবং এই ধরনের বক্তার অহংবোধকে গুড়িয়ে দেয়ার জন্য সঠিকভাবে সালাফদের মানহাজ অনুসারি আলিম ও তালিবে ইলমদেরকে স্বতঃস্ফূর্ত ও দলবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসা জরুরি।
.
🖋️লেখক: শাইখ আনিসুর রহমান (হাফিজাহুল্লহ)
খতিব: মাদারটেক আহলে হাদিস জামি মাসজিদ, ঢাকা।
